ঘোড়ার খুরের ধুলো উড়িয়ে ব্যাংককের রাজপথ তখন কাঁপছে। ১৯০৮ সালের ঘটনা। তখন থাইল্যান্ডের নাম ছিল সিয়াম। সেই সিয়ামের ব্রিটিশ দূতাবাসে বসে ঘামছেন কূটনীতিক ওয়াল্টার রাল্ফ ডুরি বেকেট। তাঁর সামনে জমে উঠেছে এক ঐতিহাসিক জট। ব্রিটিশ ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত থেকে আসা পাঠান অভিবাসীদের নিয়ে থাই রাজদরবারে এখন চরম উত্তেজনা। কে এই পাঠানরা? কীভাবে তারা মালয়েশিয়ার জঙ্গল পেরিয়ে সিয়ামের রাজপথে এসে দাঁড়াল? আর কেনই বা বিংশ শতাব্দীর শুরুতে দুই দেশের সাম্রাজ্যবাদী কূটনীতিতে তারা বড়ো মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠল? ইতিহাসের পাতা উলটালে বেরিয়ে আসে এক রোমাঞ্চকর গল্প।
১৮৮০-র দশকের শেষ দিক। ব্রিটিশ ভারতের সাম্রাজ্য তখন ভারতবর্ষের সীমানা ছাড়িয়ে দূরপ্রাচ্যের দিকে চোখ রাখছে। সেই সময়েই মালয়েশিয়ার ফেডারেটেড মালয় স্টেটস থেকে কিছু দীর্ঘাঙ্গী, বলিষ্ঠ পাঠান যুবক সিয়ামের মাটিতে পা রাখতে শুরু করে। ব্রিটিশ ভারতের সেনাদল বা মালয় স্টেট গাইডে কাজ করার সুবাদে তারা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জলহাওয়ার সঙ্গে পরিচিত ছিল। তাদের সুঠাম চেহারা আর ব্যক্তিত্ব দেখে থাই কর্তৃপক্ষ প্রথমে তাদের পুলিশ কনস্টেবল ও রাজপ্রাসাদের প্রাইভেট গার্ড হিসেবে নিয়োগ করে। কেউ কেউ আবার ব্যাংককের রাজপথে ঘোড়ার গাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে শুরু করে। পেশোয়ার থেকে তখন নতুন নতুন তরুণের দল সিঙ্গাপুর হয়ে পাড়ি জমাচ্ছে সিয়ামের সুদূর বন্দরে। ইতিহাস গবেষকদের মতে, এটি ছিল দক্ষিণ এশিয়া থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মানুষের অভিবাসনের এক অনন্য ও উপেক্ষিত অধ্যায়।
কিন্তু এই সোনালি দিন বেশি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের নথি অনুযায়ী, খুব দ্রুতই এই নতুন অভিবাসীদের একাংশের বিরুদ্ধে নানা অপরাধের অভিযোগ উঠতে শুরু করে। ব্যাংককের পুলিশ বাহিনী থেকে তাদের একে একে বরখাস্ত করা হয়। ঘোড়ার গাড়ির ব্যবসাও অতিরিক্ত প্রতিযোগিতায় মার খায়। কর্মহীন ও দিশেহারা পাঠান যুবকরা তখন ব্যাংকক ছেড়ে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে সিয়ামের প্রত্যন্ত মফস্বলগুলোতে। আর ঠিক এখান থেকেই শুরু হয় এক জটিল সংকট।
সে যুগে সিয়ামের বুকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রভাব ছিল এক ভিন্ন মাত্রার। ১৮৫৫ সালের ঐতিহাসিক ‘বাউরিং চুক্তি’ অনুযায়ী, সিয়ামের মাটিতে কোনো ব্রিটিশ প্রজাকে গ্রেপ্তার বা সরাসরি বিচার করার একচ্ছত্র অধিকার থাই আদালতের ছিল না। ব্রিটিশ ভারতের যেকোনো নাগরিক অপরাধ করলে তার বিচার করার একচেটিয়া অধিকার ছিল ব্যাংককে নিযুক্ত ব্রিটিশ কনসুলের। এই আইনি মারপ্যাঁচের ফলেই তৈরি হয় এক অদ্ভুত ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা।
ব্যাংককের পুলিশ কমিশনার এরিক লসন, যিনি অতীতে ব্রিটিশ ভারতে চাকরি করার সুবাদে পাঠান সমাজকে খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন, তিনি বেকেটকে পাঠানো চিঠিতে এই সংকটের ভয়ানক ছবি তুলে ধরেন। লসন অভিযোগ করেন, মফস্সলের গরিব থাই চাষিরা পাঠানদের ভয়ে তটস্থ থাকত। বিশাল লাঠি হাতে গ্রাম ঘুরে বেড়ানো, জোর করে খাবার আদায় করা এবং গ্রামের কেউ প্রতিবাদ করলেই ব্রিটিশ আইনের দোহাই দিয়ে পার পেয়ে যাওয়াই নাকি তাদের দৈনন্দিন অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ১৯০৭ সালের ব্রিটিশ পরিসংখ্যান বলে, সিয়ামে ব্রিটিশ প্রজাদের মোট অপরাধের প্রায় ২৫ শতাংশের সঙ্গেই জড়িয়ে ছিল পাঠানদের নাম। অথচ সে দেশের মোট ভারতীয় জনসংখ্যার মাত্র ৪০ শতাংশ ছিল তারা। এর মধ্যে তিনটে খুনের মতো গুরুতর হিংসাত্মক অপরাধও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
ইতিহাসের এই পর্বে ঔপনিবেশিক প্রশাসকদের মধ্যেও এক অদ্ভুত দোটানা কাজ করছিল। ব্রিটিশ কর্তারা প্রায়ই দ্বিধায় ভুগতেন এই অভিযুক্তরা কি আদতে ব্রিটিশ ভারতের নাগরিক নাকি দুর্বৃত্ত কোনো আফগান উপজাতি? লসন প্রথম দিকে তাদের আফগান বলে দাবি করলেও পরে স্বীকার করেন যে, তাদের অধিকাংশই পেশোয়ারের মারদান বা কালু খানের ইউসুফজাই ক্লাউনের মানুষ। তাদের সামলানোর জন্য ব্রিটিশরা নানা ফন্দি আঁটতে শুরু করে। ভারতে অপরাধীদের ট্র্যাক করার জন্য ব্যবহৃত ‘রেজিস্ট্রার নম্বর ১০’-এর সঙ্গে নাম মেলানো অথবা সিঙ্গাপুরের অভিবাসন আইনে কড়াকড়ি করার প্রস্তাব ওঠে। কিন্তু ব্রিটিশ ভারতের ফরেন ডিপার্টমেন্ট সাফ জানিয়ে দেয় যে এই বিশাল মানবস্রোতকে নথিবদ্ধ করা প্রায় অসম্ভব।
অবশেষে ইতিহাসের চাকা ঘোরে ১৯০৯ সালের মার্চ মাসে। ব্রিটেন ও সিয়ামের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় এক নতুন ঐতিহাসিক চুক্তি। এই চুক্তির মাধ্যমে ব্রিটিশরা সিয়ামে তাদের সেই প্রাচীন ও সুবিধাজনক ‘এক্সট্রাটেরিটোরিয়াল প্রিভিলেজ’ আইনি ছাড় স্বেচ্ছায় ত্যাগ করে। সিয়ামের নিজস্ব আদালত ও পুলিশ বাহিনী ব্রিটিশ প্রজাদের গ্রেপ্তার করে বিচার করার পূর্ণ অধিকার পায়। একই সঙ্গে ব্রিটিশরা ভারতীয় বন্দরগুলোতে নজরদারি কঠোর করায় পেশোয়ার থেকে থাইল্যান্ডমুখী অভিবাসনের স্রোত বন্ধ হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে অবশ্য এই সম্পর্কের মোড় আবার ঘোরে। ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর হয়ে পাঠান সেনারা সিয়ামের মাটিতে পদার্পণ করে এবং যুদ্ধের পর অনেকে স্থায়ীভাবে সেখানেই থেকে যায়। আজকের থাইল্যান্ডের সংস্কৃতিতে মিশে থাকা হাজার হাজার ‘খাকে পাঠান’ বা পশতুন সম্প্রদায় সেই শতবর্ষ আগের রক্তক্ষয়ী ইতিহাস, অভিবাসনের সংগ্রাম এবং ঔপনিবেশিক কূটনীতিরই এক অবিচ্ছেদ্য সাক্ষী হয়ে বেঁচে রয়েছে।



