


নিজস্ব প্রতিনিধি, হাওড়া: ৫৮ বছর বয়স তো, তাই সারাদিন দাঁড়িয়ে থাকতে হলে কোমরটা একটু ঝুঁকেই যায়। সারাদিন দাঁড়াতে হয় কারণ, বাসে কন্ডাক্টরি করেন ডলিদেবী।
লাইনটা পড়ে ধাঁধা লাগল? আবার পড়তে হল? ঠিকই লেখা হয়েছে। হাওড়ার বেলগাছিয়া থেকে ধর্মতলা যায় ৫৭ নম্বর রুটের বেসরকারি বাস। সেই রুটের একটি বাসের কন্ডাক্টর ৫৮ বছরের প্রৌঢ়া ডলি রানা। বাসটির মালিকও তিনি।
প্রতিদিনের দীর্ঘ যাত্রাপথ। বাসের পাদানিতে দাঁড়ান ডলি। যাত্রী তুলতে মিহি গলায় চিৎকার। তারপর ভিড় ঠেলে বাসের ভিতর। টিকিট কাটেন। আঁচলে ঘাম মোছেন কপালের। অচেনা যাত্রীরা মিহি গলায় ‘ভাড়া দেবেন’ শুনে যখন চমকে তাকান, দেখেন কন্ডাক্টর একজন প্রৌঢ়া, তখন তাঁর দিকে চেয়ে আন্তরিক হাসি ছুঁড়ে দেন ডলিদেবী। আর যে নিত্যযাত্রীরা তাঁকে চেনেন, তাঁদের সঙ্গে বেজায় সখ্যতা তাঁর। একবার কাজের চাপে চলন্ত বাসে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তখন চিকিৎসার প্রয়োজনে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন ৫৭ রুটের বাসযাত্রীরাই।
স্বামী, ভাই, বোন, বোনপোকে নিয়ে ছোট সংসার ডলিদেবীর। নিজে নিঃসন্তান। স্বামীর রোজগার বেশি নয়। সে কারণে সাত পাঁচ না ভেবে ২০১৭ সালে ঋণ নিয়ে কিনে ফেলেছিলেন বাস। দু’বছর কোনওমতে চলেছিল। তারপর লকডাউন। সব বন্ধ। ঋণের বোঝা। আকাশ ভেঙে পড়েছিল মাথায়। লকডাউন ওঠে। তারপর হার মানেননি। নিজে কন্ডাক্টরের ব্যাগ কাঁধে তুলে বাসের চাকায় গড়িয়ে দিয়েছিলেন ভাগ্য। এখন যাত্রীদের ভিড় হয়। ঋণের কিস্তি মেটানো যাচ্ছে। লোকে বলে বাস চালানো খুব কঠিন। ট্রান্সপোর্ট লাইন সবার জন্য নয়। আর ডলিদেবী বলেন, ‘কোনও কাজেরই গতে বাধা নিয়ম থাকে না। জেদ আর ইচ্ছে থাকলে সবাই সব কাজ করতে পারে। শুধু হার মানা চলবে না।’ এভাবে দুস্তর বাধা প্রস্তর ঠেলে ঠোক্কর খেতে খেতেও মাথা উঁচু করে প্রতিদিন কিলোমিটারের পর কিলোমিটার পথ চলেছেন ৫৮ বছরের প্রৌঢ়া ডলি।
হাওড়ার বেলগাছিয়ায় থাকেন তিনি। ভোর পাঁচটায় বাড়ির সামনে আসেন বাসচালক ফিরোজ খান। শাড়ির আঁচল কোমরে পেঁচিয়ে, কাঁধে ঝোলা ব্যাগ নিয়ে বোনপো বুম্বার সঙ্গে বাস নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েন ডলি। এখন মাথায় হাজার চিন্তা-হাওড়া বাস স্ট্যান্ড থেকে ধর্মতলা যায় শতাধিক বাস। তাই লড়াই ক্রমে কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠছে। একটি নয়া রুটের খোঁজ করছেন। প্রয়োজন নতুন পারমিটের। রাস্তায় নতুন বাস নামানোর স্বপ্ন দেখছেন ডলিদেবী। বলেন, ‘নিজে থেকে সব শিখেছি। এই বাস আমার সন্তানের মত। বাড়িতে যেমন আমার পরিবার তেমন যাত্রীরাও আমার পরিবার।’
তাঁর সহযাত্রীরা বলেন, ‘মহিলা কর্নেল, মহিলা উইং কমান্ডারের মতো মহিলা কন্ডাক্টরও নারীশক্তিরই কথা বলে। ডলিদির লড়াই আমাদের পরিবারের মহিলাদের অনুপ্রেরণা।’