সজল মণ্ডল, রঘুনাথপুর: প্রথা মেনে মহালয়ার আগেই রবিবার পুরুলিয়া জেলার কাশীপুর পঞ্চকোট রাজবংশের দেবী বাড়ির দুর্গাপুজো শুরু হয়ে গেল। রাজবংশের প্রাচীন প্রথা মেনে জিতাষ্টমীর পরদিন অর্থাৎ কৃষ্ণা নবমী তিথিতে শুরু হল পুজো। এদিন রাজবংশের দেবীবাড়িতে বোধন হল রাজরাজেশ্বরী দুর্গার। নিয়ম মেনে ঘট প্রতিষ্ঠা করে পুজো শুরু হয়। এখানে দেবী ১৬ দিনে ষোড়শ রূপে পূজিত হন। তাই অনেকেই দেবীকে ষোড়শী হিসাবে অবহিত করেন। রাজবংশের যাঁরা কাশীপুরে থাকেন না, তাঁরাও পুজোয় বাড়ি ফিরে আসেন। উৎসবে শামিল হন।
রাজ পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, আনুমানিক প্রায় দু’হাজার বছর আগে পঞ্চকোট রাজ পরিবারের দুর্গাপুজো শুরু হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় রাজ পরিবারের রাজধানী বদল হয়েছে। কাশীপুরে প্রায় ৮০০ বছর ধরে পুজো হয়ে আসছে। কথিত রয়েছে, শকাব্দ ২, ধার নগরের মহারাজা বিক্রমাদিত্যের সপ্তম পুরুষ দামোদর শেখর এখানে পুজো শুরু করেন। তখন এলাকাটি চারিদিকে পাহাড় ঘেরা থাকায় শিখর ভূমি হিসাবে পরিচিত ছিল। তাই এখানের মা দুর্গাও শিখরবাসিনী হিসাবে পরিচিত।
পঞ্চকোট রাজপরিবারের এক প্রবীণ সদস্য বলেন, ধার বা ধারানগর থেকে পঞ্চকোট রাজারা জঙ্গলমহলে এসে রাজত্ব স্থাপন করেন। তাঁরা সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন চতুর্ভুজা রাজরাজেশ্বরী মূর্তিকে। এখানে দেবী চতুর্ভুজা এবং অষ্টধাতুর মূর্তি পূজিত হয়। দেবীর সঙ্গে তার পরিবার থাকে না। দেবী একাই রাজরাজেশ্বরী রূপে অধিষ্ঠাত্রী। এই মন্দিরে ছাগবলি, মহিষ বলি প্রথা রয়েছে। রাজ পরিবারের ইষ্টদেবতা ছিল শ্রীরামচন্দ্র। রামচন্দ্র যেমন রাবণ বধের জন্য কৃষ্ণাষ্টমীতে পুজো শুরু করে দশমীতে শেষ করেছিলেন, ঠিক সেই নিয়ম মেনে এখানেও দেবী পূজিতা হন ষোড়শী রূপে। অর্থাৎ ১৬ দিন ১৬টি রূপে দেবীকে পুজা করা হয়। অনেকে একে ষোড়শ পর্বের পুজোও বলেন। অষ্টমীর দিন অতি প্রাচীন ও গুপ্তমন্ত্র শ্রীনাথ মন্ত্র পাঠ করা হয়। সেই মন্ত্রের কোনো লিখিত রূপ নেই। দীর্ঘদিন ধরে বংশ পরম্পরায় সেই মন্ত্র উচ্চারিত হয়ে আসে। অষ্টমীর দিন দেবী মন্দিরে মায়ের পায়ের ছাপ পড়ে। তবে তা সকলকে দেখতে দেওয়া হয় না। মায়ের পায়ের ছাপের সিঁদুর দশমীর দিনে সকলকে তিলক হিসাবে পরানো হয়।
পঞ্চকোট রাজবংশের পুরোহিত তথা সাঁতুড়ি থানার রামচন্দ্রপুর গ্ৰামের বাসিন্দা গৌতম চক্রবর্তী জানিয়েছেন, রাজবংশের দুর্গাপুজো দু’হাজার বছরের বেশি পুরানো। এখানে ১৬ দিন ধরে দুর্গাপুজো হয়। একসময় এখানে ভাদ্র মাসজুড়ে ভাদুগান হত। আশ্বিন মাস পড়লেই শুরু হত আগমনি গান। তবে এখন পুজোর দিন থেকে আগমনি গান করা হয়। দেবীর এখানে নিত্যপুজো হয়। আগে নিত্য ছাগ বলি হত। পরবর্তী সময়ে প্রতি সপ্তাহের মঙ্গলবার ছাগ বলি হত। কিন্তু, কালক্রমে এখন সেগুলি বিলুপ্ত হয়েছে। তবে পুজোর প্রতিটা
দিন বলি প্রথা এখনো চালু রয়েছে। তাছাড়া এই পুজোয় রাজপুরুষরা
এখনো হলুদ ছোপানো ধুতি পরে মন্দিরে আসেন। যা সাবেকিয়ানার জৌলুস বাড়িয়ে দেয়। তবে এখন পুজোয়
তেমন জাঁকজমক নেই। আগে সন্ধিপুজোর আগে তোপধ্বনি হত। এখন তাও বন্ধ। তবু মানুষ ঐতিহ্যের টানে এখনো কাশীপুরের দেবীবাড়িতে ভিড় জমান। দেবী বাড়ির কর্মচারীর সৌরেন্দ্রনাথ মিশ্র বলেন, পুজোর সময় বহু মানুষ ভিড় করে। ঐতিহ্যের পুজো দেখতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষজন আসেন। নিজস্ব চিত্র