মাটির গন্ধে মায়ের আগমন
  • ২০ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সাগর দাস: শিশির ভেজা ঘাসে ঝরে পড়া শিউলি ফুল। নদীর চরে কাশফুলের দোলা। সন্ধ্যা নামলেই ঝিঁঝিপোকার ডাক। গ্রামবাংলার বাতাসে কান পাতলে শোনা যায় এক অদৃশ্য সুর। ঢাকের বোল জানিয়ে দেয় মা আসছেন। শহরের থিম, আলোকসজ্জা আর বিশাল প্যান্ডেলের হাঁকডাক থেকে বহুদূরে গ্রামের দুর্গাপুজো তাই এক অন্য জগৎ। সেখানে পুজো মানে শুধু উৎসব নয়, সারা বছরের অপেক্ষা, আত্মার টান। শিল্পীর ছোঁয়ায় গঙ্গামাটি, খড়, পাট ও বাঁশের কাঠামোয় ধীরে ধীরে তৈরি হয় দেবীমূর্তি। মহালয়ার আগে প্রতিমা নিছক মাটির মূর্তি। চোখ আঁকা হতেই তিনি হয়ে ওঠেন দেবী। 
গ্রামবাংলার পুজোর অন্যতম আকর্ষণ জমিদার বাড়ি ও বনেদি পরিবারের পুজোগুলি। এই পুজোয় জড়িয়ে রয়েছে ২০০-৩০০ বছরের পুরনো ঐতিহ্য। ঠাকুরদালানে বছরে এই দিনগুলিতে প্রাণ ফেরে। চুন-সুরকি খসে পড়া দেওয়ালে নতুন করে লাগে রং। আলপনায় সাজিয়ে তোলা হয় মেঝে। 
বাড়ির বধূ ও মেয়েরা শহর থেকে ফিরে আসেন। এখানে আড়ম্বরের চেয়ে বড় বিষয় হল নিয়ম আর নিষ্ঠা। যা বংশপরম্পরায় চলে আসছে।
গ্রামের পুজোয় আছে কত না আচার। কোথাও কলাবউ স্নান করিয়ে নতুন শাড়িতে সাজিয়ে আনা হয় ঢাকের তালে। কোথাও অষ্টমীর সন্ধিক্ষণে ১০৮ প্রদীপ জ্বালানো হয়। সেই আলোয় ভেসে ওঠে মায়ের মুখ। কোনো কোনো বাড়িতে এখনও চালু রয়েছে কুমারী পুজো। কোথাও আবার পশুবলির বদলে চালকুমড়ো কিংবা আখ বলির প্রথা। ধুনুচি নাচের সময় ধোঁয়ায় ভরে যায় উঠোন। ঢাকিরা ঢাকের সঙ্গে নিজেরাও যেন নেচে ওঠেন।
গ্রামের পুজোর ভোগে নেই কোনো ক্যাটারারের জাঁকজমক। বাড়ির মেয়েরা মিলে রান্না করেন খিচুড়ি, লাবড়া, বেগুনি, পায়েস। শালপাতায় পরিবেশিত প্রসাদ। সবাই মাটিতে পাত পেড়ে বসে খান সেই মহাপ্রসাদ। সেখানে মুছে যায় ধনী-গরিবের ভেদাভেদ।  
রাত গড়াতেই জমে ওঠে পরিবেশ। কোথাও বসে যাত্রাপালা, কীর্তন, কোথাও আবার বাউল গানের আসর। প্যান্ডেল চত্বরে বসে মেলা। বাঁশি, বেলুন, বিভিন্ন খেলনা, জিলিপি আর তেলেভাজার গন্ধে ভরে যায় চত্বর। কর্মসূত্রে দূরে থাকা যুবক-যুবতীরা পুজোর ক’টি দিন চলে আসেন গ্রামে। দীর্ঘদিন দেখা না হওয়া বন্ধুর সাক্ষাতে উঠে আসে পুরনো স্মৃতি। 

Advertisement

দশমীর বিকেলে বদলে যায় সুর। সিঁদুর খেলায় রাঙা হয়ে ওঠেন গাঁয়ের বধূরা। পান আর মিষ্টি মুখে দিয়ে বিদায় জানানো হয় মাকে। তখন চোখের কোণে জমে জল। ঢাকের বোলেও তখন বিসর্জনের কান্না। প্রতিমা কাঁধে নিয়ে গ্রামের পুকুর কিংবা নদীর দিকে এগিয়ে চলেন উমা। জলে মিশে যায় মাটির মূর্তি। কিন্তু মন থেকে যায় না তাঁর ছায়া। তারপর শুরু হয় বিজয়ার প্রণাম, কোলাকুলি আর বড়দের আশীর্বাদ নেওয়ার পালা। তারসঙ্গে মিষ্টিমুখ।
তবে আজ গ্রামেও এসেছে বদল। বারোয়ারি পুজোয় জায়গা করে নিয়েছে থিম ও রঙিন এলইডি। ঢাকের জায়গা করে নিয়েছে সাউন্ড বক্স। শহরের পুজোয় আলো বেশি, গ্রামে আলোর চেয়ে আন্তরিকতা বেশি। যেখানে পুজো শুধু উৎসব নয়, এক জীবন্ত ঐতিহ্য। প্রতি বছর নতুন করে ফিরে আসে।