


অভিষেক পাল, বহরমপুর: ১২ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে মুর্শিদাবাদ ঢুকতেই রেজিনগরের বাম দিকে শিল্প তালুকের জন্য নির্ধারিত বিশাল জায়গা। ঝোপ জঙ্গলের মধ্যে রেজিনগর শিল্পতালুক লেখা সাইন বোর্ড উঁকি মারছে। দু’টি লোহার গেটে মরচে ধরেছে। স্বপ্ন ছিল, ১৮৩ একর জমির উপরে এই শিল্পতালুকে ‘ই-বাস’ কারখানা গড়ে উঠবে। বহুজাতিক সংস্থার ওয়্যার হাউস হবে, স্থানীয় বাসিন্দাদের কর্মসংস্থান হবে। কিন্তু গত ১৬ বছরে দু’-একটি ছোটোখাটো বিল্ডিং ও একটি ছোট স্টিল কারখানা ছাড়া কিছুই হয়নি। রেজিনগরের নির্বাচনে এই শিল্পতালুক অন্যতম ইস্যু। এদিকে এলাকায় বইছে ধর্মের বাতাস, তৈরি হচ্ছে ‘বাবরি মসজিদ’।
রেজিনগর বিধানসভায় ১২ নম্বর জাতীয় সড়কের পাশে চলছে সেই মসজিদ নির্মাণ। তবে শেষ পর্যন্ত মসজিদ হবে কি না, তা নিয়ে সন্দিহান স্থানীয়রা। মাস চারেক আগে মসজিদ তৈরির ডাক দিয়ে ব্যাপক আলোড়ন ফেলে দিয়েছিলেন হুমায়ুন কবির। তার জেরে তিনি তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃতও হন। নতুন রাজনৈতিক দল খোলার ঘোষণা করেন। তৈরি হয় আমজনতা উন্নয়ন পার্টি। রেজিনগর তথা গোটা মুর্শিদাবাদ এবং মালদহের ভোটচিত্রে বড় ফ্যাক্টর হতে যাচ্ছিল এই নতুন রাজনৈতিক দল। কিন্তু হঠাৎ সেই হাওয়া উধাও। হুমায়ুন বাবরি মসজিদকে ভোট রাজনীতিতে ব্যবহার করতে চাওয়ায় মানুষের থেকে তাঁর দূরত্ব তৈরি হয়।
তবে রেজিনগর হুমায়ুনের চেনা মাঠ। এখান থেকে জিতেই তিনি মন্ত্রী রেজিনগররে জিনগরের স্থানীয় রাজনীতিতে সেভাবে যুক্ত ছিলেন না। শেষবার তিনি রেজিনগরের বিধায়ক হয়েছিলেন ২০১১ সালে, কংগ্রেসের টিকিটে। পরে যোগ দেন তৃণমূলে। মন্ত্রীও হন। কিন্তু ২০১৩ সালের উপনির্বাচনে ওই রেজিনগরেই তৎকালীন কংগ্রেস প্রার্থী রবিউল আলম চৌধুরীর কাছে হেরে যান। রবিউলও পরে তৃণমূলে যোগ দেন। ২০১৩ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত তিনিই ছিলেন রেজিনগরের বিধায়ক। এর মধ্যে ২০১৬ সালে হুমায়ুন নির্দল হয়ে রেজিনগরে দাঁড়ান। কিন্তু ৫ হাজার ভোটে কংগ্রেস প্রার্থীর কাছে হারতে হয়। একুশের ভোটের আগে হুমায়ুন তৃণমূলে ফিরলেও রেজিনগরের টিকিট পাননি। তাঁকে পাঠানো হয় ভরতপুরে। মোদ্দা কথা, শেষ দেড় দশকে হুমায়ুন রেজিনগরে কোনো নির্বাচনে জেতেননি। এই কেন্দ্রের ভোটার প্রায় আড়াই লক্ষ। যার ৬২ শতাংশ মুসলিম আর ৩৮ শতাংশ হিন্দু। দলের প্রাক্তন ব্লক সভাপতি আতাউর রহমানকে তৃণমূল প্রার্থী করেছে। তাঁর স্ত্রী এখন পঞ্চায়েত সমিতির সভানেত্রী। এলাকার তৃণমূলের সংগঠন অনেকটাই আতাউরের হাতে। ২০২১ সালে এই কেন্দ্রের বিধায়ক ছিলেন রবিউল আলম চৌধুরী। আতাউরের সঙ্গে তাঁর যে বিশেষ বনিবনা ছিল, তেমনটা নয়। সম্ভবত সে কারণেই রবিউলকে বেলডাঙায় প্রার্থী করা হয়েছে। রেজিনগরে এখন সেভাবে তৃণমূলের গোষ্ঠীবাজি চোখে পড়ে না। লড়াইয়ে রয়েছেন কংগ্রেসের জিল্লু শেখ এবং বিজেপির বাপন ঘোষও। দু’জনেই নিজেদের দলীয় সাংগঠনিক স্তরে বেশ পরিচিত। প্রার্থী পদ পেয়েই ঝাঁপিয়ে পড়ছেন সকলে। তবে প্রচারে অনেকটাই এগিয়ে আতাউর।
রেজিনগরের নির্বাচনে স্থানীয় ইস্যুর অভাব নেই। রাস্তাঘাট, পানীয় জলের সমস্যা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে একটি কলেজের দাবি রয়েছে। সেসব ইস্যুকে হাতিয়ার করে মানুষের কাছে ভোট চাইছে বিরোধীরা। তবে সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প ও সরকারি কাজের নিরিখে অনেকটা এগিয়ে তৃণমূল। এসআইআরে বহু মানুষের নাম বাদ যাওয়ার ক্ষোভও রয়েছে। সেই ক্ষোভের ফসল কারা তুলবে, তা সময় বলবে। আতাউর বলছিলেন, রেজিনগরের মানুষ ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি কিছুতেই গ্রহণ করবে না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উন্নয়ন, রাজ্যের বিভিন্ন প্রকল্পের সুবিধা মানুষ যেভাবে পাচ্ছেন, তার সুফল আমরা পাবই। যদিও হুমায়ুনের দাবি, রেজিনগরে তো জিতবই, সঙ্গে নওদা থেকেও জিতব।