


সংবাদদাতা, রামপুরহাট: পয়লা বৈশাখ নববর্ষে ব্যবসায়ীরা নতুন হালখাতা করেন। আধুনিকতার যুগে বাঙালির ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বসেছে। হারাতে বসেছে হালখাতার সংস্কৃতি। একসময় পয়লা বৈশাখের প্রায় ১৫দিন আগে থেকে দোকানে দোকানে ব্যস্ততা শুরু হয়ে যেত। ব্যবসায়ীরা কার্ড ছাপিয়ে শহর থেকে গ্রাম ঘুরে ঘুরে তাঁদের ক্রেতাদের পয়লা বৈশাখের নিমন্ত্রণ করতেন। বছরের প্রথম দিনে ব্যবসায়ীরা ধর্মীয় আচার পালনের পর হালখাতা শুরু করতেন। হালখাতা মূলত পাওনা টাকা আদায় করা করা। যেখানে বকেয়া আদায়ের লেনদেনে ক্রেতা- বিক্রেতাদের সম্পর্ক দৃঢ় হতো। মিষ্টিমুখ করানোর সঙ্গে নতুন বছরের ক্যালেন্ডার তুলে দিতেন।
কিন্তু বর্তমানে ঝাঁ চকচকে শপিং মল, অনলাইন কেনাকাটা, ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহারে ঐতিহ্য হারাচ্ছে হালখাতা। এখন শুধু ঐতিহ্য মেনে হালখাতা হয়। রামপুরহাটের বস্ত্র ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি সুশীল বান্টিয়া বলেন, আগে যেমন একটি দোকান থেকে সারাবছর জিনিসপত্র কেনাকাটা করত। পয়লা বৈশাখে সেই হিসেব মিটিয়ে ক্রেতা-বিক্রেতা নতুনভাবে পথ চলা শুরু করতেন। বর্তমানে বিভিন্ন শপিং মল, অনলাইন বিপণি হয়েছে। সেখানে এমন লেনদেনের সুবিধা নেই। বহু ক্রেতা তাতেই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। ফলে ধারে কেনার প্রবণতা অনেকটা কমে এসেছে। আবার এখন ক্রেডিট কার্ডের সুবিধা ভোগ করছেন অনেক ক্রেতা। দোকানে জিনিসপত্র কেনার পর সেই কার্ডের মাধ্যমে পেমেন্ট করে যাচ্ছেন। তাছাড়া অনেকে ব্যবসায়ী এয়ার এন্ডিং, অক্ষয় তৃতীয়া করছেন। আবার অনেকে কালীপুজোর সময় হালখাতা করেন। সব মিলিয়ে পয়লা বৈশাখে হালখাতা সংস্কৃতি ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা বলেন, এখন বকেয়া থাক বা না থাক কিছু ক্রেতাকে কার্ড পাঠিয়ে নিমন্ত্রণ করি। যাদের বকেয়া নেই তাঁদের অনেকেই আসেন না। বিশেষ করে আগে পয়লা বৈশাখের দিন সোনার দোকানগুলিতে ক্রেতাদের আনাগোনায় গমগম করত। ক্রেতাদের ঠান্ডা পানীয় ও স্পেশাল লাড্ডু খাইয়ে মিষ্টিমুখ করাতেন দোকানিরা। ক্রেতারা বকেয়া পাওনা মিটিয়ে লাড্ডুর প্যাকেট, ক্যালেন্ডার নিয়ে বাড়ি ফিরতেন। কিন্তু এখন বিভিন্ন সংস্থার সোনার শোরুম খুলে গিয়েছে। সেখানে অবশ্য ধার চলে না। তবুও নানা ডিজাইনের গয়না পরে পচ্ছন্দের জন্য অনেকেই সেইসব শোরুমমুখী হচ্ছেন। ফলে এখন অধিকাংশ সোনার দোকানে হালখাতা শুধু নিয়মরক্ষার আনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির চর্চা ও আধুনিকতার প্রভাবে ঐতিহ্য হারাচ্ছে পুরনো সংস্কৃতি, বলছেন ব্যবসায়ীরা।
নলহাটির স্বর্ণ ব্যবসায়ী বিশ্বজিৎ কর্মকার বলেন, নানা কারণে ধার বাকিতে কাজ দিন দিন কমে আসছে। আগে প্রায় দু’হাজার ক্রেতার বাড়িতে কার্ড পাঠিয়ে নিমন্ত্রণ করতাম। বসে খাওয়ানোর পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের জন্য মিষ্টির প্যাকেট, ক্যালেন্ডার তুলে দিতাম। মাইক ভাড়া করে নিয়ে এসে দোকানের সামনে বাজাতাম। বছর দুয়েক ধরে কিছু ক্রেতাকে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠিয়ে নিমন্ত্রণ করি। যাঁরা আসেন তাঁদের মিষ্টিমুখ করানো হয়। আগের মতো সেই রমরমা নেই। সব মিলিয়ে হালখাতা সংস্কৃতি ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে বাঙালির জীবন থেকে।