সংবাদদাতা, রামপুরহাট: সাধারণত বিজয়া দশমীতে দেবী বিসর্জনের পর বিষাদের সুরে সিঁদুর খেলায় মাতেন মহিলারা। কিন্তু রামপুরহাটের খরুণ গ্রামের সাড়ে তিনশো বছরের প্রাচীন রায়বাড়ির ছবিটা সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে দশমী পর্যন্ত অপেক্ষা নয়, দেবী আগমনের সূচনাতেই অর্থাৎ মহাসপ্তমীর সকালেই সধবা মহিলারা ঐতিহ্যবাহী সিঁদুর খেলায় মাতেন। আর রায়বাড়ির ঠিক পাশের কর্মকার পরিবারে আবার সিঁদুর খেলা হয় মহাষ্টমীতে। একই গ্রামে দুই পারিবারিক পুজো ঘিরে এমন বৈচিত্র্যময় প্রথা দেখতে প্রতিবছর ভিড় জমান আশপাশের অসংখ্য মানুষ।
রায়বাড়ির সদস্য অমিতকুমার রায় জানান, তাঁদের পুজো ৩৫৩ বছরে পা দেবে এবার। মহাসপ্তমীর সকালে দোলা এনে মায়ের বন্দনা ও আবাহনের পরেই রায়বাড়ির চণ্ডীমণ্ডপ রঙিন হয়ে ওঠে সিঁদুরের লাল রঙে। যেখানে বাংলাজুড়ে নবমী-দশমীতে বিসর্জনের সুরে সিঁদুর খেলা হয়, সেখানে খরুণ গ্রামের রায়বাড়িতে দেবীর আগমনী সুরেই শুরু হয় এই আনন্দ উৎসব।
এই পুজোর নেপথ্যে রয়েছে এক অলৌকিক ইতিহাস। তৎকালীন জমিদার রামনিধি রায় ও রামকানাই রায়-দুই ভাই প্রথম মাটির মূর্তি গড়ে পুজো শুরু করেন। কিন্তু একবছর মহাষ্টমীর সন্ধ্যায় রায়বাড়ির এক কুমারী মেয়ে দেবীকে প্রদীপ দেখাতে গিয়ে নিখোঁজ হন। পরে দেবীর মুখে সেই কুমারীর শাড়ির একাংশ দেখা যায়! সেই ঘটনার পর থেকেই মাটির প্রতিমার পরিবর্তে পটের এবং বর্তমানে শোলার প্রতিমায় পুজো হয়ে আসছে। প্রতিবছর মহালয়ার সকালে সারাবছর ধরে পূজিত প্রতিমা নিজস্ব দিঘিতে বিসর্জন দিয়ে, পরের দিন প্রতিপদ থেকে নতুন ঘট ভরে ও সাদা ছাগ বলিদানের মাধ্যমে নতুন পুজো শুরু হয়।
রায়বাড়ির চণ্ডীমণ্ডপের কয়েক হাত দুরেই কর্মকার বাড়ি। তবে রায়বাড়িতে যখন সপ্তমীর সকালে সিঁদুর খেলা হয়, তখন কর্মকার বাড়ির মহিলারা মেতে ওঠেন মহাষ্টমীতে।
কর্মকার বাড়ির প্রবীণ সদস্য সন্তোষ কর্মকার ও তামালকৃষ্ণ কর্মকারের কথায়, রায়বাড়ির সঙ্গে এক সামাজিক দ্বন্দ্ব থেকে সাত পুরুষ ধরে চলে আসা তাঁদের এই পুজোর জন্ম হয়েছিল। অতীতে কর্মকারদের জমিজমা ও সম্পত্তি ছিল অনেক বেশি, অন্যদিকে রায়রা ছিলেন জমিদার ও ব্রাহ্মণ। মূলত আভিজাত্যের দ্বন্দ্ব থেকেই রায়বাড়ির দেখাদেখি কর্মকার পরিবারও পটের মূর্তি গড়ে নিজস্ব পুজোর সূচনা করেছিল। কর্মকার বাড়িতেও মহালয়ায় রায়বাড়ির মতোই সারাবছর ধরে পূজিত প্রতিমাটি বিসর্জন দিয়ে প্রতিপদ থেকে শুরু হয় পুজো।
রায় ও কর্মকার- দুই বাড়ির পুজোর আরও একটি বিশেষ রূপ হল, এখানকার মূর্তিতে দেবী দুর্গার সঙ্গে কেবল লক্ষ্মী ও সরস্বতী থাকেন। থাকে না কার্তিক, গণেশ। যদিও মন্ত্রপাঠে তাঁদেরও পুজো হয়। দুই পরিবারের পুজোতেই সপ্তমী থেকে নবমীতে বলিদান হয়। বংশপরম্পরায় দুই বাড়ির এই অনন্য শোলার মূর্তি গড়ে আসছেন গ্রামেরই শোলাশিল্পী বুদ্ধদেব মালাকার।



