সংবাদদাতা, রঘুনাথপুর: একটা সময় ছিল যখন যাত্রা গ্রাম বাংলার বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম ছিল। টিভি, মোবাইল, ডিজে-র দাপটে সেই যাত্রাশিল্প হারিয়ে যেতে বসেছিল। কিন্তু সেই পুরনো যাত্রার ঐতিহ্য আবার ফিরে আসছে। এবার দুর্গা পুজো উপলক্ষ্যে আবার ঘুরে দাঁড়াচ্ছে সেই হারিয়ে যাওয়া যাত্রাশিল্প। রঘুনাথপুর মহকুমার প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতে ফিরে এসেছে যাত্রার জৌলুস। খোঁজ নিয়ে জানা গিয়েছে, এবার পুজোয় রঘুনাথপুর মহকুমাতেই শতাধিক গ্রামে যাত্রার আসর বসছে। সাঁতুড়ি, নিতুড়িয়া, রঘুনাথপুর ১ ও ২, কাশীপুর ব্লকের প্রায় প্রতিটি বড় গ্রামেই চলছে প্রস্তুতি। ইতিমধ্যে একাধিক গ্রাম তাদের শেষ মুহূর্তের মহড়া সেরে নিয়েছে। অষ্টমী থেকে টানা লক্ষ্মীপুজো পর্যন্ত যাত্রা চলবে।
উল্লেখ্য, গ্রাম বাংলার যাত্রার বিশেষত্ব হল, এখানে বাইরের কোনো পেশাদার দল ভাড়া করা হয় না। গ্রামেরই স্কুল শিক্ষক, রাজনৈতিক নেতা, চাষি, কারখানার শ্রমিক, কলেজপড়ুয়া যুবকরাই অভিনেতা। কেউ সাজেন রাজা, কেউ মন্ত্রী, কেউবা নায়ক। শুধুমাত্র মহিলা চরিত্রের নায়িকাদের বাইরে থেকে নিয়ে আসা হয়। কিছু গ্রামে মেয়েরাও অভিনয় করে। সন্ধ্যে হলেই ক্লাব ঘর বা কমিউনিটি হলে বসছে আসর। আয়োজকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে, বর্তমানে সামাজিক পালার চাহিদাই বেশি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক, সামাজিক অবক্ষয় ও ভেঙে পড়া সমাজ ব্যবস্থা কেন্দ্রীক যাত্রাপালাগুলির গুরুত্ব বেশি করে তুলে ধরা হচ্ছে। রঘুনাথপুর -২ নম্বর ব্লকের জেলা পরিষদ সদস্য তথা যাত্রা শিল্পী অভিজিৎ মুখোপাধ্যায় বলেন, ছোটবেলা থেকে বাবা-কাকাদের যাত্রা দেখে বড় হয়েছি। মাঝে কয়েক বছর ডিজে-র জন্য যাত্রার জৌলুস কমে গিয়েছিল। পাশাপাশি বর্তমানে যাত্রাপালায় প্রচুর খরচ। এবং সকলের হাতে সময় কম। ফলে গ্রাম বাংলায় যাত্রার প্রতি আগ্রহ কমেছিল। তবে বর্তমানে সেই ঐতিহ্য আবার ফিরে আসছে। গ্রামের মানুষ আবার যাত্রা দেখতে চাইছে। তাই আমরাই উদ্যোগ নিয়ে শুরু করেছি। কেন ফিরছে যাত্রা? স্থানীয় প্রবীণদের মতে, যাত্রা শুধু বিনোদন নয়, এটি একটি মিলনক্ষেত্র। পুজোর চারটে দিন গ্রামের যে মানুষরা সারা বছর কাজের জন্য বাইরে থাকে, তারা বাড়ি ফিরে আসেন। যাত্রার আসরেই সবার দেখা হয়, সুখ-দুঃখের গল্প হয়। তাছাড়া যাত্রার মাধ্যমে সামাজিক বার্তাও দেওয়া যায়, যা মোবাইলে সম্ভব নয়।
যাত্রা শিল্পী দুই শিক্ষক বাপি মণ্ডল, দেবাশিস শান্তিকারী বলেন, আমরা পেশাদারী শিল্পী নই, ভালবেসে অভিনয় করি। মানুষের হাততালি আমাদের পুরস্কার। গ্রাম ছেড়ে অন্য গ্রামেও যাত্রার অভিনয় করতে যাই। বর্তমান যুব সমাজের হাতে সময় কম, তাই তারা যাত্রা বিমুখ হয়ে পড়েছে। তবে বর্তমানে আবার নতুন করে গ্রাম বাংলা যাত্রা জেগে উঠছে। এটা সমাজের পক্ষে একটা ভালো দিক। জেলা প্রশাসনের তরফ থেকে জানানো হয়েছে, শান্তিপূর্ণভাবে যাত্রা পরিচালনার জন্য সব রকম সহযোগিতা করা হচ্ছে। প্রতিটি আসরেই পুলিশি নজরদারি থাকছে। সব মিলিয়ে এবার পুজোয় গ্রাম বাংলায় যাত্রাকে ঘিরে নতুন করে উন্মাদনা তৈরি হয়েছে। হারিয়ে যাওয়া এক সংস্কৃতি আবার ফিরে পাচ্ছে তার প্রাণ।



