দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে আজও এক সুতোয় বাঁধা ভট্টাচার্য পরিবার
  • ২১ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

নিজস্ব প্রতিনিধি, কৃষ্ণনগর: যৌথ পরিবার ভেঙেছে, আলাদা হয়েছে সংসার। সময়ের সঙ্গে বদলেছে পারিবারিক জীবনযাত্রাও। তবে বদলায়নি পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য। দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে আজও এক সুতোয় বাঁধা নদিয়ার নাকাশিপাড়ার বহিরগাছির ভট্টাচার্য পরিবার। প্রায় তিনশো বছরের প্রাচীন এই বনেদি বাড়ির পুজোকে ঘিরে প্রতি বছর উৎসবের আবহ তৈরি হয় গোটা গ্রামে। একসময় যে পরিবারে একটি দুর্গাপুজো হতো, বর্তমানে সেই পরিবারের বিভিন্ন শরিকের বাড়িতে হয় ছয়টি দুর্গাপুজো। একই পরিবারের ছয়টি পৃথক পুজোর এমন ঐতিহ্য বঙ্গদেশে সচরাচর দেখা যায় না। পুজোর দিনগুলিতে ঢাকের বাদ্যি, মন্ত্রোচ্চারণ, পুষ্পাঞ্জলি আর ধুনোর গন্ধে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে গোটা বহিরগাছি। পরিবারের বিভিন্ন শরিকের বাড়ি কাছাকাছি হওয়ায় এলাকাটি পরিচিত ‘ভট্টাচার্য পাড়া’ নামে। পুজোর আয়োজনে পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি সামিল হন গ্রামবাসীরাও। ছয়টি পৃথক পুজো হলেও ঐতিহ্য আর আত্মীয়তার বন্ধনে আজও এক পরিবারের মতোই মিলেমিশে রয়েছেন সকলে।

Advertisement

ভট্টাচার্য পরিবারের দুর্গাপুজোর ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নদিয়ার রাজপরিবারের নাম। পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, অবিভক্ত বাংলার যশোর জেলার সারল্যা গ্রামে ছিল তাঁদের আদি বাসস্থান। এই পরিবারে বহু পণ্ডিত ও ন্যায়শাস্ত্র বিশারদের জন্ম হয়েছে। শিক্ষাচর্চার পাশাপাশি ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানেও দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য রয়েছে ভট্টাচার্য পরিবারের। নদিয়ার রাজাদের গুরুপরিবার হিসেবে পরিচিত এই পরিবারের পূর্বপুরুষ রামভদ্র ন্যায়লঙ্কার ছিলেন কৃষ্ণনগরের রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের গুরু। তাঁর হাত ধরেই পরিবারে দুর্গাপুজোর সূচনা হয়। পরিবারের এই পুজোকে প্রতিষ্ঠিত করতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিলেন রাজা কৃষ্ণচন্দ্র। তাঁর উদ্যোগেই তৈরি হয়েছিল পুজোর দালান ও মন্দির। সেই থেকে শুরু হওয়া দেবী আরাধনা আজও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে চলেছেন পরিবারের সদস্যরা।

রামভদ্র ন্যায়লঙ্কারের ছয় পুত্র ছিলেন—রঘুরাম, রামরাজ, রামেশ্বর, রামকান্ত, রামহরি ও রামগোবিন্দ। প্রথমদিকে পরিবারের আদি বাড়িতেই একসঙ্গে দুর্গাপুজো হতো। কিন্তু রামভদ্র ন্যায়লঙ্কারের মৃত্যুর পর তাঁর পাঁচ পুত্র পৃথকভাবে দুর্গাপুজো শুরু করেন। নতুন করে প্রতিমা এনে নিজেদের বাড়িতে পুজোর আয়োজন করেন তাঁরা। অন্যদিকে, বড় ছেলে বাবার প্রতিষ্ঠিত পুজোর ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন। এভাবেই এক পরিবারের একটি পুজো থেকে শুরু হয় ছয়টি পৃথক দুর্গাপুজোর পথচলা। সময়ের সঙ্গে যৌথ পরিবার ভেঙে গেলেও পুজোর ঐতিহ্য হারিয়ে যায়নি। বরং দুর্গাপুজোই পরিবারের বিভিন্ন শাখার সদস্যদের একত্রিত করে রেখেছে। এই পুজোকে ঘিরে আরও একটি জনশ্রুতি প্রচলিত রয়েছে। শোনা যায়, স্বয়ং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরও একবার এই পরিবারের দুর্গাপুজোয় এক দিনের জন্য পুরোহিতের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

ভট্টাচার্য বাড়ির পুজোর অন্যতম আকর্ষণ অষ্টমীর বিশেষ ভোগ। এদিন দেবীকে নিবেদন করা হয় ইলিশ মাছের একটি নিজস্ব পদ, যার নাম ‘তেলমাছ’। পরিবারের রীতি অনুযায়ী, কাঁচা ইলিশ সর্ষের তেলে দিয়ে ফুটিয়ে তৈরি করা হয় এই পদ। রান্নায় কোনও জল ব্যবহার করা হয় না। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই বিশেষ পদ আজও পুজোর ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পুজোর বলির প্রথাতেও এসেছে পরিবর্তন। পরিবার সূত্রে জানা যায়, অতীতে এই পুজোয় মহিষ বলির প্রচলন ছিল। পরে ছাগ বলি দেওয়া হতো। কিন্তু পরবর্তীকালে সেই প্রথা বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে পশুবলির পরিবর্তে কুমড়ো বলি দেওয়া হয়। পরিবারের প্রতিমার সিংহের মধ্যেও রয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। প্রচলিত সিংহমূর্তির তুলনায় ভট্টাচার্য বাড়ির প্রতিমার সিংহ দেখতে অনেকটা নরসিংহের মতো। প্রায় তিনশো বছরের ইতিহাস, নিজস্ব রীতিনীতি আর পারিবারিক ঐতিহ্যকে সঙ্গী করে আজও এগিয়ে চলেছে বহিরগাছির ভট্টাচার্য বাড়ির দুর্গাপুজো। সংসার আলাদা হলেও ছয় দুর্গার আরাধনাকে ঘিরে পরিবারের সদস্যদের মিলন আজও অটুট। আর সেই ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করেই প্রতি বছর শারদোৎসবের দিনগুলিতে নতুন করে প্রাণ ফিরে পায় ভট্টাচার্য পাড়া।