অদ্ভুত এই অসুখে আক্রান্ত আমাদের চেনা জানা অনেকেই। লিখেছেন ডাঃ শুভেন্দু বাগ।
অদ্ভুত এই অসুখে আক্রান্ত আমাদের চেনা জানা অনেকেই। লিখেছেন ডাঃ শুভেন্দু বাগ।
পায়ে ধুলো লাগার ভয়ে বছর তেত্রিশের ভদ্রমহিলা চেম্বারে ঢুকলেন একরকম লাফিয়ে লাফিয়ে। পরনে রাত্রিবাস। বাড়ি গিয়েই যাতে সহজেই পাল্টে ফেলে সাবান ঘষে ঘন্টাদুয়েক স্নান করে ‘শুদ্ধ’ হয়ে ঘরে ঢোকা যায়। পিছু পিছু আসা কাঁচুমাচু পতিদেব হালকা আড়ালে বললেন, ‘ইনফেকশনের ভয়ে সারাদিন ধরে হাত ধুয়ে চলে। হাতে হাজা হয়ে গেলেও দিনে একটা করে হ্যান্ডওয়াশের বোতল শেষ করে ফেলে। নোংরা লাগার ভয়ে বিছানার চাদর দিনে তিনবার করে পাল্টানো হয়। বাইরে থেকে কেউ এলে ঘরের বাইরে কাপড় চেঞ্জ করে, স্নান না করলে ঘরে ‘নো এন্ট্রি’! বাজারে গেলে অপ্রয়োজনীয় নতুন জিনিস কিনতেই থাকে। বাথরুমে ঢুকলে ঘণ্টা দুয়েকের কর্মযজ্ঞ। ওর ভয়ে বাড়িতে আত্মীয় বন্ধুবান্ধবরা কেউই আসতে চান না। সামান্য কেরানির চাকরি করি। হ্যান্ডওয়াশ আর নতুন পোশাক কিনতে কিনতে দেনার দায়ে পড়েছি ডাক্তারবাবু!’
প্রায় এক শ্বাসে কথাগুলো শেষ করে আমার দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকালেন পতিদেব।
ভদ্রমহিলা এসবে বিশেষ ভ্রুক্ষেপ না করে পুরো পায়ের পাতা মেঝেতে না ঠেকিয়ে পায়ের আঙুলে ভর করে মাথা নামিয়ে শুধু চোখ দু’খান উপরে তুলে বললেন—‘চারিদিকে যা নোংরা! বসব কোথায়?’ বলেই পতিদেবের পকেটে রাখা হ্যান্ড স্যানিটাইজারের বোতলটা টেনে নিয়ে স্প্রে করতে শুরু করলেন রোগীর বসার জন্য রাখা চেয়ারে।
আমি চেম্বারের কোণে ওষুধপত্রের ওপরে পড়ে থাকা কয়েকটা কাগজের টুকরোর দিকে তাকিয়ে কিঞ্চিৎ থতমত খেয়ে বললাম—হুঁ। তা বটে!
রোগিণীর দৃষ্টি ভাবলেশহীন। হাত-পায়ের আঙুলের ফাঁকে হাজা ধরেছে। শীর্ণকায় শরীর। চক্ষু কোটরাগত। পরনের রাতপোশাক এক্কেবারে নতুন। সাবানের দাপটে হাতেপায়ে খড়ি পড়েছে। মাঝেমধ্যেই নিজের চুলগুলো টেনে নিয়ে একবার চোখের সামনে কী জানি কিছু পরখ করে আবার যথাস্থানে রেখেই হাতে পুনরায় স্যানিটাইজার স্প্রে!
স্যানিটাইজারের উৎকট গন্ধে এইটুকু সময়েই আমার দমবন্ধ হওয়ার জোগাড়। পতিদেবের দিকে কিছুটা সম্ভ্রম আর অনেকটা কুর্নিশের দৃষ্টিতে তাকিয়ে স্টেথোস্কোপটা টেনে নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম—‘কতদিন ধরে সমস্যাটা খেয়াল করছেন?’
পতিদেব কিছু বলার আগেই ভদ্রমহিলা গোলগোল চোখে আমার স্টেথোস্কোপটার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এটাতে একটু স্প্রে করে দিই?’
বিপদ বুঝে স্টেথোস্কোপটা পুনরায় যথাস্থানে রেখে প্রেসক্রিপশনের প্যাডটা টেনে নিয়ে খসখস করে প্রয়োজনীয় ওষুধ লিখে বিদায় দিয়ে জোরে একটা শ্বাস নিয়ে পতিদেবকে ইশারায় ডেকে নিলাম।
ভদ্রমহিলাকে চেম্বারের বাইরে রেখে পতিদেব কাঁদো কাঁদো মুখে আবার চেম্বারে ঢুকলেন। আমি কিছু বলার আগেই বলতে শুরু করলেন—‘অতিষ্ঠ হয়ে গেছি ডাক্তারবাবু। বাঁচান!’
হাত তুলে অভয় দিয়ে বললাম, উনি আসলে অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিজঅর্ডার রোগে ভুগছেন। এক ধরনের মানসিক রোগ। যাতে কি না একটা বদ্ধমূল ধারনার মধ্যে উনি আটকে আছেন। এই যেমন ধরুন জগতের নোংরা যাতে আমার ক্ষতি না করতে পারে, এই এক অদ্ভুত ধারণার অবসেশনে উনি আটকে আছেন। অনেকে আবার নিজের শরীর বুঝি নিখুঁত নয়, এই ধারণায় বারবার আয়নার সামনে হাজির হন। কেউ কেউ আবার অতিরিক্ত কামোদ্দীপনার অবসেশনে আটকে থেকে সম্পর্কের সামাজিক গণ্ডি অতিক্রম করে ফেলেন বারবার। কারও আবার অহেতুক একটা চিন্তার জট মাথার মধ্যে ঢুকলে আর বেরতেই চায় না।
আসলে আমরা প্রত্যেকেই প্রায় কিছু না কিছু বদ্ধমূল ধারণা নিয়ে চলি। তবে এই রোগীদের ক্ষেত্রে মুশকিলটা হয়ে দাঁড়ায় ‘কম্পালশন’ পার্টটি। অর্থাৎ কিনা যা আমার বদ্ধমূল ধারণা, তা পালনের জন্য লোক-লৌকিকতা ভুলে তার পেছনে অহেতুক ছুটে চলা। এর ক্ষেত্রে যেমন ‘নোংরা’ নামক বদ্ধমূল অবসেশন থেকে বাঁচতে সারাদিন হাত ধুয়ে চলার কম্পালশন চলে। ধুতেই হবে। না হলে বোধহয় এই নোংরা থেকেই ক্ষতি হয়ে যাবে।
এরপর আসি ‘ডিজঅর্ডার’ পার্টটায়। এই বদ্ধমূল অবসেশনের কারণে হাত ধোয়ার কম্পালশনটি শরীরের ক্ষতি করে চলেছে। সবমিলিয়ে অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিজঅর্ডার, সংক্ষেপে ওসিডি। সহজ বাংলায় এঁদের বলা যায় শুচিবায়ুগ্রস্ত। যদিও সাইকিয়াট্রিস্টদের রোগ নামকরণের খাতায় বাংলায় বলা এই চলতি কথাকেই মান্যতা দিয়ে নতুনভাবে এই রোগের আর এক নামকরণ হয়েছে ‘শুচিবাই সিনড্রোম’। যেখানে ওসিডি রোগটায় রোগীর এই ধোয়াধুয়ির সমস্যাই হল প্রধান লক্ষণ।
আমার কথাগুলো মন দিয়ে শুনে ভদ্রলোক জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে প্রশ্ন করলেন, ‘সারবে তো?’
অভয় দিয়ে বললাম, ‘ওঁর ক্ষেত্রে পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডারের সমস্যাগুলো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠেনি। তাই সঠিক ওষুধ ও সাইকোলজিষ্টের কাছে নিয়ে গেলে এবং সঠিক কাউন্সেলিং পেলে উনি সেরে উঠবেন নিশ্চিত। মনে খানিক আশ্বাস নিয়ে ফিরে গেলেন ভদ্রলোক।
মাসদুয়েকের মধ্যেই একটা শপিং মলে হঠাৎই দম্পতির সাথে দেখা। পতিদেব কৃতজ্ঞতার স্বরে কানে কানে বলে গেলেন—‘হ্যান্ডওয়াশ আর স্যানিটাইজারের খরচ এখন অনেক কমেছে ডাক্তারবাবু।’
আমার শপাহোলিক স্ত্রী বাজারের ব্যাগ হাতে ধরে অপ্রস্তুত! আমিও কোনওমতে ওঁর দিকে তাকিয়ে ওষুধগুলো চালিয়ে যেতে পরামর্শ দিয়ে একজন স্বনামধন্য সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে যেতে বলে ভিড়ে হারিয়ে গেলাম।