অভিজিৎ চৌধুরী, চুঁচুড়া: বাঙালির আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে উমা। শুধু বাঙালি বলেই নয়, ভক্তের ভগবান তত্ত্বকে মাথায় রেখে নানাভাবেই আর্বিভূতা হয়েছেন মহিষাসুরমর্দিনী। রাজা সুরথ থেকে রাজা রামচন্দ্র আর বর্তমানের দেবী পুজোর ধারাবাহিক পালাবদল খুব সহজেই ধরা যায়। কিন্তু চণ্ডীমঙ্গল কাব্যপ্রেরিত দুর্গাপুজোও যে এই বঙ্গভূমে প্রচলিত ছিল, তার এক বিরল কাহিনি লুকিয়ে আছে হুগলির পাণ্ডুয়ায়। বহু শতাব্দী ধরে মঙ্গলকাব্যের অন্যতম নায়ক শ্রীমন্তকে একচালায় ধরে রেখেছে বৈঁচির দাঁ-বাড়ির পুজো। দেবী এখানে অভয়া দুর্গা, ধনপতি উপাখ্যানের শ্রীমন্ত সওদাগরের উদ্ধারকারী রূপে পুজো পান।
প্রথম পর্বে দেবীর ওই রূপ থাকলেও দেবী দশভুজার আরাধনায় সময়ের সঙ্গে মিশেছে পারিবারিক যোগসূত্র। তাতেই দেবীর চালায় এসেছেন কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতীরা। ফলে, দাঁ-বাড়ির অভয়া দুর্গাকে বাংলায় দুর্গা আরাধনার এক হারানো সংযোগসূত্র বললেও খুব ভুল হয় না। আবার, বাংলার মঙ্গলকাব্য ধারার এক বর্ণময় উত্তরণও বলা যায়। পাশাপাশি, দাঁ-বাড়ির ঠাকুরদালানের ক্ষয়াটে চেহারা, মলিন বেলজিয়াম ঝাড়ের ধূলিকণার পরতে পরতে লুকিয়ে আছে বৈভব আর ইতিহাসের বর্ণময় আখ্যান। লুকিয়ে আছে সাবেক সওদাগরিকালের নানা জনশ্রুতি। দাঁ-বাড়ির উত্তরপুরুষ উদয়চাঁদ দাঁ পুজো মরশুম এলেই সেসব অতীতের ঝাঁপি খুলে বসেন। তিনি বলেন, দেবীর দয়াতেই একদা সম্ভ্রান্ত বণিক হয়েছিলেন আমাদের পূর্বপুরুষরা। সওদাগরির সূত্র ধরেই শ্রীমন্ত-উদ্ধারক অভয়া দুর্গার পুজো শুরু হয়েছিল। কালের গতিকে সেই পুজো সপরিবার দুর্গার পুজো হয়েছে। সাবেক জৌলুস হারালেও নিষ্ঠা আর নিয়মের কোনো ব্যতিক্রম আজও হয় না। আমাদের পুজোর কাঠামো বাংলার দুর্গাপুজোর ইতিহাসে পৃথক সরণিতে থেকেছে এবং থাকবে।দাঁ পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, একদা জল-জঙ্গলের পাণ্ডুয়ায় তাঁদের পূর্বপুরুষরা হতদরিদ্র জীবনযাপন করতেন। খড়ের চাউনি দেওয়া চাতালে তখন অভয়া দুর্গার পুজো হতো। একবার টাকার অভাবে পুজো বন্ধ হতে বসেছিল। জনশ্রুতি, সেবার অলৌকিক ঘটনা ঘটেছিল। দেবীর নির্দেশেই সেদিন এক কুমোর এসে নিখরচায় প্রতিমা গড়ে দিয়েছিলেন। আর মঙ্গলকাব্যিক মহিমায় মিলেছিল গুপ্তধন। পরিত্যক্ত ঘড়ায় রাখা মোহর দিয়েই সেবার হইচই করে পুজো হয়েছিল। তারপর আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছিল দাঁ-পরিবারের। নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে দিয়ে রাতারাতি সওদাগরি ব্যবসায় বিপুল মুনাফা করেন দাঁ-বাড়ির কর্তারা। ঘি’য়ের ফলন্ত ব্যবসা থেকে কেনা হয় জমিদারি। দেবী অভয়া দুর্গার পুজোয় তখন চাঁদের হাট বসত। নবহত বসিয়ে, ভিয়েন সাজিয়ে, চোখ ধাঁধিয়ে পুজো হতে থাকে দেবী অভয়ার। তারপর বৈভব আর সময়ের দাবিতে দেবীর কাঠামোয় লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশের আসন পাতা হয়।
ঠিক কত বছর আগে প্রথম পুজো হয়েছিল বা কত বছর আগে দেবীর পুরানো কাঠামোয় নতুনের সংযোজন হয়েছে, তার হদিশ মেলে না। ১১০০ সালের মঙ্গলকাব্য বর্তমানে কেবল বাংলা সাহিত্যের ধারা হয়েই নিভৃতে রয়ে গিয়েছে। বৈঁচির দাঁ-বাড়ির সওদাগরদের বৈভবের দিনও হারিয়ে গিয়েছে। সেই ইতিহাসের কিছুটা মাঝে মাঝে ঝলসে ওঠে রুপোর থালা বা বেলজিয়াম ঝাড়ের দ্যুতিতে। আজ নহবত বসে না, ঠাকুরদালানে স্থায়ী হয়ে থাকে শেওলা। শুধু পুজোর ধুনি জ্বলে, ধোঁয়ার কুণ্ডলীর মধ্যে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে অতীত আর এক বেনজির দুর্গাপ্রতিমা। ফাইল চিত্র



