মৃণালকান্তি দাস: একটা খাম। ভিতরে মোটা টাকার বান্ডিল। একজন নেতা এবং একজন ব্যবসায়ী। আর দরজা বন্ধ করে একটা চুক্তিতে সই। দুর্নীতির গল্প বলতে আমাদের চোখের সামনে সাধারণত এই ছবিটাই ভেসে ওঠে। এখন সেই দুর্নীতিরও ধরন বদলে গিয়েছে। দুর্নীতির সমস্যা হয়ে উঠেছে আরও জটিল, ভয়ংকর, সর্বগ্রাসী।
প্রশ্নটা অন্য জায়গায়— দুর্নীতি-দমনের আইনটা কার হাতে? আর সেই আইন যদি ক্ষমতাবানদের হাতেই চলে যায়, তখন দুর্নীতি কি শুধু ‘ঘুষের খাম’ থাকে? নাকি দুর্নীতির ভয়ংকরতম রূপ হল— ক্ষমতা ব্যবহারের মাধ্যমে ঠিক করে দেওয়া, কে আইনের আওতায় থাকবে আর কে থাকবে না? তাহলে সমস্যাটা আর একজন দুর্নীতিবাজ নয়। সমস্যাটা গোটা সিস্টেম। আর সেই সিস্টেমের দিকে তাকালেই দেখা যায় এক ভয়ংকর ছবি!
২০২৬ সালে ১৮২টি দেশ নিয়ে প্রকাশিত হয়েছিল ‘বিশ্ব দুর্নীতি সূচক’ (করাপশন পারসেপশন্স ইনডেক্স বা সিপিআই)। যেখানে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে, বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই সরকারি দুর্নীতি এখনও গুরুতর সমস্যা। নজর কাড়ে একটি সংখ্যা— ৬৪। আমেরিকার স্কোর। যে স্কেলে ১০০ মানে অত্যন্ত স্বচ্ছ এবং ০ মানে চরম দুর্নীতিগ্রস্ত, সেখানে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী গণতন্ত্রের দেশের মান দাঁড়িয়েছে ৬৪। যে দেশ কয়েক দশক ধরে বিশ্বজুড়ে দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি, তার নিজের অবস্থানই এখন প্রশ্নের মুখে। আমেরিকা তার সর্বকালের সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে নেমে এসেছে। কেন? উত্তর খুঁজতে গেলে পৌঁছতে হয় ক্ষমতার কেন্দ্রে। দুর্নীতির নতুন সাম্রাজ্যে!
অর্থপাচার রুখতে আইন। ঘুষের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা। অবৈধ সম্পদের উপর নজরদারি। নিষেধাজ্ঞা। আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার উপর প্রভাব। গত কয়েক দশকে এই অস্ত্রগুলির বড়ো অংশই ছিল ওয়াশিংটনের হাতে। সেখানে একটি সিদ্ধান্তের অভিঘাত পৌঁছে যেত পৃথিবীর অন্য প্রান্তের ব্যাংকেও। যুক্তিটা সহজ— যে দেশ অর্থের পথ নিয়ন্ত্রণ করে, সে দুর্নীতির পথও আটকে দিতে পারে। কিন্তু সেই ক্ষমতাই যদি রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ ওঠে?
সংবাদসংস্থা রয়টার্স-এর এক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ৬৯ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন— ট্রাম্পের ব্যবসায়িক স্বার্থ মার্কিন প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে। অধিকাংশ আমেরিকান আজ মনে করেন, দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে ট্রাম্প অন্যায়ভাবে লাভবান হয়েছেন। গত বছর তাঁর পরিবারের ক্রিপ্টোকারেন্সি উদ্যোগগুলি থেকে ১.৪ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি আয় করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফিনান্সিয়াল এবং ট্রাম্প মিম কয়েন। এই ডিজিটাল সম্পদগুলির তিনি প্রকাশ্যে সমর্থন করেছেন। এর পাশাপাশি ট্রাম্প পরিবারের ক্রিপ্টো-সংক্রান্ত ব্যবসা, বিদেশি হোটেল, গল্ফ কোর্স ও রিয়েল এস্টেট ব্যবসার সঙ্গে বিভিন্ন বিদেশি বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এখানে প্রশ্নটা আর শুধু ট্রাম্প কত টাকা উপার্জন করছেন, তা নয়। প্রশ্ন হচ্ছে— প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা আর ব্যক্তিগত ব্যবসার মধ্যে সীমারেখাটা কোথায়? রাজনৈতিক নেতাদের এই সমস্যা এখন গোটা দুনিয়াজুড়েই!
আজ দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থা কাঠামোগত ভাবেই আত্ম-সংশোধনে অক্ষম। মুনাফা ও ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে, সক্রিয়ভাবে অবৈধতা ও আরও দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিতে হয়। অভিজাত থেকে তৃণমূল স্তর পর্যন্ত এই দুর্নীতির চক্র স্বয়ংক্রিয়। কে ক্ষমতায় এল বা কে ক্ষমতাচ্যুত হল, তাতে কিছু আসে-যায় না। রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসে, যায়। রয়ে যায় নেতা, পুঁজিপতি, আমলা, অপরাধী ও প্রভাবশালী মাতব্বরদের নিয়ে গঠিত আঁতাঁত— নিজেদের মধ্যে যারা ভাগ করে নেয় মুনাফা ও ক্ষমতা।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় ক্লেপ্টোক্রেসি অথবা চৌর্যতন্ত্র আজ শুধু একটি শাসনব্যবস্থার নাম নয়; এটি এক ধরনের রাজনৈতিক অর্থনীতির কাঠামো। যেখানে রাষ্ট্র স্বয়ং একটি সংগঠিত লুটের ব্যবস্থায় পরিণত হয়। গ্রিক শব্দ Kleptes (চোর) এবং Kratos (শাসন) থেকে উদ্ভূত এই ধারণা আমাদের সামনে এক নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরে— ক্ষমতা যখন জনকল্যাণের পরিবর্তে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহৃত হয়, রাষ্ট্র তখন আর নাগরিকদের রক্ষাকবচ থাকে না, বরং হয়ে ওঠে শোষণের প্রধান মাধ্যম। এক কথায়, চোরের শাসনই ক্লেপ্টোক্রেসি।
প্রথমত, ক্লেপ্টোক্রেসির মূল ভিত্তি জবাবদিহিতার অনুপস্থিতি। এখানে বিচার বিভাগ, গণমাধ্যম এবং অন্যান্য তদারকি প্রতিষ্ঠানকে সচেতনভাবে দুর্বল করে দেওয়া হয়। ফলে ক্ষমতাসীনরা নির্বিঘ্নে রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ করতে পারে। এই প্রক্রিয়াটি সাধারণ দুর্নীতির চেয়েও বেশি গভীর ও প্রাতিষ্ঠানিক।
এটি একটি systemic corruption, যেখানে দুর্নীতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং শাসনব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
দ্বিতীয়ত, এই শাসনব্যবস্থা প্রায়ই একনায়কতন্ত্র বা অলিগার্কির সঙ্গে যুক্ত থাকে। ক্ষমতা গুটিকয়েক ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, যারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে। এখানে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়াও প্রভাবিত হয় একটি সীমিত গোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ দ্বারা। ফলে গণতন্ত্রের যে মৌলিক চেতনা, তথা জনগণের অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্ব, সেটা প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায়।
তৃতীয়ত, ক্লেপ্টোক্রেসির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল capital flight বা পুঁজি পাচার। লুণ্ঠিত অর্থ দেশের ভিতরে বিনিয়োগ না হয়ে বিদেশি ব্যাংক বা অফশোর অ্যাকাউন্টে জমা হয়। এর ফলে দেশের অর্থনীতি দ্বিমুখী সংকটে পড়ে। একদিকে রাষ্ট্রীয় সম্পদ হ্রাস পায়, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের সুযোগ
কমে যায়। দীর্ঘমেয়াদে এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে এবং বৈষম্যকে চরম পর্যায়ে নিয়ে
যায়। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ক্লেপ্টোক্রেসি কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়; এটি বহু দেশের বাস্তব অভিজ্ঞতা।
ক্লেপ্টোক্রেসির ইতিহাসকে শুধু বিচ্ছিন্ন দুর্নীতি, ঘুষ বা অনিয়মের সমষ্টি হিসাবে দেখা যথেষ্ট নয়। বরং এটিকে এমন একটি সম্ভাব্য ক্ষমতা–সম্পদ সম্পর্কের কাঠামোর পুনরাবৃত্ত চক্র হিসাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে, যেখানে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর উত্থান, প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা এবং পুঁজি পাচারের মতো প্রক্রিয়া পারস্পরিকভাবে একে অপরকে শক্তিশালী করতে পারে। অর্থাৎ, দুর্নীতি যেখানে নির্দিষ্ট ক্ষমতার অপব্যবহার বা অনিয়মকে বোঝায়, ক্লেপ্টোক্রেসি সেখানে সেই ক্ষমতার অপব্যবহার কীভাবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে যুক্ত হয়ে সম্পদ আহরণের একটি পদ্ধতিতে পরিণত হতে পারে, সেই বৃহত্তর প্রশ্নটি সামনে আনে।
বৃহৎ প্রকল্প থেকে স্থানীয় জবরদখল, সব অবৈধতাই দুর্নীতিলব্ধ আয়ের সম্ভাব্য উৎস। অবৈধ পুঁজি, মস্তান, নেতা ও ঠিকাদারদের আঁতাঁত নিয়ন্ত্রণ করে ভোট, মুনাফা ও ক্ষমতার কলকব্জা। এই প্রাতিষ্ঠানিক লুম্পেনতন্ত্র এতই প্রতাপশালী যে, দুর্নীতি হয়ে ওঠে অতি স্বাভাবিক। দল, প্রার্থী আসে যায়, পুলিশে বদলি হয়, আমলা অবসর নেন— কিন্তু ক্ষমতার দুর্নীতিগ্রস্ত কাঠামো চিরস্থায়ী। দুর্নীতিতে কোটি কোটি টাকা চুরি হতে পারে। কিন্তু তার চেয়েও বড়ো ক্ষতি হয়— বিশ্বাসের। মানুষ যখন দেখে একজনের বিরুদ্ধে আইন কঠোর, অন্যজনের বিরুদ্ধে নরম; একজনকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে, অন্যজনকে রক্ষা করা হচ্ছে— তখন প্রশ্ন জাগে, আইন কি সত্যিই সকলের জন্য? এই প্রশ্নই ধীরে ধীরে সন্দেহে বদলায়। সন্দেহ বদলায় অবিশ্বাসে। আর একদিন মানুষ মেনে নেয়— আইন এমনই। শক্তিশালীর জন্য একরকম, দুর্বলদের জন্য অন্যরকম।
সেখানেই বিপদ। কারণ দুর্নীতি যখন কোনো ব্যক্তির অপরাধ, তাকে ধরা যায়। কিন্তু দুর্নীতি যখন সিস্টেমের ভিতরে ঢুকে পড়ে, তখন তাকে আর আলাদা করে চেনা যায় না। সে থাকে আদালতে। ব্যাংকে। রাজনীতিতে। আন্তর্জাতিক চুক্তিতে। ক্ষমতার অদৃশ্য করিডরে। আর সবচেয়ে ভয়ংকর মুহূর্তটি আসে তখনই— যখন দুর্নীতি আর আইনের বাইরে থাকে না। দুর্নীতি ঢুকে পড়ে আইনের ভিতরেই। তখন প্রশ্নটা আর শুধু কে দুর্নীতিবাজ— তা নয়! প্রশ্নটা হয়ে যায়— কে আইন তৈরি করছে? কার জন্য তৈরি করছে? কার বিরুদ্ধে প্রয়োগ করছে? আর কাকে ছাড় দিচ্ছে?
কারণ রাষ্ট্রের পতন সবসময় যুদ্ধ দিয়ে শুরু হয় না। কখনো কখনো শুরু হয় আরও নীরবে— যেদিন মানুষ বিশ্বাস করা বন্ধ করে যে আইন সকলের জন্য সমান। দুর্নীতি যখন নীতির বিরুদ্ধে অপরাধ, তখন তার বিরুদ্ধে লড়াই করা যায়। কিন্তু দুর্নীতি যখন নীতিকেই নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তখন যুদ্ধটা আর বাইরে থাকে না। যুদ্ধ ঢুকে পড়ে রাষ্ট্রের ভিতরে। আদালতে। সংসদে। ব্যাংকে। কূটনীতিতে। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে। আর শেষ পর্যন্ত মানুষের বিশ্বাসে।
আমাদের রাজনৈতিক প্রাঙ্গণে মূল লক্ষ্য ভোটে জেতা, মুনাফা লোটা। লুটেরার শাসন আমাদের সয়ে গিয়েছে। ভোটারদের হাতে রাজনৈতিক দল পরিবর্তন বা অপসারণের নামমাত্র অধিকার থাকলেও, তাঁরা দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ভেঙে দিতে অক্ষম। জমি, বন, খনি, সম্পদে একচেটিয়া অধিকার ও নিয়ন্ত্রণ যে গোষ্ঠীর— সেই নেতা, বানিয়া, বাহুবলী, অফিসার ও দাদা-দিদিদের জোটই লভ্যাংশ ভাগ বা ভোগ করে। নির্বাচনি ফল যা-ই হোক, এই আঁতাঁত অপরাজেয়। আর ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর মুহূর্ত হয়তো তখনই আসে, যখন মানুষ দুর্নীতিকে আর অপরাধ বলে মনে করে না। যখন মানুষ ধরে নেয়— এটাই নিয়ম। কারণ সেই মুহূর্তে দুর্নীতি আর রাষ্ট্রের শত্রু থাকে না। দুর্নীতি নিজেই রাষ্ট্রের কাঠামোর অংশ হয়ে যায়! ভারতও এর বাইরে নয়। স্পষ্ট প্রমাণ— বিশ্ব দুর্নীতি সূচক। যেখানে ১৮২টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ৯১তম। ভুটানের থেকেও খারাপ!