


সংবাদদাতা, বহরমপুর: আর কতকাল থাকবি বেটি মাটির ঢেলার মূর্তি আড়াল, স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি চাঁড়াল। বিদ্রোহী কবির লেখা কালজয়ী আনন্দময়ীর আগমণ কবিতার এই ছত্র ব্রিটিশ ভারতে তোলপাড় ফেলেছিল। নিজের ধুমকেতু পত্রিকাতেই ১৯২২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হয় আন্দময়ীর আগমন। সেই বছরের ৮ নভেম্বর ব্রিটিশ পুলিশ ধুমকেতুর অফিসে হানা দিয়েছিল। কিন্তু কবি তখন সেখানে ছিলেন না। নিষিদ্ধ হয়েছিল আন্দন্দময়ীর আগমণ। এরপর ২৩ নভেম্বর অবিভক্ত বাংলার কুমিল্লা থেকে কাজি নজরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। কলকাতায় প্রেসিডেন্সি জেলে বিচারাধীন বন্দি হিসাবে রাখা হয়েছিল বিদ্রোহী কবিকে। ১৯২৩ সালের ১৬ জানুয়ারি বিচারে নজরুল ইসলামের এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়। হুগলি জেলে বিদ্রোহী কবির ৩৯ দিনের অনশন দেশ জুড়ে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। তখনও তাঁকে বিশেষ শ্রেণির কয়েদির মর্যাদা দেওয়া হয়নি। ১৯২৩ সালের ১৮ জুন নজরুল ইসলামকে বহরমপুর জেলে আনা হয়। দেওয়া হয় বিশেষ শ্রেণির কয়েদির মর্যাদা। বর্তমানের মানসিক হাসপাতাল ছিল তখনকার কারাগার। জেল সুপার ছিলেন বসন্ত ভৌমিক। নজরুল ইসলামকে বসন্তবাবু গোপনে হারমোনিয়াম থেকে লেখার সরঞ্জাম জোগাতেন। জেলে বসেই কবিতা, গান, নাটক লিখতেন কবি। আর সেগুলি বিভিন্নভাবে বাইরে চলে যেত।
প্রবাসী পত্রিকার সম্পাদক বহরমপুর জেল থেকে নজরুল ইসলামের প্রতিটি লেখার জন্য দশ টাকা করে দিতেন। তখন নজরুলের সঙ্গে জেল বন্দি ছিলেন পূর্ণদাস, বিজনলাল চট্টোপাধ্যায়, নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী প্রমুখ। ১৯২৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর মেয়াদ শেষের আগেই মুক্তি পান কবি। তবে বহরমপুর জেলে বসে নজরুলের লেখা গান, কবিতা ও নাটক আজও কালজয়ী হয়ে রয়েছে।
স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে মুর্শিদাবাদ জেলার যোগ অবিচ্ছিন্ন। ইতিহাসবিদদের একাংশের দাবি, সিপাহী বিদ্রোহ মূলত শুরু হয়েছিল এই ব্যারাক স্কোয়ার ময়দান থেকেই। শুধু তাই নয়, সেসময় বহরমপুর জেলে বহু স্বাধীনতা সংগ্রামীর বন্দি জীবন মুক্তিযোদ্ধাদের ভাবাবেগে প্রভাব ফেলেছিল। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা কাজী নজরুল ইসলাম, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, পূর্ণ দাস, বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়, নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী সহ প্রায় পঞ্চাশ জন মহিলা স্বাধীনতা সংগ্রামী। সুভহাষচন্দ্র বসু বহরমপুর জেলে প্রথম সরস্বতী পুজো করেছিলেন। নেতাজির হাত ধরেই আজও বহরমপুর কেন্দ্রীয় সংশোধনাগারে দুর্গাপুজো হয়ে আসছে।
১৯২৪ সালে রাজবন্দি হিসাবে নেতাজিকে বহরমপুর জেলে আনা হয়। প্রেসিডেন্সি জেল থেকে ৩ নম্বর রেগুলেটর আইনে বন্দি সুভাষকে জেলের ৭ নম্বর ঘরে রাখা হয়। সেবারই জেলে প্রথম সরস্বতী পুজোর আয়োজন করেন নেতাজী। প্রথম বহরমপুর জেলে দুর্গা পুজোর সূচনা করেন তিনিই। আজও সেই পুজো বহমান।