ভারতীয় অর্থনীতির শক্তি নিয়ে মোদি সরকারের প্রচারের সঙ্গে বাস্তব আর্থিক পরিস্থিতির ফারাক ক্রমশ চওড়া হচ্ছে। একদিকে বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল বৃহৎ অর্থনীতির তকমা সংক্রান্ত আত্মশ্লাঘা, অন্যদিকে বিশ্ব বাজারে দেশীয় মুদ্রামানের লাগাতার পতন। মার্কিন ডলারের বিনিময়ে ভারতীয় মুদ্রার মূল্য ৯৭ টাকা ছুঁই ছুঁই হওয়ার আশঙ্কা এবং ১০০ টাকার সীমা স্পর্শ করার পূর্বাভাস অর্থনীতির সামনে গুরুতর প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে রিজার্ভ ব্যাংককে (আরবিআই) জরুরি ভিত্তিতে একাধিক পদক্ষেপ ঘোষণা করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে খনিজ জ্বালানি কেনার জন্য ভারতীয় তেল সংস্থাগুলিকে ডলারের জোগান দেওয়ার সিদ্ধান্ত তারই অন্যতম। আমদানি-বাণিজ্যের অর্ডার বাতিল ও পুনরায় দেওয়ার ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ আরোপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রশ্ন হল, যে অর্থনীতির শক্তি নিয়ে এত ঢক্কানিনাদ, তার মুদ্রাকে স্থিতিশীল রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এতটা তৎপর হতে হচ্ছে কেন? অর্থনৈতিক বৃদ্ধির পরিসংখ্যান আর সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, কর্মসংস্থান ও আর্থিক নিরাপত্তা এক বিষয় নয়। জিডিপি বৃদ্ধির হার দিয়ে অর্থনীতির যাবতীয় দুর্বলতা লুকানো যায় না। মুদ্রার অবমূল্যায়ন সেই দুর্বলতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
টাকার দামের অধঃপতনের অভিঘাত শুধু মুদ্রাবাজারের কারবারিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানি করতে হয় ভারতকে। মার্কিন ডলারের তুলনায় রুপির মূল্য কমলে একই পরিমাণ তেল কিনতে অনেক বেশি অর্থ খরচ করতে হয় আমাদের। বিশ্ব বাজারে তেলের দামও যদি চড়া থাকে, তবে আমদানি ব্যয়, পরিবহণ খরচ এবং উৎপাদনের খরচ বৃদ্ধির আশঙ্কা থাকে। তার বোঝা শেষপর্যন্ত চাপে আম জনতার কাঁধে। জ্বালানি, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস এবং পরিষেবা অনেক দামি হয়ে যায়। আগের তুলনায় পকেট ফাঁকা হতে থাকে নাগরিকের। বিদেশে উচ্চশিক্ষা, চিকিৎসা কিংবা ভ্রমণের খরচও লাগাম ছাড়িয়ে যেতে থাকে। আমদানিনির্ভর শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বাড়লে প্রবল চাপ তৈরি হয় ক্ষুদ্র, ছোটো ও মাঝারি শিল্পের (এমএসএমই) উপর। আবার রপ্তানিকারকদের কিছু ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার সুবিধা হলেও আমদানিকৃত কাঁচামালের খরচ বৃদ্ধিতে সেই সুবিধা কাটাকুটি হয়ে যেতে পারে। অতএব, রুপির পতনকে বাজারের সামান্য ওঠানামা ভেবে নিশ্চিন্ত হওয়া যায় না। তুলনায় অন্য একাধিক এশীয় মুদ্রা স্থিতিশীল থাকলে ভারতের বিরূপ পরিস্থিতির কারণ খতিয়ে দেখা আরও জরুরি। অবশ্য বিভিন্ন দেশের মুদ্রার গতিপ্রকৃতি বিচার করতে হলে একই সময়সীমা, ডলারের আন্তর্জাতিক শক্তি, বাণিজ্যিক ভারসাম্য, পুঁজি-প্রবাহ এবং সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি—সবই বিবেচনায় রাখতে হবে। কেবল মুদ্রার দর দিয়ে কোনো দেশের অর্থনীতির সামগ্রিক স্বাস্থ্য নির্ধারণ করা যায় না, আবার অস্বীকার করা চলে না ধারাবাহিক অবমূল্যায়নের বিপদটিকেও।
আরবিআইয়ের পদক্ষেপ সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু সুস্থায়ী সমাধানের জন্য দরকার অর্থনীতির মজবুত ভিত। ডেরিভেটিভ বাজারে হস্তক্ষেপ, মার্কিন মুদ্রার জোগান নিয়ন্ত্রণ কিংবা বৈদেশিক মুদ্রাভাণ্ডার ব্যবহার করে পতনের গতি কমানো সম্ভব হতে পারে। বাজারের মৌলিক চাপ দূর নাহলে এই ব্যবস্থা অনির্দিষ্টকাল চালানো যায় না। বৈদেশিক মুদ্রাভাণ্ডার কোনো অক্ষয় সম্পদ নয়। আমদানি ব্যয়, রপ্তানি থেকে আয়, বৈদেশিক বিনিয়োগের ফ্লো, কারেন্ট অ্যাকাউন্টের ঘাটতি এবং জ্বালানির উপর নির্ভরশীলতা প্রভৃতি নানাদিকেই নজর দিতে হবে। একইসঙ্গে উৎপাদনশীল বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, এমএসএমই ক্ষেত্রকে শক্তিশালী করা এবং রপ্তানির বহুমুখীকরণে কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। অর্থনীতির সাফল্য শুধু শেয়ার বাজারের সূচক কিংবা মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন (জিডিপি) বৃদ্ধির হার দিয়ে মাপলে চলবে না, আসল বিচার্য হল—সেই বৃদ্ধির সুফল মানুষের জীবনে পৌঁছাল কতটা। রুপির পতন রুখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৎপরতা অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু তার আড়ালে সরকারের নীতিগত দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। প্রচারের অর্থনৈতিক ফানুস যতই স্ফীত হোক, মুদ্রার দর এবং বাজারের বাস্তবতা শেষপর্যন্ত কঠিন প্রশ্ন তুলবেই। সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে সবচেয়ে জরুরি—পরিসংখ্যানের আত্মপ্রচার ছেড়ে স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা এবং জনমুখী আর্থিক নীতির রূপায়ণ।


