পরামর্শে দুর্গাপুর মিশন হাসপাতালের চেয়ারম্যান ও সিনিয়র কনসালটেন্ট ডাঃ সত্যজিৎ বসু।
পরামর্শে দুর্গাপুর মিশন হাসপাতালের চেয়ারম্যান ও সিনিয়র কনসালটেন্ট ডাঃ সত্যজিৎ বসু।
৬৮ বছরের অনিরুদ্ধবাবু সকালবেলা হঠাৎ স্ত্রীকে বললেন, ‘বুকটা কেমন ভার লাগছে’। গ্যাসের সমস্যা ভেবে অ্যান্টাসিড খাওয়ানোর পরও ঘাম কমছিল না। দুর্বলও লাগছিল। হাসপাতালে গেলে জানা গেল, হার্টে রক্ত সরবরাহকারী প্রধান ধমনীতেই ব্লক! বয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা একেবারেই অস্বাভাবিক নয়। বরং সমস্যা হল, হৃদরোগের উপসর্গ অনেক সময় বয়সজনিত দুর্বলতা, গ্যাস, হাঁপানি কিংবা বুকে চাপ লাগা—এই সাধারণ সমস্যাগুলির সঙ্গে গুলিয়ে যায়। ফলে চিকিৎসা শুরু হতে দেরি হয়।
বয়সকালে কী কী ভয়
করোনারি আর্টারি ডিজিজ: হৃদযন্ত্রে রক্ত সরবরাহকারী করোনারি ধমনীতে কোলেস্টেরল ও অন্যান্য পদার্থ জমে ধমনী সরু হয়ে যাওয়াই করোনারি আর্টারি ডিজিজ। বয়সের সঙ্গে এই অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিসের ঝুঁকি বাড়ে। হাঁটা বা পরিশ্রমে বুক ভার, চাপ বা ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক ক্লান্তির লক্ষণ দেখলেই সতর্ক হন।
অ্যাঞ্জাইনা: করোনারি ধমনী সরু হওয়ার কারণে হার্টের পেশিতে পর্যাপ্ত রক্ত না পৌঁছালে, বুকের ব্যথা বা চাপ হতে পারে। এরই নাম অ্যাঞ্জাইনা।
হার্ট অ্যাটাক বা মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কসন: করোনারি ধমনী হঠাৎ বন্ধ হয়ে হৃদপেশিতে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হলে, হার্ট অ্যাটাক দেখা দেয়। বুকের মাঝে চাপ বা ব্যথার সঙ্গে ঘাম, বমিভাব, শ্বাসকষ্ট, দুর্বলতা থাকতে পারে। বয়স্কদের ক্ষেত্রে উপসর্গ স্পষ্ট নাও হতে পারে। তাই নতুন করে শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক দুর্বলতা বা বুকের অস্বস্তিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ দেখা দিলে ২টি অ্যাসপিরিন জলে গুলে, ৪টি ক্লোপিড্রোজেল ও ১টি অ্যাটোরভ্যাসটাটিন ৮০ মিগ্রা ট্যাবলেট রোগীকে খাইয়ে হাসপাতালে নিয়ে যান। এতে বিপদের ঝুঁকি প্রায় ৪০ শতাংশ কমে।
অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন: অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন বা এএফ হার্টের রিদমের সমস্যা। এতে হার্টের উপরের প্রকোষ্ঠ অনিয়মিতভাবে স্পন্দিত হয়। ইসিজি করলে প্রাথমিক লক্ষণ বোঝা যায়। এ রোগে স্ট্রোকের ঝুঁকিও বাড়ে। বুক ধড়ফড়, দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, শ্বাসকষ্ট প্রধান লক্ষণ। অনেকের আবার উপসর্গই থাকে না।
ব্র্যাডিকার্ডিয়া: হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক ধীর হয়ে যাওয়াকে ব্র্যাডিকার্ডিয়া বলে। বয়সের সঙ্গে হৃদযন্ত্রের পরিবর্তন এবং কিছু ওষুধের প্রভাবে এমন সমস্যা দেখা দিতে পারে। মাথা ঘোরা, দুর্বল লাগা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা খুব সহজে ক্লান্ত হয়ে পড়া এই রোগের লক্ষণ।
হার্ট ব্লক: হৃদযন্ত্রের বৈদ্যুতিক সংকেতের স্বাভাবিক ছন্দ রয়েছে। তা বাধা পেলে হার্ট ব্লক হতে পারে। বিশেষত বয়স্কদের এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। কখনও ধীর হৃদস্পন্দন, মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হওয়ার মতো উপসর্গ দেখলে সচেতন হন। পেসমেকারও লাগতে পারে।
হার্ট ফেলিওর: হার্টের রক্ত পাম্প করার ক্ষমতা কমে যাওয়াই হার্ট ফেলিওর। হাঁটলেই হাঁপানো, শুয়ে থাকলেও শ্বাসকষ্ট, রাতে শ্বাসকষ্টে ঘুম ভেঙে যাওয়া, পা ফোলা, অস্বাভাবিক ক্লান্তি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
হার্টের শত্রু কী কী
১. বয়স ২. উচ্চ রক্তচাপ ৩. অনিয়ন্ত্রিত সুগার ৪. অতিরিক্ত খারাপ কোলেস্টেরল ৫. ধূমপান ৬. স্ট্রেস ৭. অতিরিক্ত ওজন ৮. শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ৯. কিডনির অসুখ।
হার্টের বন্ধু
রোজ ৩০ মিনিট এক্সারসাইজ। বয়স বাড়লে এক্সারসাইজের আগে চিকিৎসক ও প্রশিক্ষকের পরামর্শ নিন। সাঁতার, সাইক্লিং জিম বা যোগা। রোজ অন্তত ৭-৮ হাজার পা হাঁটা, সুষম ডায়েট।
লিখেছেন মনীষা মুখোপাধ্যায়