শ্যামলী রক্ষিত: শ্রাবণের টানা বৃষ্টিতে দামোদর ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। ফুলে ফেঁপে রীতিমতো কালনাগিনীর মতো ফুঁসছে। নদীর ঘোলাটে জল ছুটছে দিগবিদিক। পাড় ভেঙে গর্জন করে ছুটে যাচ্ছে রুদ্ধশ্বাসে। দোতলার বারান্দায় ইজি চেয়ারে বসে কফিতে চুমুক দিচ্ছিল চিত্রনাট্যকর ইমন। কলকাতার কোলাহল ছেড়ে, নিজের আগামী থ্রিলারের স্ক্রিপ্ট শেষ করার জন্যই, এই নির্জন ডাকবাংলোতে এসে কাটাচ্ছেন ক’টা দিন। পাল্লা রোডের সেচ দপ্তরের পুরানো ডাকবাংলো। বেশ মনোরম পরিবেশ এখানকার। থ্রিলারের চিত্রনাট্য লেখার জন্য একেবারে মোক্ষম জায়গা। ইমন মনে মনে থ্যাংকস জানাল বিমুগ্ধকে। খুব ভালো জায়গা চয়েস করেছে তার জন্য। তবে আজই যদি ও আসত সঙ্গে তাহলে খুব ভালো সময় কাটত। এমন সুন্দর ওয়েদার! অবশ্য ও আজই এলে, তার কাজ কমপ্লিট করতে অসুবিধে হত। কাল রাত্রে বিমুগ্ধ এসে পৌঁছাবে। এই সময়টায় তাকে কাজ অনেকখানি এগিয়ে নিতে হবে। এইসব জায়গা তো চট করে পাওয়া যায় না। নেহাত এখানকার বড়োবাবু মহিমদার মামাতো দাদা। তিনিই সমস্ত কিছু ঠিক করে দিয়েছেন। এমন সুন্দর একটা গ্রাম্য পরিবেশ। বর্ষার উত্তাল দামোদর। আর সন্ধে নামতে না নামতেই বাঁশ বনের মাথায় ঝাঁকে ঝাঁকে জোনাকির আলো। অন্ধকারের যে এমন সৌন্দর্য, এমন মহিমা এখানে না এলে তা কোনোদিন উপলব্ধিই করতে পারত না ইমন। গভীর ঘন অন্ধকারের মধ্যে কী অপূর্ব আলোর খেলা। নিজের চোখে না দেখলে বিষয়টি বিশ্বাস করতে পারত না। বাংলোর হলদেটে রং ওঠা দেওয়াল, মেহগনি কাঠের ভারী আসবাব আর দামোদরের একটানা গর্জন, সব মিলিয়ে পরিবেশটা দারুণ রহস্যময়।
চা-টা কি আরেকবার গরম করে আনব বাবু?
ইমন চমকে উঠে, ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, বাংলোর কেয়ারটেকার বনবিহারীদা দাঁড়িয়ে আছে। সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, না না বনবিহারীদা তার দরকার নেই। ঠিক আছে। একটু আরাম করে তারিয়ে তারিয়ে খাচ্ছি আর তোমাদের এই সুন্দর প্রকৃতি দেখছি। তুমি চা খেয়েছ।
আজ্ঞে হ্যাঁ বাবু খেইচি?
তাহলে বসো, তোমার সঙ্গে একটু গল্প করা যাক।
আজ্ঞে আমি আর কী গল্প বলব বলুন বাবু। নেকা পড়া জানি না। গেরামের মুরুক্ষু মানুষ।
মুখ্য কেন হবে! লেখা পড়া না জানলেই কী কেউ মুখ্যু হয়। তোমার অক্ষর জ্ঞান হয়তো নেই। কিন্তু তুমি কিছু জানো না, তা তো নয়। এই দেখ না, এই যে বাংলোটা রয়েছে। এর সম্পর্কে, এই গ্রাম, এই নদী, গাছপালা, এখানকার মানুষজন, রাস্তাঘাট এসব সম্পর্কে তুমি কি কম জানো!
সে তো সবাই জানে বাবু। এখানেই জন্মেছি, বড়ো হয়েছি, এসব তো জানতেই হবে। কিন্তু আসল জিনিস তো নেকা পড়া। সেটাই তো জানি না বাবা।
সে হয়তো জানো না। সেটা তোমার দুর্ভাগ্য। সত্যিই লেখা পড়া না জানলে অনেক ক্ষতি। যাক, দুঃখ কর না। পরের জন্মে পুষিয়ে নিও। এখন আমাকে বল তো, এই বাংলোতে তো আগে অনেক
সিনেমার শ্যুটিং হত, তাই না!
বনবিহারীর চোখেমুখে তখনই একটা পুরানো দিনের স্মৃতি ঝিলিক কেটে উঠল। উৎসাহে চনমনে হয়ে বলল, আরে সে আর বলতে। তোমাদের কলকেতার কত হিরো আর হিরোইন যে এইছেন ত্যাখন। তাপস পাল, শতাব্দী রায় কতবার এইছেন এখেনে। ওই যে দামোদরের চরটা দেখছেন, ওখানে শরৎকালে যখন কাশফুল ফুটত, তখন ক্যামেরা বাবুদের সে কী ভিড়! তবে এখন আর কেউ আসে না। শুনেছি এখন সবাই নাকি বিদেশে যায় শ্যুটিং করতে। তারপর ফিসফিস করে উঠল, ১৯৯২ সালের সেই ঘটনার পর থেকে পরিচালকরা এখানে আসা কমিয়ে দিলেন। বিশেষ করে এই ৩ নম্বর ঘরটায় কেউ আর থাকতে চায় না।
ইমন টান টান হয়ে বসল চেয়ারে। ভাবল ওই ৩ নম্বর ঘরেই তো উঠেছে সে! বুকটা একটু কেঁপে উঠল, অজানা আতঙ্কে। বাইরেটা বেশ অন্ধকার। ঝিঁঝি পোকার ডাক ভেসে আসছে। সোনা ব্যাঙ কোলা ব্যাঙ মিলে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। বাইরে প্রগাঢ় অন্ধকার। অদ্ভুত একটা ছমছমে সন্ধ্যা। সে বুঝতে পারছিল, এই বাংলোতে একা থাকাটা একটু রিস্কি। বিমুগ্ধ আগামী কাল সন্ধের আগেই এসে পৌঁছাবে। কিন্তু আজকের রাতটা তো তাকে থাকতে হবে। সত্যিই একটু ভয় ভয় করছিল আজ। সে শুকনো গলায় ফ্যাসফেসিয়ে জানতে চাইল, কেন দাদা, কী হয়েছিল এই ঘরে?
বনবিহারী চুপ করে, গম্ভীর মুখে বসে ভাবছিল কিছু। তারপর স্বগতোক্তির মতো করে উচ্চারণ করল, সে এক অদ্ভুত কাণ্ড বাবু। রবি ঠাকুরের কোনো গল্প নিয়ে একটা ছবির শ্যুটিং চলছিল তখন। মাঝ রাতে নদীর চরে শ্যুট ছিল। সেই মেয়েটিকে কোথাওই পাওয়া যাচ্ছিল না। চারদিকে অনেক খোঁজাখুঁজি হল। সেই ছিপছিপে সুন্দরী মেয়েটা যেন দামোদরের জলেই কোথাও মিলিয়ে গেল। কোথাও তার সন্ধান পাওয়া গেল না।
থানা পুলিশ করেও কোনো ফল হয়নি বাবু। বেশ কয়েকদিন পর ৩ নম্বর ঘরের পুরানো কাঠের ওই আলমারি থেকে ওই মেয়েটির একটা রুপোর নূপুর পাওয়া গিয়েছিল। সেটা এই আলমারিতে তেমনি ভাবেই রাখা আছে এখনও। মাঝে মাঝেই এই ঘরের মধ্যে নূপুরের শব্দ পাওয়া যায়। বিভিন্ন তিথি নক্ষত্রে এই বাংলোয় সারা জায়গায় একটা সুন্দর গন্ধ ভেসে বেড়ায় হাওয়ায়, আর ঝুমঝুম, ঝুমঝুম শব্দ শুনতে পাওয়া যায়।
ইমন বলল, দুর, তাই কখনো হয় নাকি! এসব ভুল ধারণা, কিছু হয় না।
ঠিক সেই সময় বিমুগ্ধর ফোন এল। ইমন ফোনে কথা বলতে ব্যস্ত হয়ে পড়লে, বনবিহারী রান্না ঘরে চলে গেল রাতের খাবারের বন্দবস্ত করতে।
দ্বিতীয়
বিকেল থেকেই আকাশের মুখ ভার। সন্ধে নামার পর তো দামোদরের চর আর এই গ্রাম যেন একটা ঘন কালচে চাদরে ঢাকা পড়ে গেল। প্রথমে শুরু হল হাওয়া। গোঁ-গোঁ শব্দ করে দামোদরের চর থেকে ধেয়ে আসা সেই বাতাসের বেগ ক্রমশ বাড়তে লাগল। মেহগনি কাঠের জানলাগুলো প্রবল আক্রোশে আছড়ে পড়তে লাগল চৌকাঠে। তারপর শুরু হল প্রকৃতির আসল তাণ্ডব। মুষলধারে বৃষ্টির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ফুঁসে উঠল দামোদর। বর্ষার ঘোলাটে, লালচে জল পাড় ছাপিয়ে দানবের মতো আছড়ে পড়তে শুরু করল চরের ওপর। জলের প্রবল তোড়ে চরের জঙ্গল, ছোটো ছোটো বাঁশঝাড় আর পুরানো গাছের শিকড় উপড়ে ভেসে যেতে লাগল অন্ধকারের দিকে। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে অনেকক্ষণ আগেই। ডাকবাংলোর দোতলায় দাঁড়িয়ে থাকলে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, জলের স্তর কত দ্রুত বাড়ছে। একতলার সিঁড়ির ধাপগুলো একে একে তলিয়ে যাচ্ছে দামোদরের ঘোলা জলে। বাইরের জমাট অন্ধকারে শুধু বিদ্যুতের ঝলকানিতে ক্ষণিকের জন্য দেখা যাচ্ছে নদীর উন্মত্ত রূপ। যেন শত শত ফণা তোলা সাপ হিসহিস শব্দে গ্রাস করতে চাইছে পুরো চরটাকে। বাতাসের একটানা আর্তনাদ আর নদীর পাড় ভাঙার কান ফাটানো শব্দে, বাংলোর পুরানো ভিত পর্যন্ত যেন থরথর করে কাঁপছে। ভয়ে আতঙ্কে ঠকঠক করে কাঁপছিল ইমনও। কী করবে কিছু বুঝতে পারছিল না। সে পাশের ঘরে ছুটে চলে গেল বনবিহারীর কাছে। ঝড়ের গর্জন আর দামোদরের পাড় ভাঙার কান ফাটানো আওয়াজ এ সমস্ত কিছু বনবিহারীর কাজে বিঘ্ন ঘটাতে পারেনি। সে নিজের কাজ করে যাচ্ছে এক মনে। রাতে দেশি মুরগির মাংস আর পরোটা খাবে বলেছে। সারা বিকেল ঘুরে ঘুরে, বৃষ্টিতে ভিজে, মুরোপাড়া থেকে একটা তাগড়াই মোরগ কিনে এনেছে। একা হাতে সে সব কেটে কুটে রেডি করতে অনেকটা সময় লেগেছে তার। ইমন তার ঘরে একা বসে থাকতে পারছিল না। তাই চলে এল বনবিহারীর কাছে। সেখানেই চুপ করে বসে থাকল কিছুক্ষণ। কারেন্ট নেই, চারদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার। কে যেন কাঁঠের সিঁড়ি দিয়ে ধীরে ধীরে ওপরে উঠে আসছে বলে মনে হল তার। হঠাৎ জানলার বাইরের বিদ্যুতের তীব্র ঝলকানিতে বনবিহারীর মুখটা এক মুহূর্তের জন্য আলোকিত হয়ে উঠল। কিন্তু কে ইনি! বনবিহারীদা তো নয়। এ তো অন্য কারও মুখ! কে ও! কিন্তু অন্য কেউ তো থাকার কথা নয়। তারই মনের ভুল নিশ্চয়ই। তবু সে একবার তার ফোনের লাইটটা ফ্ল্যাশ করে অন করে নিল। তারপর নিশ্চিন্তে নিজের ঘরে গিয়ে বসল। বনবিহারীদা আবার এক কাপ চা দিয়ে গেল। গরম চায়ে চুমুক দিয়ে আবার নিজের কাজ নিয়ে বসল ইমন। তখন ঝড় জলের তাণ্ডব অনেকটা কমেছে। প্রকৃতি এখন শান্ত।
সবে ঘড়ির কাঁটা দশটার ঘর ছুঁয়েছে। এরই মধ্যে যেন নিশুতি রাত। মানুষের পৃথিবীর কোনো কোলাহল আর টের পাচ্ছিল না ইমন। বনবিহারীদা বসে বসে ঢুলছিল দেখে, তার রাতের খাবার বেড়ে রেখে দিয়ে, নিজে খেয়ে শুয়ে পড়তে বলেছে। এই ৩ নম্বর ঘরেই টেবিলে তার খাবারটা ঢাকা দিয়ে রেখে গেছে। তারপর সে খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়েছে। সেও প্রায় আধ ঘণ্টা টাক আগে। ইমন এখন জানলার ধারে বসে আছে চুপ করে। সিগারেট খেতে খেতে স্ক্রিপ্টটা নিয়ে ভাবছে। চেষ্টা করছে এই সুন্দর রহস্যময় পরিবেশটাকে কাজে লাগাতে। সিগারেটে একটা মস্ত বড়ো টান দিয়ে, জানলা দিয়ে বাইরের পৃথিবীতে চোখ পড়ল যখন, দেখল বর্ষার কালো মেঘের ধূসর চাঁদোয়া গেছে সরে। আজ ঝুলন পূর্ণিমা। দুধের মতো সাদা ফিকফিকে জ্যোৎস্না। বর্ষায় ধুয়ে যাওয়া, পরিষ্কার গাছের পাতার ওপর এসে পড়েছে। ঠিকরে পড়ছে তার আলো। জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছে উত্তাল দামোদরের বিস্ফারিত শরীর। কানে ভেসে আসছে তার গর্জন। এমন অপূর্ব দৃশ্য থেকে চোখ ফেরাতে পারছে না ইমন। তার মনে হচ্ছে এবার গিয়ে তার ল্যাপটপ নিয়ে বসতে হবে। আজ সারা রাত জেগে তাকে অনেকখানি কাজ সেরে রাখতে হবে। সে জানালার কাছ থেকে সরে এল লিখতে বসবে বলে। এমন সময় একটা অদ্ভুত শব্দ কানে এল তার। শব্দটা আসছে ঘরের কোণে রাখা সেই পুরানো মেহগনি কাঠের আলমারিটার ভেতর থেকে। খুব মৃদু, কিন্তু স্পষ্ট একটা শব্দ। কেউ যেন ভেতরের ড্রয়ারটা খোলার চেষ্টা করছে বলে মনে হল।
ইমন শ্বাস বন্ধ করে খুব ধীরে ধীরে সেই আলমারির দিকে এগিয়ে এল। মরচে ধরা হ্যান্ডেলটা ধরে টান দিতেই ক্যাঁচ করে একটা শব্দ করে দরজাটা খুলে গেল। ভেতরে পুরানো ন্যাপথলিনের গন্ধ আর ধুলো। কিন্তু ড্রয়ারটা একটু খোলা। মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বেলে দেখল, ড্রয়ারের এক কোণে পড়ে আছে একটা পুরানো, জং ধরা মেকআপ বক্স আর একটা সেলুলয়েডের ফিল্ম রোল। হঠাৎ জানলার বাইরের নদীর দিক থেকে একটা ঠান্ডা দমকা হাওয়া ঘরে ঢুকল। আর সেই হাওয়ার সঙ্গে ভেসে এল নূপুরের আওয়াজ!
ইমনের সারা শরীর চুঁইয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। সে আবার গিয়ে জানলার কাছে দাঁড়াল। তখন আকাশে চাঁদ আর মেঘেদের লুকোচুরি খেলা চলছে। একবার ঘন মেঘে ছেয়ে যাচ্ছে চরাচর। আবার তক্ষুনি চাঁদের আলোর ফিনিক।
সেই মায়াময় কুহেলিকা ছড়ানো দামোদরের চরে যেন একটা আবছা ছায়া দাঁড়িয়ে আছে মনে হল ইমনের। ঠিক যেন আশির দশকের নায়িকাদের মতো শাড়ি পরা। কে উনি! স্বর্গের অপসরাদের মতো নৃত্যরত ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে আছে ওই ছায়াশরীর। আকাশে ঘন কালো মেঘ আর নীচে উন্মত্ত দামোদরের গর্জন। বুকের মধ্যে ধুকপুকুনি। মাঝে মাঝে বিদ্যুতের চমক আর সেই নূপুরের ধ্বনি। এসব কিছুর মধ্যে ইমন তার নতুন গল্পের প্লট পেয়ে, আশ্চর্য এক ভালো লাগায় উন্মাদ হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে ছুটে গেল সেই ভয়ংকর দামোদরের দিকে। অসীম অন্ধকার রাত, জনপ্রাণী নেই কোথাও। প্রবল বর্ষণ মুখরিত গ্রাম্য পথ। আগাছার জঙ্গল পেরিয়ে ইমন ছুটে যাচ্ছে সেই নৃত্যরত নটরাজ মূর্তির দিকে। আজ এই মেঘ আর চাঁদের লুকোচুরির খেলা দেখে মনের মধ্যে অদ্ভুত এক অনুভূতির অনুরণন হচ্ছে তার। সে তার স্ক্রিপ্ট লেখার এমন সুন্দর বিষয় আর কোথাও পেত...।