Bartaman Logo
৬ অক্টোবর, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

সব ধর্মের মানুষকে প্রসাদ বিলির শর্ত দিয়েছিলেন বিপ্লবী সুরেশচন্দ্র, ১০০ বছর ধরে প্রথা অক্ষুণ্ণ কামারহাটির চট্টোপাধ্যায় বাড়িতে

সুরেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী। সেই সুবাদে তাঁদের কামারহাটির বাড়িতে আসতেন বহু বিপ্লবী।

সব ধর্মের মানুষকে প্রসাদ বিলির শর্ত দিয়েছিলেন বিপ্লবী সুরেশচন্দ্র, ১০০ বছর ধরে প্রথা অক্ষুণ্ণ কামারহাটির চট্টোপাধ্যায় বাড়িতে
  • ৬ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

বিশ্বজিৎ মাইতি, বরানগর: সুরেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী। সেই সুবাদে তাঁদের কামারহাটির বাড়িতে আসতেন বহু বিপ্লবী। স্বাধীনতা প্রাপ্তির বছর বিশেক আগে বাড়িতে পুজো করার তোড়জোড় হচ্ছে শুনে সুরেশ নিজের দাদাকে বলেছিলেন, পুজোয় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যাঁরাই আসুন, তাঁরা যেন অভুক্ত না ফেরেন। সকলকে প্রসাদ দিতে হবে। তাহলেই আমার পুজোয় সম্মতি। সেই শর্ত মেনে ১৯২৫ সালে চট্টোপাধ্যায় বাড়িতে শুরু হয় দুর্গাপুজো। শুরু ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রসাদ বিতরণ। সে শর্ত অনুযায়ী, বর্তমানেও দেবী দর্শনে আসা পুণ্যার্থীদের প্রসাদ না খাইয়ে ছাড়েন না পরিবারের সদস্যরা।

Advertisement

পুজোর দিন চট্টোপাধ্যায় বাড়ি আসা কোনো মানুষ সে মাঝ রাত হয়ে গেলেও প্রসাদ না খেয়ে ফেরেন না। পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি ভোগ তৈরি ও পুজোর আয়োজনে হাত লাগান আত্মীয়স্বজনরা। পাশের মুসলমান ও হিন্দু পাড়ার কয়েক হাজার মানুষ পুজোর দিন প্রসাদ পান।
ভক্তি সহকারে দুর্গাকে ডাকলে জটিল রোগ বালাইও সেরে যায়। তাই মানত করেন ভক্তরা। তারপর মানত পূরণ হওয়ায় পর দুর্গার কাছে প্রসাদ নিতে চট্টোপাধ্যায় বাড়িতে আসেন। কামারহাটির গঙ্গা লাগোয়া ঠাকুরদাস চ্যাটার্জি স্ট্রিটের বাসিন্দা ছিলেন রামচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তিনি তৎকালীন বাংলার নামকরা এক বীমা কোম্পানির বড়ো মাপের এজেন্ট ছিলেন। বাড়ি লাগোয়া সর্বজনীন পুজোর অন্যতম উদ্যোক্তাও ছিলেন। কিন্তু ওই সর্বজনীনের সঙ্গে পুজো ঘিরে মতান্তর হয়। তারপর নিজের বাড়ি পুজো করার সিদ্ধান্ত নেন। সে সময়ই ভাই বিপ্লবী সুরেশচন্দ্র তাঁকে ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে প্রসাদ খাওয়ানোর অনুরোধ করেছিলেন।
আগে এ বাড়িতে প্রতিমা তৈরি হত। এখন হয় না। এখন পঞ্চমীতে বাইরে থেকে মূর্তি নিয়ে আসা হয়। ষষ্ঠীতে বোধনের পর দুর্গাদালানে শুরু হয় দেবীর আরাধনা। চট্টোপাধ্যায় বাড়ির ভোগে চমক আছে। তা চোখে পড়ার মতো। প্রায় রাজকীয় আয়োজন। সাদা ভাত, ফ্রায়েড রাইস, পোলাও, ঘি-ভাত, খিচুড়ি, পাঁচরকম ভাজা, শুক্তো, ফুলকপি সহ নানা আনাজের ব্যঞ্জন, পনির, চাটনি, পায়েস, দই ও মিষ্টি থাকে। ভোগে দেওয়া হয় আমিষ। সপ্তমীতে কাতলা মাছের কালিয়া। বাকি দু’দিন ইলিস ভাপা ও মাছের নানা পদ। প্রতিদিন রাতে শীতল ভোগ। থাকে লুচি, হালুয়া, মিষ্টি সহযোগে বিভিন্ন আয়োজন। দশমীতে দুর্গা খুশি পান্তাভাতে। তার সঙ্গে বাসি কচুশাক, পাঁচরকম ভাজা, অড়হড় ডাল ও চালতার চাটনি। 
নবমীতে বিশেষ আচার। বেদী থেকে বলি কাঠ উঠে যাওয়ার পর সেই মাটি তুলে পরিবারের সদস্যরা একে অপরকে মাখিয়ে দেন। এরপর কাদা মাখামাখি হয়ে সকলে যান গঙ্গাস্নানে। পরিবারের নতুন প্রজন্মের সদস্য তথাগত চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘বাড়ির প্রবীণদের নেতৃত্ব ও পরামর্শে আমরা রীতি মেনে দুর্গার আরাধনায় করি। কোনো খামতি রাখি না। মায়ের আরাধনার পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নাচ-গান সহ নানান সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও খেলার আসর বসে।’ পরিবারের বর্ষীয়ান সদস্য তুষার চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘মায়ের প্রসাদ খেয়ে এলাকার কত রোগী সুস্থ হয়েছেন! পুজোর দিন বড়ো কোনো সমস্যা না হলে পরিবারের সবাই বাড়িতে আসেন। মিলিত হন। না পারলেও অনলাইনে মাতৃ আরাধনা করেন।’

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ