Bartaman Logo
৯ অক্টোবর, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

উৎসবের আলোয় মূল্যবৃদ্ধির ছায়া

দুয়ারে কড়া নাড়ছে উৎসবের মরশুম। এই সময়ে ঘরে জ্বলে ওঠে আনন্দের আলো। চারপাশে নতুন পোশাকের গন্ধ।

উৎসবের আলোয় মূল্যবৃদ্ধির ছায়া
  • ৯ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

দুয়ারে কড়া নাড়ছে উৎসবের মরশুম। এই সময়ে ঘরে জ্বলে ওঠে আনন্দের আলো। চারপাশে নতুন পোশাকের গন্ধ। আর প্রিয়জনদের সঙ্গে নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর উচ্ছ্বাস। কিন্তু এ বছরের উৎসবের আনন্দ ম্লান করে দিতে হাজির হয়েছে এক দীর্ঘমেয়াদি দুশ্চিন্তা। প্রায় চার বছর পর ফের রেপো রেট বাড়িয়েছে রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া। দ্বিমাসিক ঋণনীতি ঘোষণায় রিজার্ভ ব্যাংক রেপো রেট ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ৫.৫০ শতাংশ হয়েছে। ফলে উৎসবের আবহে দেশের সাধারণ মানুষ তথা মধ্যবিত্তের কাঁধে চেপেছে গাড়ি ও বাড়ি কেনার ঋণের বাড়তি ইএমআইয়ের বোঝা। মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ কেন্দ্রের উদাসীন নীতি এবং পরপর ভুল পদক্ষেপের জেরে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গিয়েছে। মূল্যবৃদ্ধির ক্রমবর্ধমান চাপ সামাল দিতেই এই সিদ্ধান্ত বলে দাবি করা হয়েছে। গত আগস্টে পণ্যের খুচরো মূল্যবৃদ্ধির হার ৪.৪৫ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪.৮ শতাংশে, যা আরবিআইয়ের নির্ধারিত ৪ শতাংশ লক্ষ্যের চেয়ে অনেকটাই বেশি। গভর্নর সঞ্জয় মালহোত্রা জানিয়েছেন, চলতি অর্থবর্ষের শেষে মোট মূল্যবৃদ্ধির হার পৌঁছাতে পারে ৫.২ শতাংশে, আর আগামী তিন ত্রৈমাসিকের গড় মূল্যবৃদ্ধির হার হতে পারে ৫.৮ শতাংশ। অথচ এর আগে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে সরকারের তরফে নানা আশ্বাসের বেলুন ওড়ানো হলেও বাস্তবে তার ছিটেফোঁটাও দেখা যায়নি। এই মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসাবে খাদ্যপণ্যের লাগামছাড়া দামের দিকে আঙুল তোলা হয়েছে। কিন্তু খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ল কেন? সরকারের দাবি, এর মূল কারণ জলবায়ু পরিবর্তন, পর্যাপ্ত বর্ষার অভাব এবং জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি। পাশাপাশি, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধ বা আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার নিজের ব্যর্থতা ঢাকতে চাইলেও, দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম নিয়ন্ত্রণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ তারা।

Advertisement

রেপো রেট বাড়ার সরাসরি ও প্রাথমিক আঘাত এসে লাগবে সাধারণ ঋণগ্রহীতার পকেটে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলি ঋণের সুদের হার বাড়াবে। ফলে ফ্লোটিং সুদের হারে লোন নেওয়া গ্রাহকদের মাসিক কিস্তির বোঝা এক ধাক্কায় অনেকটাই বেড়ে যাবে। রিজার্ভ ব্যাংকের ঘোষণার পরেই পিএনবি, ইন্ডিয়ান ব্যাংক, ব্যাংক অফ বরোদার মতো ব্যাংকগুলি ঋণের সুদ বৃদ্ধি করার কথা জানিয়ে দিয়েছে। আর্থিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অবস্থায় ঋণের মেয়াদ না বাড়িয়ে মাসিক কিস্তির অঙ্ক বাড়ানোই বুদ্ধিমানের কাজ। কিন্তু মধ্যবিত্তের সীমিত আয়ের পরিসরে সেই বাড়তি টাকা জোগাড় করা তো কার্যত এক দুঃস্বপ্ন! তাছাড়া, রিজার্ভ ব্যাংক তাদের পলিসি স্ট্যাটাস ‘নিরপেক্ষ’ থেকে বদলে ‘ক্যালিব্রেটেড টাইটনিং’ করেছে। এর অর্থ, রেপো রেট কমতেও পারে, বাড়তেও পারে। যদিও অদূর ভবিষ্যতে রেপো রেট কমার কোনো সম্ভাবনা নেই। এই সুদের হার বৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের আবাসন ক্ষেত্রের উপরেও। গৃহঋণ ব্যয়বহুল হয়ে পড়ায় বহু মধ্যবিত্ত পরিবারই নতুন ফ্ল্যাট বা বাড়ি কেনার স্বপ্ন সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। ক্রেডাই এবং নারেডকোর মতো আবাসন সংগঠনের প্রতিনিধিরাও মনে করছেন যে, এই পদক্ষেপের জেরে ফ্ল্যাট বিক্রি কিছুটা ধাক্কা খাবে। দীর্ঘমেয়াদি মন্দার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। কলকাতার রিয়েলটি বাজার বা সামগ্রিক ব্যবসার ক্ষেত্রেও এর নেতিবাচক ধাক্কা অনস্বীকার্য। একদিকে যখন মুদ্রাস্ফীতি ও চড়া সুদের জাঁতাকলে পিষে মরছে আম জনতা, তখন জিডিপি বৃদ্ধির হার নিয়ে সরকারি আশ্বাসের বেলুনও ফুটো হতে শুরু করেছে। সরকারি স্তরে ৮ শতাংশ জিডিপি বৃদ্ধির আশঙ্কার কথা বলা হলেও, রিজার্ভ ব্যাংক জানিয়ে দিয়েছে যে চলতি অর্থবর্ষে সামগ্রিক জিডিপি বৃদ্ধি ৭.১ শতাংশে আটকে থাকতে পারে।
উৎসবের এই মরশুমে সাধারণ মানুষের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে একটাই প্রশ্ন—কতদিন এই (অ)ব্যবস্থার খেসারত দিতে হবে? একদিকে জিনিসপত্রের লাগামছাড়া দাম, অন্যদিকে আকাশছোঁয়া ইএমআইয়ের বোঝা—সব মিলিয়ে দিশাহারা মধ্যবিত্ত আজ কোণঠাসা। উৎসবের মেতে ওঠার বদলে বঞ্চনা আর আশঙ্কায় দিন কাটছে আম জনতার। এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় সরকার জোগান ব্যবস্থার ত্রুটি সংশোধন ও মূল্যবৃদ্ধির মূল কারণগুলিকে নির্মূল করতে ব্যর্থ হলে দেশের অর্থনীতি আরও গভীর সংকটের মুখে পড়বে। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ