কলেরায় বিলীন গ্রাম, আদুরিয়ার জঙ্গলে শালকো কালী মহামারী ইতিহাসের সাক্ষী
  • ৩১ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

অনিমেষ মণ্ডল, কাটোয়া: আউশগ্রামের আদুরিয়ায় গভীর জঙ্গলে আজও বৈদ্যুতিক আলো নিভিয়েই পুজো হয় শালকো কালী মায়ের। টিনের ছাউনি দেওয়া বেদিতেই নিঃশব্দেই দেবীর পুজো হয়। শালকো গ্রামে এখন আর কেউ থাকেন না। তবে, গ্রামে কালীপুজোর রাতে ফিরে আসেন সবাই। পুজো ঘিরে মেতে ওঠেন আশেপাশের সমস্ত গ্রামের বাসিন্দারা। 

Advertisement

আউশগ্রাম-২ ব্লকের অমরপুর অঞ্চলেই অবস্থিত আদুরিয়া জঙ্গল। আদুরিয়া গ্রাম থেকে প্রায় দু’ কিমি দুরে শালবনের মধ্যে রয়েছে একটি মায়ের বেদি। জনশ্রুতি, ওই বেদির তলায় নাকি রয়েছে পঞ্চমুণ্ডির আসন। সেই আসনের ওপরেই মা  কালীকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন অতীতের শালকো গ্রামের বাসিন্দারা। সেই থেকেই এই শ্মশানকালীর পুজো হয়ে আসছে। পুজোর নেপথ্যে রয়েছে এক করুণ ইতিহাস। 
বাংলায় তখন কলেরার মহামারী লেগেই থাকত। গাঁ উজাড় করে মারা যেত মানুষ। মহামারীর হাত থেকে রেহাই মেলেনি শালকো গ্রামও। ভয়ে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যান বাসিন্দারা। একজনও কেউ অবশিষ্ট ছিলেন না। তারপর ধীরে ধীরে সময়ের গর্ভে তলিয়ে যায় ছবির মতো  সাজানো গ্রাম। এখন শুধুই শালবন। জনবসতি নেই। থেকে গিয়েছে মায়ের ওই বেদিটি। নির্জন জঙ্গলের মধ্যেই কালী মা একাই বিরাজ করেন বলে বিশ্বাস পড়শি গ্রামের বাসিন্দাদের। তাই আদুরিয়া জঙ্গলের মধ্যেই দীপান্বিতা অমাবস্যায় তাঁরা শালকো কালীর পুজো করেন পুরানো প্রথা মেনে। উন্মুক্ত স্থানে বৈদ্যুতিক আলো নিভিয়ে গভীর রাতে দেবীর আরাধনা করেন সকলেই। 
বাসিন্দারা জানান, এই জঙ্গলের ভিতর একদা আস্ত এক গ্রাম ছিল। সেই গ্রামের নাম ছিল শালকো। দুই শতাধিক পরিবারের বসবাস ছিল। বহু বছর আগে গ্রামে কলেরা রোগ দেখা দেয়। গ্রামের বহু মানুষ কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। অনেকেরই তখন শেষ অবস্থা। সেসময় রাতারাতি গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছিলেন বাকি গ্রামবাসীরা। তাঁরা শালকো গ্রাম থেকে উঠে গিয়ে আদুরিয়া, জালিকাঁদর, গোয়ালআড়া প্রভৃতি গ্রামে আশ্রয় নেন। তারপর আর কেউ ফিরে আসেননি। পরিত্যক্ত ঘরবাড়ি জঙ্গলের মধ্যেই হারিয়ে যায়।  গ্রাম ছাড়ার আগে শালকো গ্রামের অধিষ্ঠাত্রী দেবী কালীকেও তখন অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন গ্রাম ছেড়ে যাওয়া মানুষজন। কিন্তু দেবী নিজের আসন ছেড়ে অন্যত্র যেতে রাজি হননি বলেই এলাকাবাসীর বিশ্বাস। তাই আজও শালবনের জঙ্গলে এসেই দেবীর পুজো করতে হয় তাঁদের।
গ্রামের বাসিন্দা তুহিন কোনার বলেন, ‘বছরের প্রত্যেক অমাবস্যায় দেবীর পুজো দিতে হয়। মূল পুজো হয় কার্তিকী অমাবস্যায়। পুজোর প্রয়োজন ছাড়া আর কেউ শালকো কালীর স্থানের আশপাশে ঘেঁষেন না। একবার চাঁদা তুলে একটি মন্দির নির্মাণের চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু যতবার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে ততবারই বাধা বিপত্তির সামনে পড়তে হয়েছে। আমাদের বিশ্বাস, দেবী বন্ধ ঘরে থাকতে চান না। তাই, মন্দির তৈরি করা হয়নি। শুধুমাত্র টিনের একটি ছাউনি করে দেওয়া হয়েছে। তবে পুজোর সময় ছাউনির পিছন দিক শালপাতা দিয়ে আড়াল করে দিতে হয়।’ 
এভাবেই শালকো কালী বয়ে চলেছেন বাংলার কলেরা মহামারীর ইতিহাস।-নিজস্ব চিত্র