‘মহিষাসুরমর্দিনী’ শুরুর শঙ্খধ্বনি, মহালয়ার সেই শাঁখ কলকাতাতেই
  • ১০ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: মহালয়ার ভোরে রেডিয়োতে মহিষাসুরমর্দিনীর শুরু হচ্ছে যে শঙ্খধ্বনি দিয়ে, সে শাঁখটি কলকাতাতেই আছে।

Advertisement

সেটি শুভ্র সমুজ্জ্বল, এক হাতে তুলে বাজাতে বেশ কষ্ট হয় এমন ভারী। বয়স দুশো বছরের কাছাকাছি। নিত্যানন্দ মহাপ্রভুর প্রত্যক্ষ বংশধরদের যে ধারাটি কলকাতার সিমলে অঞ্চলে থাকেন, তাঁদের মন্দিরেই রাখা শঙ্খটি। এই গোস্বামী পরিবারের কৃতী পুরুষ বংশীবাদক গৌর গোস্বামী। তিনি তাঁর পারিবারিক শঙ্খটি নিয়ে যেতেন আকাশবাণী স্টুডিয়ো। তা বাজিয়েই শুরু হত মহিষাসুরমর্দিনী। বাঙালির শুভকাজ সাধারণত শুরু হয় মঙ্গল শঙ্খধ্বনি দিয়ে। রেডিয়োর ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানটিও শুরু শাঁখের মঙ্গলধ্বনিতে। গৌর গোস্বামীর ভাইপো চন্দ্রদীপ গোস্বামী বলেন, শুনেছি অনুষ্ঠানের পরিকল্পনার সময় পঙ্কজ মল্লিক বলেছিলেন, ‘এটা তো স্বর্গীয় বিষয়। শাঁখ বাজানো উচিত। গৌর তাহলে বাঁশিতে শাঁখ বাজাক।’ তখন সম্ভবত সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘কেন? গৌরদা তো ঠাকুবাড়ির মানুষ। শাঁখ উনি আনতে পারেন। তা বাজলেই তো ভালো হয়।’ তারপরই শাঁখ নিয়ে যাওয়া হল বাড়ি থেকে। সেই শাঁখই তারপর বেজেছে মহিষাসুরমর্দিনীতে।’
মহালয়ার ভোর। বাংলা ঘুমের চাদরে ঢেকে ঘুমিয়ে। তখন রেডিয়োর তরঙ্গ ভেদ করে ভেসে আসে সেই শঙ্খধ্বনি। মনে হয়, গোটা বছরের ক্লেদ, গ্লানি, অনাহার, রোগ, জরা, অন্ধকারের বুক চিরে পবিত্র শরতের প্রথম আলো এসে দাঁড়াল দরজায়। কানে এল দুর্গার পায়ের আওয়াজ। শুরু হল বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের গলায় মহিষাসুরমর্দিনী। আপামর বাঙালির বাড়িতে পা রাখল দেবীপক্ষ। 
গোস্বামী পরিবারের শঙ্খটির ভিতর দেবীপক্ষই যেন অপেক্ষা করে। কয়েক প্রজন্মের বাঙালির স্মৃতি, একটা গোটা জীবনের ভোরবেলা, পুজোর গন্ধ, বলে বোঝানো যায় না এমন আবেগ লুকিয়ে সে শাঁখের ভিতর। সেটি কেবল একটি বাদ্য নয়, সেটি হল বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতির এক শুভ্র সমুজ্জ্বল দলিল।
গৌরবাবুর ছেলে গৌতম গোস্বামী বিডন স্ট্রিটেই থাকেন। ছোটবেলায় দেখেছেন মাঝরাতে বাড়ির সামনে গাড়ি হর্ন বাজিয়ে এসে দাঁড়াত। বাবা গৌর গোস্বামী কোরা কাপড় পরে গাড়িতে উঠতেন। হাতে থাকত কাপড়ে মোড়া শাঁখ। তাঁদের বংশের যে মন্দিরটি রয়েছে বিডন স্ট্রিটে, সে মন্দিরে এখন রাখা থাকে শাঁখটি। গৌতমবাবু বলেন, ‘মূল রেকর্ডিংয়ে এই শাঁখেরই আওয়াজ আছে। ফলে এখন যে অনুষ্ঠান সম্প্রচার হয় তাতে এর আওয়াজই শোনে মানুষ।’ 
এই ঐতিহাসিক নিদর্শনটির কথা বিশেষ সামনে আসে না। পুরনো কলকাতার কিছু মানুষ এবং গবেষক ছাড়া এর খবর তেমন কেউ রাখেননি। ফলে একপ্রকার অগোচরেই রয়ে গিয়েছে মহালয়া শঙ্খ।
যে শঙ্খধ্বনি লক্ষ ঘরে পৌঁছে দেয় দেবীর আবাহন বার্তা, সে শাঁখটি নিঃশব্দেই থাকছে কলকাতার এক বাড়িতে। যার শব্দে শহর যুগের পর যুগ জেগে ওঠে, সে এতটাই আড়ালে থাকে যে, তাকে দেখতে যেতে হয় স্মৃতির ঠিকানায়। সে ঠিকানায় ইতিহাস হয়ে ঢুকে বসে আছে মহালয়ার শঙ্খ। যার সাদা শরীরে জড়িয়ে বাঙালির অমলিন এক ভোরবেলা।