পালকি চেপে স্নানে যায় মালদহের কোতোয়ালির সেনবাড়ির কলাবউ
  • ৩ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

ব্রতীন দাস, কোতোয়ালি (মালদহ): শ্রীচৈতন্যের স্মৃতি বিজড়িত বকুলতলায় আজও পালকি চড়ে স্নানে যায় কলাবউ। মহাপ্রভু মন্দির থেকে শালগ্রাম শিলারূপী নারায়ণ আসে দুর্গামণ্ডপে। কলাবউয়ের সঙ্গে একই সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন নারায়ণ। শাক্ত ও বৈষ্ণব মতের এক অনন্য মিশেল বহন করে চলেছে মালদহের কোতোয়ালির সেনবাড়ির প্রাচীন পুজো। সেইসঙ্গে বহু বছর ধরে এই পুজো সম্প্রতির সাক্ষ্য রেখে চলেছে। প্রয়াত গনি খান চৌধুরী সেনবাড়ির পুজোয় অংশগ্রহণ করতেন। সেই ধারা মেনে কোতোয়ালি পরিবার এখনও শামিল হয় এই পুজোয়। 

Advertisement

শ্রীখণ্ড কাটোয়া থেকে মালদহে পুজো নিয়ে আসার সময় দেবী দুর্গার স্বপ্নাদেশেই বন্ধ হয় বলি। একসময় কোতোয়ালির সেনবাড়ির পুজোর জৌলুস ছিল চোখ ধাঁধানো। বন্দুক থেকে গুলি ছোড়া হত সন্ধিপুজোয়। দশমীতে মণ্ডপ থেকে কাঁধে চেপে মা দুর্গা যেতেন কালিন্দী নদীতে। সেখান থেকে নৌকায় চেপে বেড়াতে যেতেন পুরাতন মালদহে চারুবাবুর মেলায়। তারপর হত নিরঞ্জন। 
কথিত আছে, কালিন্দী নদীর ধারে আমবাগান ঘেরা তল্লাটে জমিদার ছিলেন রাধানাথ চৌধুরী। জমিদারবাড়ির পাশে ছিল এক বিশাল বকুল গাছ। গৌড়ের রামকেলি থেকে ফেরার পথে একবর্ণা (প্রাচীন নাম খুটাহা) হয়ে নৌকায় পুরাতন মালদহ যাওয়ার সময় তারাকালী ঘাটে নামেন মহাপ্রভু। তারপর সেখান থেকে বামুনপাড়া হয়ে এক বৈদ্যবাড়ির বকুলতলায় খানিক জিরিয়ে নেন শ্রীচৈতন্য। ওই বৈদ্যবাড়ি ছিল রাধানাথের পূর্বপুরুষদের। মহাপ্রভুর স্মৃতি বিজড়িত বকুলতলায় ১৫৯৯ সালে রাধানাথ মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি নিঃসন্তান ছিলেন। মহাপ্রভুর মন্দিরের পরিচালন ভার তিনি ভাগ্নে রঘুনন্দন সেনের হাতে তুলে দিতে তাঁকে কাটোয়া থেকে নিয়ে আসেন। রঘুনন্দন চলে আসায় শ্রীখণ্ডে পরিবারের দুর্গাপুজো বন্ধের উপক্রম হয়। সেসময় স্বয়ং দেবী দুর্গা স্বপ্নাদেশ দেন, কাটোয়ায় নয়, কোতোয়ালিতে মহাপ্রভুর মন্দির যে বাড়িতে সেখানেই আমি পুজো পেতে চাই। বৈষ্ণব বাড়িতে পশুবলি চাই না। সেই থেকে মামার বাড়িতে ১৮৫৫ সালে দুর্গাপুজো শুরু করেন তিনি। নিয়ম নিষ্ঠা মেনে সেই পুজো বহমান।
পরিবারের প্রবীণ সদস্য ৯৬ বছরের শরদিন্দু সেন বলেন, আগে আমাদের পুজোয় অনেক জাঁকজমক হত। পুজোর ক’দিন গোটা গ্রামের মানুষ পাত পেড়ে খেতেন। নাটক, যাত্রা হত। বসত গানের আসর। পত্রিকা প্রকাশ হত। এখন অর্থ ও লোকবলের অভাবে সেসব কমেছে। তবে পুজোয় নিয়মের কোনো বদল হয়নি। আজও কুমারী পুজো হয়। মাকে অন্নভোগ দেওয়া হয় না। ভোগে থাকে লুচি, পায়েস ও মিষ্টান্ন। আগে সন্ধিপুজোয় বন্দুক থেকে গুলি ছোড়া হত। একবার পুজোর আগে বাড়িতে আগুন লেগে দাদু গিরিজানন্দ সেনের বন্দুক পুড়ে যায়। তার পর থেকে গুলি ছোড়ার প্রথা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। দশমীতে পরিবারের সবার হাতে অপরাজিত বলয় বেঁধে দেন পুরোহিত। প্রতিমা নিরঞ্জনের পর মহাপ্রভুর মন্দিরে প্রণাম সেরে সবাইকে সেন পরিবারের ‘ভিতর বাড়িতে’ আসতেই হবে।