সংবাদদাতা, ডোমকল: বেলা গড়িয়ে সূর্য পশ্চিম আকাশে। নাকে-মুখে গামছা বেঁধে তখনও শাঁখ কেটে চলেছেন কারিগররা। বছর পঞ্চাশের এক অভিজ্ঞ কারিগরের হাতের ছোঁয়ায় শাঁখার গায়ে ফুটে উঠছে হরেক বাহারি নকশা। চারদিকে সামুদ্রিক শঙ্খের ঝাঁঝালো গন্ধ। কিছুদিন বাদেই যে দুর্গাপুজো। তার আগে পুজোর বাজার ধরতে এখন থেকেই ডোমকলের বাজিতপুর, লক্ষীনাথপুর, জিতপুরের শাঁখা-শঙ্খের পাড়াগুলিতে ব্যস্ততা তুঙ্গে। পুজোর মরশুমে ব্যবসা বাড়ার আশায় বুক বাঁধছেন ডোমকলের শাঁখারি পরিবারগুলি।
‘অশান্তি-বিস্ফোরণের মুলুক’ হিসেবে রাজ্যজুড়ে চর্চিত এই ডোমকল। কিন্তু সেই ডোমকলের পাড়াগুলিতেই একেবারেই ভিন্ন ছবি দেখা যাবে। বহু বছর ধরে বাজিতপুর, লক্ষ্মীনাথপুর ও জিতপুরের শাঁখারি পরিবারগুলির বাস। তাঁদের হাত ধরেই এলাকায় গড়ে উঠেছে শতাব্দী প্রাচীন শাঁখা-শঙ্খ শিল্প। বর্তমানে ওই এলাকার বহু পরিবারই এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাঁদের হাতের কাজেই টিকে রয়েছে শিল্প।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, ডোমকলের তৈরি শাঁখা-শঙ্খ এখন শুধু জেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের পাশাপাশি দেশের একাধিক জায়গাতেও যায়। এমনকী নেপাল ও বাংলাদেশের বিভিন্ন ঠাকুরঘরেও পৌঁছায় ডোমকলের শঙ্খ। সময়ের সঙ্গে এই পেশায় নতুন অনেক পরিবারও যুক্ত হয়েছে।
তবে ব্যবসায়ীদের একাংশের দাবি, গত কয়েক বছরে নানা কারণে ব্যবসায় কিছুটা মন্দা রয়েছে। কম দামে নিম্নমানের সামগ্রী বাজারে আসায় এলাকায় তৈরি শাঁখা-শঙ্খের বাজারে তার প্রভাব পড়ছে। অসৎ ব্যবসায়ীদের একাংশ গুণমানের সঙ্গে আপস করে কম দামে সামগ্রী বিক্রি করায় সামগ্রিকভাবে এলাকার শিল্পের নামও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে দাবি তাঁদের।
সামনে দুর্গাপুজো। আর ঘুরে দাঁড়াতে পুজোর মরশুমই এখন শাঁখারি পরিবারগুলির ভরসা। পুজোর সময়ে মণ্ডপ, মণ্ডপ মুখরিত হয় শঙ্খের ধ্বনিতে। সঙ্গে ঘরে ঘরে বধূর হাতে শোভা পায় নতুন নতুন শাঁখার জোড়া। এবারও হাতে আর মাত্র কয়েকটা সপ্তাহ বাকি। তাই এখন থেকেই পুজোয় লাভের আশায় কোমর বেঁধে নাওয়া খাওয়া ভুলে শাঁখা-শঙ্খ তৈরিতে নেমেছেন ব্যবসায়ীরা। পাড়াজুড়ে চলছে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে পরিশ্রম।
ব্যবসায়ী আইনুল ইসলামের কথায়, কয়েকদিন বাদেই পুজো। এই সময়ে শাঁখার চাহিদা বাজারে ভালই থাকে। আশা করি, এবারও ব্যতিক্রম হবে না।
প্রসঙ্গত, তামিলনাড়ু ও চেন্নাই সহ দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলি থেকে ডোমকলে আসে শঙ্খ। এরপর শুরু হয় প্রক্রিয়াকরণ। প্রক্রিয়াকরণ শেষে শঙ্খ কেটে তার আকার দেওয়া, ঘষে মসৃণ করা, পালিশ এবং শেষে শিল্পীর হাতে নকশা তৈরির পর তা পৌঁছায় বাজারে। পরবর্তীতে ডোমকলের সেই শাঁখা-শঙ্খই পুজোর আগে ছড়িয়ে পড়ে রাজ্য ও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।