


খোঁজ পাওয়া গিয়েছে প্লাস্টিক ধ্বংসকারী ব্যাকটেরিয়ার! পৃথিবী কি প্লাস্টিকমুক্ত হতে চলেছে? লিখেছেন কল্যাণকুমার দে
প্লাস্টিকবিহীন পৃথিবীতে ফিরে যাওয়া কার্যত অসম্ভব! আমাদের প্রতিদিনের জীবনে প্লাস্টিকের ব্যবহার ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে। পাইপ থেকে জলের বোতল, ক্যারিব্যাগ থেকে খেলনা। প্লাস্টিক শব্দটি প্রাচীন গ্রিক শব্দ ‘প্লাসটিকোস’ থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘আকৃতি বা ঢালাই করতে সক্ষম’। প্লাস্টিক হল একধরনের সিন্থেটিক (কৃত্রিম) বা আধা-সিন্থেটিক হাইড্রোকার্বন পলিমার, যা উচ্চ আণবিক ওজনের জৈব যৌগ দিয়ে তৈরি। বেশিরভাগ প্লাস্টিক প্রাকৃতিক গ্যাস ও পেট্রলিয়াম থেকে তৈরি হয়। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হল এটিকে নির্দিষ্ট আকারে ঢালাই করা যায়। কম খরচ, স্থায়িত্ব ও বহুমুখিতার মতো বৈশিষ্ট্যের কারণে প্লাস্টিক আধুনিক জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এটি হালকা, জলরোধী এবং রাসায়নিক প্রতিরোধী হওয়ায় এর ব্যবহার খুব বেশি। পৃথিবীতে প্লাস্টিকের ব্যবহার শুরু হয়েছিল ১৮৫৫ সালে, যখন ইংল্যান্ডের আলেকজান্ডার পার্কস প্রথম মানবসৃষ্ট প্লাস্টিক ‘পারকাসাইন’ আবিষ্কার করেন। তবে ১৯০৭ সালে বেলজিয়ান রসায়নবিদ লিও বেকল্যান্ড প্রথম প্রকৃত সিন্থেটিক, ব্যাপক-উৎপাদিত প্লাস্টিক বেকেলাইট তৈরি করেন। যা আধুনিক প্লাস্টিকের বিবর্তনে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল।
কিন্তু ব্যবহারের পর এই প্লাস্টিকগুলো কোথায় যায়? পৃথিবী জুড়ে যে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য জমে রয়েছে, তার মধ্যে প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। সবাই জানেন, প্লাস্টিকের বর্জ্য সহজে পচে-গলে মাটিতে মিশে যায় না, এজন্য বহু সময় লাগে। একটি মাত্র প্লাস্টিক ব্যাগ মাটিতে মিশে যেতে সময় লাগে প্রায় ১ হাজার বছর। আর ঠিক সেই কারণেই প্লাস্টিক বর্জ্য পরিবেশের জন্য এত বড় ‘থ্রেট’ হয়ে উঠেছে। শুধু মাটির উপরে বা ভিতরে নয়, সমুদ্রের নীচেও রয়েছে প্লাস্টিকের সাম্রাজ্য। পৃথিবীতে প্রতি বছর প্রায় ৩৫০ থেকে ৪০০ মিলিয়ন টন শুধু প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়। যার মধ্যে প্রায় ১১ মিলিয়ন টন সমুদ্রে প্রবেশ করে।
বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট করে প্লাস্টিক। প্লাস্টিকের কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক ঢুকতে শুরু করেছে পুকুর বা নদীর মাছের শরীরে, চাষের জমির ফলনে, তিমির মতো নানা প্রাণীর পেটে, গোরুর দুধে, মানুষের খাবারে, এমনকী মানবশরীরেও। এর থেকে বাঁচার কোনও উপায় কি রয়েছে? বর্তমানে পৃথিবীতে বার্ষিক প্লাস্টিক উৎপাদন প্রায় ৪০ কোটি টন। এর মধ্যে মাত্র ৯ শতাংশ পুনর্ব্যবহারযোগ্য।
সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম প্লাস্টিকের কণা ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়ার আঁতুড়ঘর। এইসব ব্যাকটেরিয়ারা আবার অ্যান্টিবায়োটিকেও ঘায়েল হয় না। মানুষের শরীরে জটিল অসুখবিসুখ বাধাতে পারে। এমনটাই বলছে সাম্প্রতিক গবেষণা। প্লাস্টিক দূষণের ভয়ংকর প্রভাব যে ফলতে শুরু করেছে, সে নিয়ে সতর্ক করেছেন বিজ্ঞানীরা। প্লাস্টিক ব্যবহারে যতই রাশ টানা হোক না কেন, তা নির্মূল করা যায়নি কোনওভাবেই।
সম্প্রতি গবেষকরা স্বস্তির কথা শোনাচ্ছেন। বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যে প্রায় ৪০০টিরও বেশি এরকম ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া জাতীয় জীবাণু চিহ্নিত করেছেন যারা গোগ্রাসে প্লাস্টিক খেয়ে ফেলছে। কোনও প্লাস্টিক বর্জ্যকেই পড়ে থাকতে দিচ্ছে না। সব প্লাস্টিকই চলে যাচ্ছে সেই ‘প্লাস্টিক-খেকো’ জীবাণুর পেটে। এই জীবাণুগুলির মধ্যে রয়েছে প্লাস্টিক ভেঙে ফেলার অদ্ভুত এক ক্ষমতা। তা হলে প্লাস্টিক বর্জ্যের দূষণ নিয়ে আমাদের উদ্বেগের দিন কি এবার সত্যি-সত্যিই শেষ হতে চলেছে? উত্তরটা এখনও অজানা থাকলেও, সেই সম্ভাবনা যে একেবারে অসম্ভব নয়, এবার তারই দিশা দেখালেন গবেষকরা। প্লাস্টিককে আক্ষরিক অর্থেই যদি ‘খেয়ে ফেলতে’ পারে, তাহলে পরিবেশ রক্ষার জন্য এটা যে কত বড় ঘটনা হবে, তা বুঝিয়ে বলার অপেক্ষা রাখে না।
বিজ্ঞানীরা দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর প্লাস্টিক বিনাশকারী এনজাইম তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। এই এনজাইম খুব সহজেই মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই প্লাস্টিকের অস্তিত্ব মুছে দেয়। ২০১৬ সালে জাপানি বিজ্ঞানীরা বিশ্বের প্লাস্টিক সমস্যা মোকাবিলা করতে একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার করেন। তাঁরা ইডিওনেল্লা সাকাইএন্সিস নামের একধরনের ব্যাকটেরিয়া আবিষ্কার করেন, যেগুলো প্লাস্টিকের বোতল খেয়ে হজম করতে পারে। বেশিরভাগ ব্যাকটেরিয়াই মৃত জৈব খেয়ে বেঁচে থাকে। ব্যাকটেরিয়াটির জৈব রাসায়নিক বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন, এরা মূলত পেটএজ নামক একধরনের হাইড্রোলাইসিং পাচক এনজাইম উৎপাদন করে। মূলত প্লাস্টিকের পানীয় জলের বোতলে যে ধরনের প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয়, তা হল সাধারণত ‘পলিইথিলিন টেরেফথ্যালেট’। এছাড়াও কিছু বোতলে পলিকার্বোনেট বা উচ্চ ঘনত্বের পলিথিলিন ব্যবহার করা হয়। সেই ধরনের প্লাস্টিকের উপরে এই ব্যাকটেরিয়া বিশেষভাবে কার্যকর। আবর্জনায় ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের মধ্যে এই এনজাইম মিশিয়ে দিলে কয়েক দিনের মধ্যেই সেই প্লাস্টিকগুলি ধীরে ধীরে ভাঙতে শুরু করে ও অবশেষে মিলিয়ে যায়। হাইড্রোলাইসিং এনজাইমগুলো পেট প্লাস্টিকের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করতে পারে। তখন এসব প্লাস্টিকের দীর্ঘ আণবিক শৃঙ্খল (পলিমার) ভেঙে ক্ষুদ্র আণবিক শৃঙ্খলে (মনোমার) পরিণত হয়।
জিনবিজ্ঞানীরা ইডিওনেল্লা সাকাইএন্সিস নিয়ে পরীক্ষা করেছেন। তাঁরা চেষ্টা করেছেন, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে আরও দক্ষ এনজাইম উৎপাদনে সক্ষম ব্যাকটেরিয়া তৈরি করতে। ই কোলাই ব্যাকটেরিয়াকেও পেটেস উৎপাদনকারী বানাতে চাইছেন তাঁরা। এ ধরনের সংবাদ আশা দেখায়, তবু বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে দিয়েছেন। আসলে গোটা পৃথিবীর প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণে বহু বছর লেগে যাবে। তাছাড়া পেটেস শুধু পেট প্লাস্টিক পচাতে পারে। কিন্তু পৃথিবীতে মোট ছয় ধরনের প্লাস্টিক রয়েছে।
বিজ্ঞানীরা পেটেসকে আরও একটি প্লাস্টিকখেকো এনজাইম এমএইচইটিএজ-এর সঙ্গে যুক্ত করে একটি সুপার এনজাইম তৈরি করেন। এটি তৈরি করা হয়েছিল একটি সিনক্রোট্রন দিয়ে। সিনক্রোট্রন হল এক ধরনের কণা ত্বরক, যা সূর্যের চেয়ে ১০ বিলিয়ন গুণ উজ্জ্বল এক্স-রে উৎপাদন করতে পারে। এই এনজাইম সুগারভিত্তিক জৈব প্লাস্টিক পলিইথিলিন ফিউরানোয়েটকেও ভাঙতে পারে।
স্কটল্যান্ডের এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা ই কোলাই ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করে আসছেন প্লাস্টিককে ভ্যানিলিনে রূপান্তর করতে।
প্লাস্টিক দূষণ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বড় সমস্যা। সেখানে সবচেয়ে বড় চমক দিয়েছেন স্কটল্যান্ডের বিজ্ঞানীরা। স্কটল্যান্ডের এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা ই কোলাই নামক এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করে ‘পলিইথিলিন টেরেফথ্যালেট’ প্লাস্টিককে অ্যাসিটামিনোফেনে রূপান্তরিত করেছেন। ভবিষ্যতে প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে ওষুধ তৈরি করা সম্ভব হতে পারে, যা পরিবেশ এবং স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে।
সম্প্রতি ধাপা থেকে এমন ১৮টি প্লাস্টিকখেকো জীবাণু আবিষ্কার করে গোটা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন বাঙালি বিজ্ঞানী ডঃ স্বপন ঘোষ। প্লাস্টিকের তৈরি জিনিস খেয়ে ফেলছে জীবাণু। মিশিয়ে দিচ্ছে মাটিতে। এই জীবাণুরা নিজেদের শরীর থেকে এমন এক উৎসেচক বের করছে, যা প্লাস্টিকের হাইড্রোকার্বন পলিমার শৃঙ্খলকে ভেঙে তছনছ করে দিচ্ছে। সিউডোমোনাস অ্যারোজিনোসা নামে এক প্লাস্টিক-খেকো ব্যাকটেরিয়ার উপর গবেষণা চালিয়ে দেখা গিয়েছে, প্লাস্টিকের সঙ্গে ওই ব্যাকটেরিয়া মিশিয়ে দিলে তিন মাসে প্লাস্টিকের ওজন অর্ধেক হয়ে যাচ্ছে। পেনিসিলিয়াম সিম্পলিসিজিমাম নামে আরও একটি প্লাস্টিক-খেকো ছত্রাকের হদিশ মিলেছে।
বিজ্ঞানী সামান্থা জেনকিন্স কর্তৃক আবিষ্কৃত প্লাস্টিক-খেকো ছত্রাক পেস্টালোটিওপসিস মাইক্রোস্পোরা অক্সিজেন ছাড়াই প্লাস্টিক ভেঙে ফেলতে পারে। এটি পলিইউরেথেন প্লাস্টিককে হজম করতে পারে এবং অক্সিজেনের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি উভয় ক্ষেত্রেই প্লাস্টিককে ভেঙে ফেলতে পারে। পলিইউরেথেন প্লাস্টিক দিয়ে বিভিন্ন ধরনের জিনিস তৈরি হয়, যেমন—নমনীয় ফোম (গদি, আসবাবপত্রের কুশন), শক্ত ফোম (বিমানের ডানা), জুতোর সোল, ইলাস্টোমার (চাকা, টায়ার, বুশিং) এবং আবরণ ও ফিনিশ (কাঠের জন্য প্রতিরক্ষামূলক কোটিং)।
এবার জার্মানির স্টেচলিন হ্রদে এমন একটি বিশেষ ছত্রাকের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে, যেটি সিন্থেটিক প্লাস্টিক খেতে পারে। এই বিশেষ ছত্রাকটি আবিষ্কার করেছেন জার্মানির লিবনিজ ইনস্টিটিউট অব ফ্রেশওয়াটার ইকোলজির বিজ্ঞানীরা। তাঁরা জানিয়েছেন, ছত্রাকটি সাধারণ প্লাস্টিক খেতে পারলেও শক্ত প্লাস্টিকের ক্ষেত্রে তাদের কিছুটা লড়াই করতে হয়।
সভ্যতার বিকাশে প্লাস্টিকের গুরুত্ব যেমন অনস্বীকার্য, তেমনই বিপুল পরিমাণ বর্জ্য প্লাস্টিক নিয়ে এক গভীর সংকটের মুখে সভ্যতা। এই সংকট থেকে মুক্তির পথ দুটো। এক, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে হবে। দুই, বেশি বেশি প্লাস্টিক-খেকো জীবাণু আবিষ্কারের মাধ্যমে প্লাস্টিককে পরিবেশবান্ধব পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্যে রূপান্তরিত করতে হবে।