সমৃদ্ধ দত্ত: রাজনৈতিক নেতা ও দলের প্রধান শত্রু হল অতি আত্মবিশ্বাস, দম্ভ এবং ক্ষমতার শক্তিকে অপ্রতিরোধ্য ভেবে নেওয়া। কোনো দল এই অতি আত্মবিশ্বাস এবং ক্ষমতার আস্ফালন তথা অহংকার থেকে মুক্তি পায়নি ভারতে। কংগ্রেস থেকে সিপিএম। ভারতীয় জনতা পার্টি কিংবা তৃণমূল। ডিএমকে অথবা আরজেডি। বিজু জনতা দল কিংবা আম আদমি পার্টি। এই দলগুলি কেন্দ্রে অথবা রাজ্যে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর জনপ্রিয়তার শিখরে বসেছিল। তাদের সংগঠন, জনভিত্তি, ব্যক্তিগত ক্যারিশমার জেরে একটি অপ্রতিদ্বন্দ্বী ভাবমূর্তি নির্মিত হয়। আর লক্ষ্য করা গিয়েছে, যখনই একটি শাসক দলকে কার্যত প্রতিপক্ষহীন হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে সামাজিক ও রাজনৈতিক চর্চায়, তখন সেই মনোভাব সবথেকে বেশি প্রভাবিত করে ফেলে সেই শাসক ও দলকে। অর্থাৎ সমাজ যতটা না ভাবছে, শাসক নিজেকে তার থেকেও বেশি শক্তিশালী ভেবে ফেলেছে। ঠিক তখন থেকেই শুরু হয় তাঁদের ভুল করার অধ্যায়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মুখ্যমন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রী এই ভুল করেছেন। সেই ভুলের পরিমাণ বেড়ে গিয়েছে সময়ের সঙ্গে ক্রমাগত। কেউ নিজের ভুল উপলব্ধি করে সংশোধনের পথ গ্রহণ করেননি। তাই ভোটে চরম প্রতিশোধ নিয়েছে ভারতের গণতান্ত্রিক স্পিরিট। ২০২৪ সালে চারশো পার হওয়ার কথা ছিল যাদের, তাদের কিন্তু গণতন্ত্র ২৪০ পাইয়ে দিয়ে একটি সতর্কবার্তা দিয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতার মদমত্ততায় সেই সংকেতকে বিজেপির সর্বোচ্চ নেতৃত্ব গুরুত্ব দেয়নি। এখন এই একই ভুলে ক্রমেই নিমজ্জিত হচ্ছে বিজেপি। ছাত্র বিক্ষোভ থেকে যে গণআন্দোলন শুরু হয়, সেটি যদি জাতীয় স্তরে আলোড়ন সৃষ্টি করে, তাহলে শাসককে সর্বাগ্রে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এবং রণকৌশল নিয়ে অগ্রসর হতে হয় তার মোকাবিলায়। রাষ্ট্রশক্তিকে কখন ব্যবহার করা হবে এবং কখন অন্য উপায়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আন্দোলনকে ঢুকিয়ে দিতে হবে, সেই সূক্ষ্ম প্রশাসনিক নৈপুণ্য শাসকের থাকা দরকার। কিন্তু তরবারি থাকলেই সেটি ব্যবহার করা যে সর্বদা কাজের কথা নয়, সেটি সিংহভাগ যোদ্ধাই অনুধাবন করতে পারেনি অতীত বিশ্ব ইতিহাসে। ভারতেও।
রাজনৈতিক বুদ্ধিমত্তা ও পরিণতমনস্কতার প্রমাণ হল, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া। অর্থাৎ অতীতে যে সরকার অথবা দলগুলি শাসক ছিল, তারা কী কী ঠিক করেছে এবং তার থেকেও বেশি প্রণিধানযোগ্য হল, কী কী তারা ভুল করেছে। সেই ভুলগুলি থেকে শিক্ষা নেওয়া। আর চেষ্টা করা সেইসব ভুল না করতে।
বর্তমানে দিল্লিতে মূলত যে আন্দোলন হচ্ছে, তার প্রথম অনুঘটক হয়েছিল ছাত্র বিক্ষোভ। সূত্রপাত করেছিল নিট প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া। রাজনৈতিক দল নয়, একটি অরাজনৈতিক সবেমাত্র তৈরি হওয়া সংগঠন। ককরোচ জনতা পার্টি। যন্তরমন্তরে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ছাত্রছাত্রীরাই ছিল সেই অনশন আন্দোলন ও সংসদ অভিযানের প্রধান কারিগর। যতক্ষণ না সোনাম ওয়াংচুকের মতো কোনো খ্যাতিমান মানুষ অনশন শুরু করলেন, ততদিন পর্যন্ত ভারত সরকার গুরুত্বই দিল না ওই যন্তরমন্তরের জমায়েতকে। সেটা প্রথম ভুল। কারণ ছাত্র আন্দোলনকে উপেক্ষা করা, তাচ্ছিল্য করা, অপবাদ দেওয়ার চেষ্টা যে অতীতের ভারতে কী পরিণতি এনে দিয়েছিল, সেকথা অন্তত বর্তমান বিজেপির সর্বোচ্চ নেতৃত্বের ভুলে যাওয়ার কথা নয়। তারপর যখন ক্রমেই ছাত্রদের ওই আন্দোলন গণ আন্দোলনে পর্যবসিত হল, তখন বোঝা গেল যে, ভারত সরকার আসলে, ক্রাইসিস ম্যানেজার হিসাবে ব্যর্থ। শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হল।
এরপর যখন আবার নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে সরাসরি সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠল এবং ১৩ কোটি মানুষের নাম বাদ চলে গেল, তখনও মোদি সরকার ও বিজেপি শুরু করে দিল একের পর এক ভুল। প্রতিবাদ আন্দোনলকে নির্মমভাবে দমনপীড়ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে দিল্লি পুলিশকে। এরকম নির্বুদ্ধিতার সিদ্ধান্ত ও পরামর্শ কার সেটা নিয়ে ভবিষ্যতে বিজেপি গবেষণা করলে বুঝতে পারবে যে, কত বড়ো ভুল হয়েছিল ২০২৬ সালে।
ছাত্র বিক্ষোভের জেরে অতীতে ভারতে একের পর এক সরকারের পতন হয়েছে। এবং এই পতন ভারতের প্রতিবেশীদের মতো ওরকম অগণতান্ত্রিক উপায়ে নয়। সংসদীয় নির্বাচন প্রক্রিয়ায়। অর্থাৎ ভারতে ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়েছে বিভিন্ন
ইস্যুতে। পরিণত হয়েছে গণ আন্দোলনে। আর তারপরই যে নির্বাচন হয়েছে, সেই নির্বাচনে শাসক দলের পরাজয় ঘটেছে।
১৯৭৪ সালে গুজরাতের একটি কলেজে ক্যান্টিনের খাবারের গুণমান নিয়ে ছাত্র আন্দোলনের সূত্রপাত। সেই বিক্ষোভ দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা গুজরাতে। তৈরি হয়ছিল নবনির্মাণ সেনা। দেখতে এসেছিলেন জয়প্রকাশ নারায়ণ। গুজরাতের ছাত্র আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল গুজরাত সরকারের মুখ্যমন্ত্রী চিমনভাই প্যাটেলের পদত্যাগ। স্লোগান ছিল, ‘চিমন চোর গদি ছোড়’। এই যে এখন একটি স্লোগান উঠেছে ‘ভোট চোর গদি ছোড়’, সেটির প্রথম পথিকৃৎ গুজরাতের ছাত্র আন্দোলন। ১৯৭৪ সালের সেই আন্দোলনের প্রথম সাফল্য পরের বছরে হয়েছে। ১৯৭৫ সালের জুন মাসে গুজরাতের বিধানসভা ভোটে কংগ্রেস পরাজিত হয়।
বিহারে অবিকল গুজরাতের আন্দোলনের অনুসরণেই তৈরি হয়েছিল ছাত্র সংঘর্ষ সমিতি। বিহারের ছাত্রছাত্রীদের নানাবিধ দাবি ও ক্ষোভ বিক্ষোভের জেরে আন্দোলন শুরু হয়। সেই শুরু। ছাত্রদের আন্দোলন ক্রমেই সার্বিকভাবে ইন্দিরা হটাও আন্দোলনে পরিণত হয়। এবং তার আগেই সব বিরোধী দলের মহাজোটের মঞ্চ ইন্দিরা গান্ধী বিরোধী আন্দোলন শুরু করে দিয়েছিল। ১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থা জারি করে গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করেছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। কোনো লাভ হয়নি। মানুষ আরও ক্রুদ্ধ হয়। ১৯৭৭ সালে লোকসভা ভোটে সুযোগ পেয়েই কংগ্রেসকে শিক্ষা দেয়। অর্থাৎ যে আন্দোলনের সূত্রপাত গুজরাতের একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের হস্টেলের খাবারের গুণমান নিয়ে ছাত্রদের প্রতিবাদের মাধ্যমে, সেই আন্দোলনের সূত্র ধরেই রাজ্যে রাজ্যে গণবিক্ষোভ এবং ইন্দিরা গান্ধীর পতন।
১৯৭৯ সালে অসমে অল অসম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (আসু) বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। তাদের দাবি ছিল বেআইনি নাগরিকরা এসে অসমের সব পেশা, অর্থনীতি কেড়ে নিচ্ছে। ওই আন্দোলনের জেরে অসমে বাঙালি খেদাও কর্মসূচিও হয়েছিল। অসংখ্য বাঙালিকে গৃহহারা হতে হয়। ছাত্র আন্দোলন ক্রমেই অসমের জনগণের আন্দোলনেও পর্যবসিত হয়। ১৯৮৫ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে চুক্তি হয়। তার নাম অসম চুক্তি। এই ছাত্র আন্দোলনের নেতারা একটি রাজনৈতিক দল গঠন করে। অসম গণ পরিষদ। ওই দল পরবর্তী বিধানসভা ভোটে বিপুল জয় পায় এবং সরকার গঠন করে। অর্থাৎ অসমে ছাত্র আন্দোলনের জেরে কংগ্রেস সরকারের পতন ঘটে।
১৯৯০ সালের আগস্ট মাসে প্রধাননেত্রী বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং মন্ত্রিসভার বৈঠকে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, মণ্ডল কমিশনের রিপোর্ট কার্যকর করা। ২৭ শতাংশ সংরক্ষণ ওবিসিদের জন্য। ওই সিদ্ধান্তের জেরে ছাত্র বিক্ষোভ শুরু হয়। পুলিশ দমনপীড়ন চালায়। গুলিও করে। ছাত্রদের মৃত্যু হয়। প্রবল ক্ষোভে ফেটে পড়ে দেশের ছাত্রযুব। কয়েকমাস পরই নভেম্বর মাসে বিজেপি সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়। লোকসভায় আস্থাভোট বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং পরাজিত হন। সরকারের পতন ঘটে। পরের বছর ভোটেও তাঁর নেতৃত্বের জোট পরাস্ত হয়।
২০১১ সালে দিল্লিতে যে দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল আন্না হাজারে ও অরবিন্দ কেজরিওয়ালের মাধ্যমে। কিন্তু এই আন্দোলনের থেকেও বৃহৎ এক বিক্ষোভে শামিল হয় দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়, আইআইটির তাবৎ ছাত্রছাত্রী। যেটি ছিল ২০১২ সালে নির্ভয়া হত্যার প্রতিবাদে ও দোষীদের চরমতম শাস্তির দাবিতে। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী শীলা দীক্ষিত ঠিক পরের বছরই বিধানসভা নির্বাচনে পরাজিত হন। কংগ্রেস সরকারের পতন ঘটে দিল্লিতে ১৫ বছর পর।
সুতরাং ছাত্র আন্দোলনকে লঘুভাবে গ্রহণ করলে অথবা ভুল রণকৌশলে সেটিকে দমনের চেষ্টা করা হলে পরিণতি কী হয়, তার প্রমাণ অতীতে বারংবার দেখা গিয়েছে। এবার তো ভারত সরকারের আচরণ আরও বেশি অগণতান্ত্রিক। নির্বাচন কমিশন বৈধ নাগরিকের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়েছে। যাকে ইচ্ছা নাম বাদ দিয়েছে ভোটার তালিকা থেকে। এসবের প্রতিবাদ করা যাবে না? আন্দোলন কমিশনের বিরুদ্ধে। বিজেপি কেন কমিশনকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে? সন্দেহের সূত্রপাত সেখান থেকেই। এই ভুল বিজেপি করছে কেন?
এবার আন্দোলনে যুক্ত হয়ে গিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি। অর্থাৎ মূলত ছাত্র যুবদের জেন জি। যারা সাফল্য পেয়েছে একটি আন্দোলনে। তাদের সঙ্গে এবার মূলস্রোতের প্রথাগত রাজনৈতিক দলও একইভাবে রাস্তায় নেমেছে। একের পর এক নাগরিক মঞ্চ যুক্ত হচ্ছে। ক্রমেই রূপ নিচ্ছে গণ আন্দোলনের। অতএব বিজেপি যেন একবার সোনার গদি থেকে নেমে এসে সাধারণ মানুষের মন বোঝার চেষ্টা করে! নচেৎ অতীতের ছাত্র তথা গণ আন্দোলনের পরিণতির পুনরাবৃত্তি কখন হবে কেউ বলতে পারে না!


