‘পতিদুর্গা’র বিস্ময় গড়ন, আচারের আলোয়  উজ্জ্বল হয়ে আছে বাংলার আর এক পলাশী
  • ১৭ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

অভিজিৎ চৌধুরী, চুঁচুড়া: হুগলির প্রান্তসীমার এক গ্রাম। গোটা গ্রামে একটি দুর্গা প্রতিমারই আরাধনা হয়। সেই পুজোই শারদোৎসবের ভরকেন্দ্র। কিন্তু মজা হচ্ছে, বাঙালির উমাপুজোর কোনো কিছুরই মিল পাওয়া যাবে না এই পুজোয়। এক বেনজির দুর্গাকে ঘিরে উৎসবে মাতোয়ারা হয় হুগলির ধনেখালির পলাশী গ্রাম। ‘পতিদুর্গা’। হ্যাঁ, ওই নামেই তিনি বন্দিত এবং চর্চিত। বহুবিধ বেনজিরের এক বাস্তবিক কোলাজ এই পুজো। দেবীর গড়ন থেকে পুজোর ধরন, পুরোহিতের পরিচয় থেকে রীতি-রেওয়াজ, সবই বিস্ময়কর এবং অভিনব।

Advertisement

বাঙালি তার দেবী দশভুজাকে উমা বানিয়ে তুলেছে আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে। আসলে তিনি শিবানী। হুগলির পলাশীর প্রান্তরের গ্রাম্য দুর্গা তাঁর পতি অর্থাৎ শিবকে নিয়ে পূজিতা হন। তাই তিনি গ্রামবাসীদের কাছে ‘পতিদুর্গা’। শিবানী ও শিব এখানে একই আসনে উপবিষ্ট। তিনি দশভুজা নন, নেই মহিষাসুরও। আছে জয়া, তাঁর সঙ্গিনী। পায়ের কাছে থাকে সিংহ। শিবের সঙ্গী হয়ে থাকেন বটুক ভৈরব। আর থাকে নন্দী অবতার, ষাঁড়। উমার এমন বেনজির অবতারের পুজো কবে শুরু হয়েছিল? গ্রামবাসীদের কেউ মাথা চুলকেও ইতিহাস জানাতে পারেন না। অনেকে কষ্ট করে বলেন, হবে গিয়ে ন’-দশ পুরুষ আগে।  সময়ের খেরোখাতা খোলা না গেলেও এটাই সত্য যে, পুজোর সংখ্যার লাগাতার বৃদ্ধির জমানাতেও গ্রামে আর একটিও দুর্গাপুজো হয় না। পলাশীর প্রান্তর কেবলই ‘পতিদুর্গাময়’ হয়ে থাকে। যা চমক জাগায়।
আরও চমক আছে। পতিদুর্গার পুজো আজও কোনো ব্রাহ্মণ করে না। যদিও পুজো হয় শাক্তমতে। আদিকাল থেকে এই পুজোর পুরুত অন্ত্যজ মানুষ। বর্তমানে একজন চর্মকার বংশ পরম্পরায় ‘পতিদুর্গা’র বাৎসরিক পুজো করছেন। সেই পুরোহিত উত্তম পণ্ডিত বলেন, আমরা হাড়ি সম্প্রদায়ের মানুষ। আট পুরুষ আগে আমার পরিবার পুজোর দায়িত্ব স্বপ্নাদেশে পেয়েছিলেন। আমি ৩০ বছর ধরে পুজো করছি। ব্রাহ্মণের কাছে পুজো শিখেছি। কিন্তু নিয়ম অনুসারে পুজো আমাদেরই করতে হয়। গ্রামের বাসিন্দা দিলীপ পাল বলেন, আমাদের গোটা গ্রামে একটাই পুজো। অন্য পুজোর সঙ্গে প্রায় কিছুই মেলে না। পতিদুর্গাই আমাদের দুর্গা, তাঁর পুজোই দুর্গোৎসব। 
হুগলির সীমান্তে পলাশী গ্রাম। ইতিহাস বলে, একদা ঘনজঙ্গল ছিল এখানে। দিনের বেলাতেও পলাশীর পথে হাঁটতে গা ছমছম করত। সেই গ্রামেরই অধিষ্ঠাত্রী ‘পতিদুর্গা’র পুজো ঘিরে জনশ্রুতি আজও পুজো মরশুম এলে জাঁকিয়ে বসে। আজও দেবীকে মাটির মূর্তিতে পুজো করতে হয়। গ্রামবাসীরা প্রাণের দেবীর জন্য একবার পাথরের প্রতিমা গড়েছিলেন। কিন্তু একদিন তা ভাঙা অবস্থায় পাওয়া যায়। তারপর শত চেষ্টাতেও স্থায়ী মূর্তি গড়া যায়নি।
নীরবে নিভৃতেই পূজিতা হয়ে আসছেন পতিদুর্গা। তার অননুকরণীয় অবয়বে, জনশ্রুতির কুহিলাকাচ্ছন্ন হয়। উজ্জ্বল মহিমায় তিনি বাংলার এক ভিন্ন পলাশীর প্রান্তরকে চর্চার আলোকশিখায় দীপ্ত করে রেখেছেন।  নিজস্ব চিত্র