সুদীপ্ত কুণ্ডু, হাওড়া; একদিকে ব্রিটিশ আমলে ব্যবসায়ে বাঙালির উত্থান, অন্যদিকে শাস্ত্রীয় সংগীত থেকে চলচ্চিত্র জগতের দিকপালদের অবাধ যাতায়াত। বালির গঙ্গাপাড়ে কেদার ভবন শুধু বনেদিয়ানার প্রতীক নয়, ইতিহাসেরও সাক্ষী। এই বাড়ির দুর্গাপুজোর বয়স ১৬৫ বছর। পুজোর আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মুখোপাধ্যায় পরিবারের উত্থান, বালির শ্রীবৃদ্ধি এবং সংস্কৃতি জগতের বহু নক্ষত্রের স্মৃতি।
বালি থানার বিপরীতে শান্তিরাম রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা এই বাড়ির সমৃদ্ধির নেপথ্যে রয়েছেন কেদারনাথ মুখোপাধ্যায়। তাঁর বাবা কালীকান্ত মুখোপাধ্যায় যজমানি করে সংসার চালাতেন। কিন্তু ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের খুঁটিনাটি এবং ব্যবসার প্রতি কেদারনাথের আগ্রহ তাঁকে অন্য পথে এগিয়ে দেয়। মাত্র ২২ বছর বয়সে কপিং পেন্সিল ও কাগজের ব্যবসা শুরু করেন তিনি। ১৮৪০ সাল নাগাদ কলকাতায় আসা এক বহুজাতিক সংস্থার জাহাজের পেনিয়ন হুইল নষ্ট হলে শিবপুরের জাহাজের স্ক্র্যাপ থেকে মাত্র ১০ টাকায় বিকল্প যন্ত্রাংশ জোগাড় করে দেন কেদারনাথ। বিপুল লোকসানের হাত থেকে সংস্থাটিকে বাঁচানোর পুরস্কার হিসেবে পান স্টেশনারি সামগ্রী রপ্তানির বরাত। পরে ফেরাস ও নন-ফেরাস কাস্টিং এবং রবার শিটের ব্যবসায় নামেন। গড়ে তোলেন চারটি কোম্পানি। এক সময়ে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনার প্রায় ২৫ শতাংশ রবারের জুতো তৈরি হত তাঁর সংস্থায়।
এই পরিবারে দুর্গাপুজোর সূচনা ১৮৬১ সালে। প্রথমে সরখেলপাড়ার পুরনো বাড়িতে প্রায় ১৭ বছর পুজো হয়। পরে দাদা গগনের সঙ্গে ১০৬ কাঠা জমিতে কেদার ভবন তৈরি করেন কেদারনাথ। ১৮৭৮ সাল থেকে সেখানেই পুজো হয়ে আসছে। কালিকাপুরাণ মতে একচালার সাবেকি প্রতিমায় ডাকের সাজ আজও অটুট। সোনা-রূপোর কয়েকশো ভরি গয়নায় সাজেন দেবী। ধুনোপোড়ায় অংশ নেন মহিলারা। সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত হয় একাধিক কুমারীপুজো। ঢাকের বদলে বাজে ঢোল। দেবীর ভোগে থাকে অন্ন, মাছ, পোলাও, খিচুড়ি ও পায়েস। দশমীতে কেদারঘাটে হয় নিরঞ্জন। শোনা যায়, দশানী রাজাদের কাছ থেকে ঘাটটি কিনে এক আইরিশ ইঞ্জিনিয়ারকে দিয়ে তার নকশা করিয়েছিলেন কেদারনাথ।
বালির অ্যাথলেটিক ক্লাব, লাইব্রেরি ও পুরসভার জন্য জমিদানেও এই পরিবারের অবদান রয়েছে। পাশাপাশি কেদার ভবন ছিল সংস্কৃতিচর্চারও আসর। বড়ে গোলাম আলি খাঁ, ওস্তাদ আল্লারাখা, পণ্ডিত রবিশঙ্কর ও জাকির হোসেন এসেছেন এখানে। জিয়া মহিউদ্দিন ডাগর এবং রহিম ফাহিমউদ্দিন ডাগর এক-দু’মাস থেকেও সংগীত পরিবেশন করেছেন। ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, সনৎ সিংহ, অমল দত্ত, উত্তমকুমার, তরুণকুমার, বিশ্বজিৎ ও পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের যাতায়াতও ছিল এই বাড়িতে। তাই কেদার ভবনের দুর্গাপুজো নিছক পারিবারিক উৎসব নয়, বালির ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক জীবন্ত অধ্যায়। -ফাইল চিত্র



