


নিজস্ব প্রতিনিধি, পুরুলিয়া: রামনবমীর দিন পুরুলিয়া শহরে মাংসের দোকান বন্ধ রাখার নিদান দিয়ে কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন পুরসভার চেয়ারম্যান নব্যেন্দু মাহালি। মঙ্গলবার সেই প্রসঙ্গে বক্তব্য রাখতে গিয়েই সম্পূর্ণ পাল্টি খেলেন তিনি। সাফ জানিয়ে দিলেন, ‘নবমীর দিন মানুষ তো কব্জি ডুবিয়ে মাংস খাবেই। এটাই তো বাঙালির সংস্কৃতি। যুগ যুগ ধরে চলে আসছে।’ হঠাৎ চেয়ারম্যানের কেন এই ভোলবদল, সেই নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে শহরজুড়ে।
রামনবমীর দিন পুরুলিয়ার পুর এলাকায় মাংসের দোকান বন্ধ রাখার ফতোয়া জারি করেছিলেন চেয়ারম্যান। তিনি বলেছিলেন, ‘শহরের বুকে যে সমস্ত কসাইখানা, খাসি ও মুরগির মাংসের দোকান রয়েছে, তা বন্ধ রাখার জন্য আবেদন জানিয়েয়েছিলাম। কোনও সরকারি নির্দেশ নয়, আমি নিজে পুরপ্রধান হিসেবে বারণ করেছিলাম। ব্যবসায়ীরা আমার আবেদনে সাড়া দিয়েছেন।’ তাঁর এই মন্তব্যে সমালোচনার ঝড় উঠেছিল। নবমীরদিন কেন মাংসের দোকান বন্ধ থাকবে? সেই প্রশ্ন তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন শহরবাসীর একাংশ। বাংলায় নবমীতে তো মাংস খাওয়ার প্রচলন রয়েছে। বহু জায়গায় নবমীর দিন বলিও হয়। আচমকা মানুষের খাদ্যাভাসে হস্তক্ষেপ কেন? বিহার, উত্তরপ্রদেশের এই সংস্কৃতির প্রতিফলন পুরুলিয়া শহরে দেখে বিব্রত হয়েছিলেন দলের নেতারাও। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন, ‘কে কী খাবে, কী পরবে? তাতে হস্তক্ষেপ করার অধিকার পুরপ্রধানকে কে দিয়েছেন?’ চেয়ারম্যানের ওই সিদ্ধান্ত তৃণমূলের নীতি-আদর্শের পরিপন্থী বলেও দলের কেউ কেউ আড়ালে-আবডালে বলছিলেন। তাঁদের কথায়, বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে আমিষ বন্ধের ফতোয়া জারি হলে তৃণমূল সমালোচনা করে। সেটাই দস্তুর।
কিন্তু ঘটনার দু’সপ্তাহ পর নববর্ষের দিন কেন ভোল বদলে ফেললেন চেয়ারম্যান? রাজনীতির কারবারিদের ব্যাখ্যা, ঘরে-বাইরে তুমুল সমালোচনার মধ্যে পড়ে নিজের অবস্থান বদলাতে একরকম বাধ্য হলেন তিনি। এদিন, জেলা তথ্য সংস্কৃতিদপ্তরে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন চেয়ারম্যান। সেখানে তিনি বলেন, ‘অষ্টমীর সারাদিন উপবাস করার পর নবমীর দিন তো মাছভাত খেতে হবে। কব্জি ডুবিয়ে খাসির মাংসও খেতে হবে। বাঙালির মধ্যে এই ব্যাপারটা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে।’ তা হলে কেন মাংসের দোকান বন্ধ রাখতে বলেছিলেন?
জবাবে চেয়ারম্যান বলেন, ‘রামনবমীকে কেন্দ্র করে বর্তমান পরিস্থিতির বদল হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলার অবনতি হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। শহরে যে রাস্তায় রামনবমীর মিছিল হয়, সেইসব রাস্তার ধারে প্রচুর মাংসের দোকান রয়েছে। মিছিল চলাকালীন রাস্তায় মাংস ধোয়া জল গড়িয়ে এলে মুশকিল। সেই কারণেই আমি মাংসের দোকানে একটি দিনের জন্য রক্তপাত বন্ধ করতে বলেছিলাম। মানুষকে মাছ, মাংস খেতে তো বারণ করিনি। বাড়িতে খাসি এনে কাটুন, খান।’ পাশাপাশি সমালোচনারও জবাব দিয়েছেন তিনি। বলেন, ‘অনেকে আমাকে বিদ্রুপ করে বলছেন, আমি নাকি উত্তরপ্রদেশের সংস্কৃতির আমদানি করছি। যাঁরা বলছেন, তাঁরাই এই কালচারের ধারক ও বাহক।’
ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতির পুরুলিয়া জেলা সম্পাদক মধুসূদন মাহাত বলেন, ‘চেয়ারম্যানের বোধদয় হয়েছে দেখে ভালো লাগছে। মানুষের খাদ্যাভাসে হস্তক্ষেপ করার অধিকার কারও নেই।’ বাম ছাত্র সংগঠন এসএফআই-এর রাজ্য সহ সভাপতি সুব্রত মাহাতর কটাক্ষ, ‘চেয়ারম্যান তৃণমূল করলেও সনাতনী ভাবধারা তাঁর মনে গেঁথে রয়েছে। তবে, তাঁর জানা উচিত, দুর্গাপুজো থেকে দোল উৎসব—আজও আমিষ পদেই রসনাতৃপ্তি করেন বাঙালি। ভারতের ঐতিহ্যে কোনওদিনই নিরামিষতন্ত্র ছিল না।’