সুদীপ্ত রায়চৌধুরী, কলকাতা: ‘রথ’ বললে প্রথমেই কী মনে পড়ে? জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রার কথা। আর? পুরীর কথা। আর মনে পড়ে একটা লাইন—‘রথ টানলে দুর্গা আসে।’ রথযাত্রার পর থেকেই গোটা বাংলার মনজুড়ে শরতের নীল আকাশ। রথের চাকা যেন দুর্গাপুজোর প্রতীক্ষার ঢাকে প্রথম বোল তোলে।
রথের সঙ্গে শুধু পুরী নয়, জড়িয়ে আছে বাংলার মাহেশ, মহিষাদল, চুঁচুড়া, নাড়াজোল, গুপ্তিপাড়া, রামপাড়া নন্দীবাড়ি, বনকাটি, ঝিকিরা মল্লিকবাড়ি, বর্ধমান রাজবাড়ি কিংবা হাওড়ার বাগুইবাড়ির নামও। সেই সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছেসেই সমস্ত এলাকার স্থানীয় ইতিহাস, পারিবারিক উত্তরাধিকার, ধর্মীয় পরম্পরা ও কারিগরি ঐতিহ্য। এই রথগুলি আসলে একটা সময় ও জনপদের একটি সাংস্কৃতিক দলিল। বাংলার স্থানীয় ইতিহাসের এই ভুলতে বসা অধ্যায়কে পুজো মণ্ডপজুড়ে ফুটিয়ে তুলেছে দমদম পার্ক ভারতচক্র। বাইরে থেকে প্যান্ডেলটি দেখলে মনে হবে একটা বড়োমাপের রথ বুঝি এসে দাঁড়িয়েছে রাস্তার উপর। প্রবেশপথের দু’ধারে রয়েছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন রথের প্রতিকৃতি ও তাদের ইতিহাসের উল্লেখ। মণ্ডপের অন্দরসজ্জাতেও রয়েছে রথের নকশার প্রভাব। গর্ভগৃহে মা দুর্গাও রথে সওয়ার। গোটা বিষয়টিকে অন্য মাত্রা দিয়েছে দীপময় দাসের থিম মিউজিক। ক্লাব সভাপতি সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, এবারে আমাদের থিমের নাম ‘বঙ্গের রথকথা’। শিল্পী মানস দাসের নির্মাণে ও পৌলমী বসুর গবেষণায় বাংলার বিভিন্ন জায়গার রথ ও সেখানকার ইতিহাসকে চোখের সামনে দেখতে পাবেন দর্শকরা।
মানুষের আত্মকেন্দ্রিকতার ফলে ধ্বংসের মুখে পরিবেশ। এই পরিস্থিতি থেকে আমাদের বাঁচাতে পারে শুধুমাত্র সচেতনতা। সেকথাই আরও একবারমনে করিয়ে দিচ্ছে লেকটাউন সর্বজনীন। তাঁদের থিম‘আর্তনাদ’-এর মধ্যে দিয়ে। ক্লাব সদস্য দেবাশিস দে’র কথায়, নিজের প্রয়োজনে আমরা গাছপালা কেটে, পুড়িয়ে নিশ্চিহ্ন করে দিচ্ছি। কৃষিকাজ, বসতি বা কখনো কলকারখানার জন্য বন উজাড় করে ফেলা হচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য। অরণ্য ধ্বংসের ফলেঘরহারাপশুপাখিরা। প্রাণীদের সেই আর্তনাদ যাতে মানুষের চেতনা ফেরায়, সেই কারণে প্রকৃতি রক্ষার বার্তা দিচ্ছি আমরা।
আবার এই প্রাকৃতিক সম্পদকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে আমাদের শিল্পসভ্যতা, নগরজীবন। এই নগরায়নের দুই প্রান্তে রয়েছে ধানবাদের ঝরিয়া ও প্রাণের শহর কলকাতা। কয়লাসমৃদ্ধ ঝরিয়া শিল্প ও নগর সভ্যতার বিকাশে শক্তি জুগিয়েছে। সেই বিকাশের হাত ধরেই উন্নত থেকে উন্নততর পথে এগিয়েছে কলকাতা। রাজ্যের দুই অঞ্চলের এই কাহিনিকেই তুলে ধরেছে গোলাঘাটা সম্মেলনী। তাদের থিম ‘ভাঙা-গড়া’য়। শিল্পী দেবব্রত হালদারের হাত ধরে। মণ্ডপে ঢোকার পথটিকে তৈরি করা হয়েছে কয়লাখনির টানেলের আদলে। থাকছে ঝরিয়ার একটি ম্যাপও। কাঠ, লোহা, ক্যানভাসের উপরে আঁকা নানান ছবি দিয়ে সাজছে গোটা মণ্ডপ। কোথাও দেখা যাবে গ্রামের দোচালা বাড়ি ছাপিয়ে মাথা তুলছে বহুতল ফ্ল্যাট। থাকবে ঝরিয়া কয়লাখনির শ্রমিকদের নানান ছবিও। ভারতচক্রের প্রতিমা। -নিজস্ব চিত্র



