Bartaman Logo
২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

এক যে ছিল দস্যি ছেলে

বানরসেনার আসল বানরটা কে জানিস?’ হরমোহন পট্টনায়ক জিজ্ঞাসা করলেন। বাজি খুব মন দিয়ে বৈঠা মেরামত করছিল। কাজ থামিয়ে মুখ তুলে তাকাল, ‘কে? লক্ষ্মণ সাহু?’ ‘তুই।

এক যে ছিল দস্যি ছেলে
  • ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

রাজা ভট্টাচার্য: বানরসেনার আসল বানরটা কে জানিস?’ হরমোহন পট্টনায়ক জিজ্ঞাসা করলেন। বাজি খুব মন দিয়ে বৈঠা মেরামত করছিল। কাজ থামিয়ে মুখ তুলে তাকাল, ‘কে?  লক্ষ্মণ সাহু?’  ‘তুই। গোটা ঢেঙ্কানলে তোর মতো দস্যি ছেলে আর দুটো নেই। এক মুহূর্ত স্থির হয়ে বসতে শিখলি না এই বয়সে।’ 

Advertisement

‘হি হি হি...!’ বাজির সব ক’টা দাঁত বেরিয়ে পড়ল, ‘মা-ও বলে— তোকে একেবারে ঠিক দলে নিয়েছে বড়োরা। বানরসেনাই বটে।’ 
হরমোহন সস্নেহে তাকিয়ে রইলেন ছেলেটার দিকে। কালো ছোট্ট দেহে শুধু এক ফালি মলিন ধুতির টুকরো, খালি গা, এক মাথা এলোমেলো চুল। হরি রাউতের ছেলে ও। বাজি রাউত। বয়স সবে বারো। এই বয়সেই মস্ত সংসারের দায়িত্ব তুলে নিয়েছে নিজের ঘাড়ে। করবেই বা কী! হরি রাউত ছিল মাঝি। সেও হঠাৎ করে মরে গেল একদিন। বাজি মায়ের ছোটো ছেলে। কিন্তু দরকারের সময় দেখা গেল, বাপের নৌকা আর মায়ের সংসার— দুটোরই হাল ধরেছে সে-ই। এখন ও নৌকা চালিয়ে ব্রাহ্মণী নদী এপার-ওপার করে সওয়ারি নিয়ে, মা এর-তার বাড়িতে ঢেঁকিতে পাড় দিয়ে দুটো পয়সা নিয়ে আসে। কষ্টেসৃষ্টে চলে যাচ্ছে সংসার। 
কিন্তু ওড়িশার ঢেঙ্কানল যেন জ্বলে যাচ্ছে। পরাধীন ভারতে এইসব প্রিন্সলি স্টেটের প্রজারা কখনোই শান্তিতে থাকে না। অত্যাচার চলতে থাকে দুই তরফেই। একদিকে রাজপরিবার, অন্যদিকে ইংরেজ সরকার। 
কিন্তু ঢেঙ্কানলের রাজা শংকরপ্রতাপ সিংহ দেও যেন সাক্ষাৎ শয়তানের অবতার। তাঁর মতো করে প্রজাদের নিংড়ে টাকা রোজগার করতে আর কোনো রাজা জানেন না। যখন তিনি ইংল্যান্ডে পড়াশোনা করছিলেন, তখন রাজত্বের দায়িত্বে ছিলেন তাঁর ভাই নৃসিংহপ্রতাপ। প্রজাদের দুর্গতি অবশ্য শুরু হয়েছিল তাঁর আমলেই। একশো কামরার একটা প্রকাণ্ড প্রাসাদ বানিয়েছেন তিনি প্রজাদের বেগার খাটিয়ে। সেই প্রাসাদের খরচও এসেছে গরিব প্রজাদের পকেট থেকেই। এখন শংকরপ্রতাপ দায়িত্ব নিলেও প্রজাদের অবস্থা উত্তরোত্তর খারাপ হয়েই চলেছে। 
আর সেই কারণেই হরমোহন ঝাঁপিয়ে পড়েছেন এই লড়াইয়ে। তৈরি করেছেন প্রজা মণ্ডল। এই দলই এখন প্রাণপণে লড়ে চলেছে রাজার অত্যাচারের বিরুদ্ধে। আর একেবারে ছোটো বাচ্চাদের নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে আর একটা শাখা সংগঠন— বানরসেনা। এদের কাজ ইংরেজ সেনাদের খবর সংগ্রহ করা। বাচ্চারা যে গুপ্তচরের কাজ করতে পারে, সেটা কেউই ভাবতে পারে না, ফলে যেকোনো জায়গায় তাদের অবাধ গতি। হরমোহন অবশ্যই পইপই করে বলে দিয়েছেন, বাচ্চারা যেন কোনো কারণেই বিন্দুমাত্র ঝুঁকি না নেয়। 
আর এই বাচ্চাদেরই একজন হল এই বাজি রাউত‌। বারো বছর বয়সেই জুটে গিয়েছে বানরসেনায়। বড়ো গরিব কচি ছেলেটা। আর এমনই না জানি কত ছোটো ছোটো ছেলেমেয়ে অকথ্য নির্যাতন সহ্য করছে শুধু রাজার খামখেয়ালিপনার জন্য! এই বাচ্চাগুলো যাতে একটা উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ পায়, তার জন্যই লড়ে যেতে হবে— ভাবলেন হরমোহন।
আজ চারদিন হয়ে গেল হরমোহন লুকিয়ে রয়েছেন এই ভুবন গ্রামে। ঢেঙ্কানল রাজ্যের একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত এই গ্রাম। আর সেই কারণেই দিনের বেলাতেও একটু-আধটু ঘোরাঘুরি করার সাহস পাচ্ছেন তিনি।
‘হ্যাঁ রে, পুলিশের কোনো খবর জানিস?’ জিজ্ঞাসা করলেন হরমোহন। 
‘আড়াইশোজন গোরা পুলিশ এসেছে গত পরশু। ফাগু কাকা খবর এনেছে,’ বাজি বলল। 
‘সে তো জানি। তারপর? কোন 
দিকে এগবে?’ 
‘কে জানে? লক্ষ্মণদাদা বলছিল এদিকেই আসবে। আমরা অবশ্য পালা করে রাত জেগে পাহারা দিচ্ছি।’ 
‘বলিস কী! তুইও? সারাদিন খাটিস বৈঠা নিয়ে, আবার রাতেও ঘুমোস না?’
‘আমরা না জেগে থাকলে তুমি ঘুমোবে 
কী করে?’ 
হরমোহন গাঢ় চোখে তাকিয়ে রইলেন বাজির দিকে। গরিব ঘরের ছেলে কি না, তাই বারো বছর বয়সেই জীবনের সারসত্য বুঝে গেছে বাচ্চাটা। কেউ জেগে থাকে বলেই কেউ নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারে।
‘তা হ্যাঁ রে বাজি, এইটুকু এক ছানা তুই। ধর যদি পুলিশ এসেই পড়ে, তুই করবিটা কী শুনি? তোর না আছে গায়ে জোর, না আছে বন্দুক-পিস্তল। গোরা পুলিশকে তুই ঠ্যাকাবি কী দিয়ে?’ 
বাজি খানিক ভেবে নিয়ে বলল, ‘কিছু না পারি, চেঁচাব। তুমি শুনতে পাবে— আমি চিৎকার করছি। অমনি অন্যদিকে 
পালিয়ে যাবে।’
হাসতে হাসতে উঠে পড়লেন হরমোহন। বেলা পড়ে আসছে। আজ নদী পেরিয়ে ওপারে যেতে হবে তাঁকে। এই বেলা রওনা দিতে হবে, নইলে পরের গাঁয়ে পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত 
হয়ে যাবে।
‘চল বাজি, আমাকে নদী পার করে দে।’ 
‘চল। বেলা পড়ে এসেছে। এখন আর সওয়ারি পাব না।’ 
....
হরমোহনকে ব্রাহ্মণী নদীর ওপারে নামিয়ে দিয়ে বাজি যখন ফিরে এল, তখন চাঁদ উঠে গেছে। বাড়ি ফিরে খানিক পখালো আর শুঁটকি খেয়ে নিল বাজি। তারপর ফের বেরিয়ে পড়ল। আজ রাতে পাহারার দায়িত্বে ও-ই আছে বটে। নীলকণ্ঠপুর ঘাট এখন শুনশান। এই অজ-পাড়াগাঁয়ে রাতবিরেতে কে-ই বা বাড়ি থেকে বেরতে যাবে? বিশেষ করে গাঁয়ে যেকোনো দিন গোরা পুলিশ ঢুকতে পারে, এই খবর রটে যাওয়ার পর থেকে এমনিতেই রাত্তিরে কেউ বাড়ি ছেড়ে বেরচ্ছে না।
বাজির নিজের নৌকোটা রোজকার মতোই বাঁধা আছে নীলকণ্ঠপুর ঘাটে। মৃদু হাওয়ায় ঢেউ উঠছে ছোটো ছোটো। নৌকোটা যেন নিজের মনে দুলছে। বাজি মাঝির ছেলে। নিজেও মাঝি। নৌকার এই দোলা দেখলেই ওর মন ভালো হয়ে যায়। ঘাটের পাশে একটা চালতা গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে পা ছড়িয়ে বসে ও জ্যোৎস্নায় ভেসে যাওয়া নদী, চড়া, ওপারের ঘাসজমির দিকে তাকিয়ে রইল। ওর কাছে এটাই দেশ। আর 
এই দেশটাকে ও বড়ো ভালোবাসে 
এই বয়সেই। 
হঠাৎ সোজা হয়ে বসল বাজি। ঝিঁঝির আওয়াজ ছাপিয়ে একটা বেসুরো শব্দ শোনা গেল না? খটখট খিটখিট! জুতো পরা পায়ের শব্দ। ভুবন গ্রামে কেউ জুতো পরে না। এর একটাই অর্থ হয়। গাঁয়ে পুলিশ ঢুকে পড়েছে। 
এক মুহূর্তের জন্য বাজির মেরুদণ্ড বেয়ে একটা হিমেল স্রোত বয়ে গেল। এই পুলিশগুলো গোটা ঢেঙ্কানল জেলা জুড়ে যে কী তাণ্ডব করে বেড়াচ্ছে, তা ও হাড়ে হাড়ে জানে। 
পরক্ষণেই আবার গাছের গায়ে হেলান দিয়ে আধশোয়া হল বাজি। নইলে পুলিশগুলো মনে করতেই পারে, ও পাহারা দেওয়ার জন্যই 
বসে আছে।
মিনিট কয়েকের মধ্যেই পুলিশের দলটা এসে পৌঁছল ব্রাহ্মণী নদীর তীরে। গভীর রাত। চাঁদ উঠে এসেছে মাথার উপরে। তার আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সবকিছু। দেখা যাচ্ছে বাজিকেও।
সবার আগে আগে হেঁটে আসা গোরা পুলিশটা সোজাসুজি বাজির দিকে এগিয়ে এল। লোকটার হাতে অন্যরকম দেখতে একটা আলো। সেটার অবশ্য দরকার হচ্ছে না। কাকজোছনায় দিব্যি দেখা যাচ্ছে— গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে বসে আছে একটা বাচ্চা। 
ইংরেজ সুপারিনটেনডেন্টের ভুরু কুঁচকে গেল। এত রাতে এইটুকু বাচ্চা বাড়ির বাইরে একা কী করছে? 
‘আস্ক হিম, হোয়াট দ্যা হেল ইজ হি 
ডুয়িং হিয়ার।’ 
ততক্ষণে বাজি উঠে দাঁড়িয়েছে। এতগুলো পুলিশ দেখেও বসে থাকাটা মোটেই স্বাভাবিক বলে মনে হবে না। কিন্তু ফিরিঙ্গিটা কী বলল, সেটা স্বভাবতই ও বুঝতে পারেনি। 
এবার তার পেছন থেকে বেরিয়ে এল একটা লোক। দেশি লোক। ঝরঝরে ওড়িয়া ভাষাতেই বলল, ‘এইঠি তু কঁড় করছু?’ এখানে কী করছিস তুই? 
‘এম্বিতি বসি অছি বাবু।’ এমনিই বসে আছি। ঘুম আসছিল না, তাই নদীর পাড়ে 
এসে বসলাম।
‘হরমোহন পট্টনায়ককে চিনিস?’
আরও একবার ঠান্ডা একটা স্রোত বয়ে গেল বাজির শিরদাঁড়া বেয়ে। খুব অবাক হওয়ার ভান করে ও বলল, ‘সে কে বাবু? আমাদের গ্রামে তো ও নামে কেউ থাকে না!’ 
আবার পিছন থেকে কিছু একটা বলে উঠল ফিরিঙ্গিটা। ঢেঙ্কানলের মহারাজের পিছনে আসল শয়তান যে এই সাদা চামড়ার লোকগুলোই, সেটা এখন বাজি খুব ভালো করেই জানে। 
‘আজ বিকেলেই নদী পার হয়েছে হতচ্ছাড়া। পাকা খবর আছে। আর তুই নদীর পাড়ে বসে থেকেও তাকে চিনিস না?’ লোকটা এবার কড়া গলায় বলল, ‘কী করিস তুই?’ 
‘মাঝিগিরি করি। বাপ নেই। তাই নৌকো বেয়ে সংসার চালাই।’ 
‘কোন নৌকোটা তোর?’ 
এদের আসল উদ্দেশ্য কী, তা ধরতে পারছিল না বাজি। তবে অন্য কাউকে এর মধ্যে টানা ঠিক হবে না। নিজের নৌকাটা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে ও বলল, ‘ওই যে বাবু, ওটাই আমার নৌকো।’ 
‘ভালো। এবার আমাদের নদী পার করে দে।’ 
বাজির চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেল। কয়েক ঘণ্টা আগেই হরমোহনকে ওপারে পৌঁছে দিয়ে এসেছে ও। কোনোভাবেই এদের নদী পার হতে দেওয়া যাবে না। 
‘কী হল, চল!’ তাড়া দিল লোকটা।
মাঝিগিরির কথাটা বেফাঁস বলা হয়ে গেছে, এতক্ষণে বুঝতে পারল বাজি। নইলে সটান মুখের উপর বলে দিতে পারত— আমি নৌকা চালাতে পারি না। এখন আর কিছু করার নেই। 
‘দাঁড়িয়ে আছিস কেন? কথা কানে ঢুকছে না?’ ক্রমে রেগে উঠছে লোকটা।
‘আমি পারব না বাবু।’ কাঠ কাঠ গলায় 
বলল বাজি।
‘কী পারবি না?’
‘নৌকা চালাতে পারব না। তোমাদের ওপারে দিয়ে আসতে পারব না আমি।’ ক্রমশ চড়ে যাচ্ছে বাজির গলা।
‘তার মানে শয়তানটা ওপারেই আছে।’ অদ্ভুত হিংস্র হয়ে উঠছে পুলিশটার মুখ, ‘যেতে তোকে হবেই।’ 
‘আমি বললাম তো যাব না!’ বলেই হঠাৎ পাগলের মতো চিৎকার করে উঠল বাজি, ‘কে কোথায় আছ! গ্রামে পুলিশ ঢুকেছে! পালাও, যে যেখানে পারো পালাও!’
ওর হঠাৎ চিৎকারে অবাক হয়ে গিয়েছে ফিরিঙ্গিটা। পালটা চিৎকার করে কী যেন জিজ্ঞেস করল। দেশি লোকটা সেই ভাষাতেই উত্তর দিল। তারপর ওর দিকে ঘুরে বলল, ‘নিয়ে চল। নইলে এবার সাহেব কিন্তু পিস্তল বের করবে।’ 
‘বললাম তো নিয়ে যাব না!’ বিনা দ্বিধায় আরও একবার গলা চিরে চিৎকার করে উঠল বাজি, ‘পালাও সবাই! গ্রাম ছেড়ে পালাও! পুলিশ এসে গেছে!’
এতক্ষণে ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল সাহেব পুলিশের। কোমরের খাপ থেকে বেরিয়ে এল পিস্তল। খট করে একটা শব্দ হল। পিস্তলের বাঁটের বাড়ি এসে পড়েছে বাজির মাথায়। ঝরঝর করে রক্ত পড়ছে। তার মধ্যেই চিৎকার করে চলেছে বাজি। 
‘স্টপ দ্যাট, অর আই উইল ফায়ার!’ গর্জে উঠল সাহেব। বাজি বুঝতেই পারল না কী বলা হচ্ছে। রক্তে ওর চোখ দুটো বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ও আবার চিৎকার করতে যাচ্ছিল। 
পরক্ষণেই দু’বার গুলি চালানোর শব্দ হল। মাঝরাত্তিরের নিস্তব্ধতা কেঁপে উঠল। কেঁপে উঠল ভুবন গ্রাম। এইবার গ্রাম থেকে ছুটে আসছে লোকজন। তারা বুঝতে পেরেছে, সর্বনাশ হয়ে গেছে। পিছিয়ে যাচ্ছে পুলিশ এলোপাথাড়ি গুলি চালাচ্ছে তারা। একে একে লুটিয়ে পড়ছে আরও মৃতদেহ। লক্ষ্মণ মালিক, ফাগু সাহু, রুশী প্রধান, নাটা মালিক। রক্তগঙ্গা বয়ে যাচ্ছে ব্রাহ্মণী নদীর পাড়ে। তবু তেড়ে আসছে মার খেয়ে রুখে দাঁড়ানো প্রজারা। 
পালিয়ে গেল ইংরেজের পুলিশ। পড়ে রইল পাঁচখানা মৃতদেহ। 
তাদের মধ্যে একজনের নাম বাজি রাউত। এক হতদরিদ্র মায়ের একমাত্র ভরসা। ভারতের সর্বকনিষ্ঠ শহিদ। 
মাত্র বারো বছর বয়সে আচমকা নিভে যাওয়া এক অলৌকিক অগ্নিশিখা।  

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ