মণিরাজ ঘোষ, খড়্গপুর: ‘সেই সাপ জ্যান্ত, গোটা দুই আনতো’ সুকুমার রায়ের ‘বাবুরাম সাপুড়ে’ শিশু সাহিত্যের পাতায় চির-অমর। বাস্তবে যদিও সাপ নিয়ে ‘ছেলেখেলা’ করা অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং আইনত অপরাধ। স্বাস্থ্যদপ্তরের পরিসংখ্যানও সেকথাই বলছে। গত ৮ মাসে(আগস্ট পর্যন্ত) পশ্চিম মেদিনীপুরে প্রায় চার হাজার মানুষ সাপের কামড় খেয়েছে। এর মধ্যে বিষধর সাপের ছোবল খেয়েছেন প্রায় ১৪০০ জন। মৃত্যু হয়েছে ২৫ জনের। আক্রান্ত ও মৃতের তালিকায় সাধারণ মানুষের পাশাপাশি রয়েছেন সাপ উদ্ধারকারী ‘সর্পবন্ধু’রাও। গত দু’সপ্তাহের ব্যবধানে পশ্চিম মেদিনীপুরের দুই সর্পবন্ধু তপন সিংহ এবং মলয় ঘোষ বিষাক্ত সাপের ছোবল খান। শেষ মুহূর্তে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও মেদিনীপুর গ্রামীণের বাসিন্দা তপনবাবুকে বাঁচানো যায়নি। গত ৩১ আগস্ট তাঁর মৃত্যু হয়। ঘাটালের মলয়বাবু অবশ্য সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গিয়েছেন।
স্বাস্থ্যদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুলাই মাস পর্যন্ত জেলায় সাপের কামড়ের ঘটনা ৩৬৬০টি। এর মধ্যে ১২৯৮ জনের শরীরে বিষক্রিয়ার লক্ষণ দেখা গিয়েছে। বিষক্রিয়ার ধরন অনুযায়ী ৯৬৭টি ক্ষেত্রে হেমোটক্সিক এবং ৩১১টি ক্ষেত্রে নিউরোটক্সিক বিষক্রিয়ার প্রমাণ মিলেছে। ২০টি ক্ষেত্রে দুই ধরনের বিষক্রিয়াই ছিল। জুলাই মাস পর্যন্ত সাপের কামড়ে মৃত্যু হয়েছে ২১ জনের। আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসের পরিসংখ্যান যোগ করলে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা যথাক্রমে ৪ হাজার ও ২৫ ছাড়িয়ে যাবে বলেই স্বাস্থ্যদপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে। স্বাস্থ্যকর্তাদের মতে, বর্ষার সময় সাপের আনাগোনা বাড়ে। মাঠ, ঝোপঝাড়, বাড়ির আশপাশ কিংবা জলমগ্ন এলাকায় কাজ করার সময় বাড়তি সতর্কতা জরুরি। সেই সঙ্গে সাপ দেখলেই বনদপ্তরে খবর দেওয়া উচিত। সেটিকে ধরতে গিয়ে বিপদ ডেকে আনা উচিত নয় বলে জানিয়েছেন জেলার স্বাস্থ্যঅধিকারিকরা।
জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য অধিকারিক সৌম্যশঙ্কর ষড়ঙ্গী বলেন, সাপের কামড়ের পর ওঝা, গুনিন বা ঝাড়ফুঁকের উপর নির্ভর না করে, আক্রান্তকে দ্রুত নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। এক্ষেত্রে প্রথম একশো মিনিট খুবই গুরুত্বপূর্ণ!’ জেলার প্রতিটি হাসপাতালে পর্যাপ্ত এভিএস (অ্যান্টিভেনম সিরাম) আছে বলেও জানিয়েছেন সিএমওএইচ। সেইসঙ্গেই তাঁর বার্তা, সামাজমাধ্যমে জনপ্রিয় হওয়ার জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাপ ধরা বা ভিডিয়ো করার চেষ্টা থেকে বিরত থাকতে হবে। সাপকে নিরাপদ দূরত্বে রেখে প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী বা বনদপ্তরে খবর দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
একই কথা জানিয়েছেন মেদিনীপুর শহরের সুপরিচিত ও প্রশিক্ষিত ‘সর্পবন্ধু’ দেবরাজ চক্রবর্তীও। তিনি বলেন, ‘অনেকেই এখন ভিডিয়ো বা রিলস করার জন্য সাপ ধরার চেষ্টা করছেন। উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ছাড়া এই ধরনের কাজ করা খুবই বিপজ্জনক।’ তিনি এও বলেন, ‘সাপে কামড়ালে ওঝার কাছে নয়, হাসপাতালে যান। গত সপ্তাহেই কেশিয়াড়িতে এক নাবালিকাকে সাপে কামড়ানোর পর ওঝার কাছে নিয়ে যায় পরিবার। গোল্ডেন টাইম নষ্ট করায় তার মৃত্যু হয়। প্রশাসন ও স্বাস্থ্যদপ্তরকে আরও বেশি করে সচেতনতামূলক কর্মসূচি নিতে হবে।’