নিজস্ব প্রতিনিধি, কৃষ্ণনগর: দুগোৎসবের দিনগোনা শুরু হতেই নদীয়া জেলাজুড়ে ডেঙ্গুর চোখরাঙানি প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের উদ্বেগ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। চলতি মরশুমে জেলায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা ইতিমধ্যেই ৫০০-র গণ্ডি টপকে ৫৭১-এ গিয়ে ঠেকেছে। গত বছরের তুলনায় এই সংখ্যা কিছুটা বেশি হওয়ায় নড়েচড়ে বসেছে রাজ্য স্বাস্থ্যবিভাগ। সাধারণত প্রতি বছর জুলাই মাসে রাজ্যজুড়ে ‘অ্যান্টি-ডেঙ্গু মাস’ পালিত হলেও, এ বছর বর্তমান পরিস্থিতির কারণে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত পুরো এক মাসব্যাপী বিশেষ ডেঙ্গু বিরোধী অভিযান পরিচালনার নজিরবিহীন নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পুজোর আনন্দের আবহেই মশাবাহিত এই মারণ রোগের রাশ টানতে জেলা ও ব্লক—দুই স্তরেই এখন যুদ্ধকালীন তৎপরতা চলছে।
স্বাস্থ্যদপ্তরের প্রকাশিত সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, জেলার গ্রামীণ অঞ্চল থেকে শুরু করে শহরাঞ্চল— সর্বত্রই থাবা বসিয়েছে মশা। তবে সবচেয়ে সংকটজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তেহট্ট মহকুমা ও রানাঘাট এলাকার কয়েকটি পকেটে। তালিকার শীর্ষে থাকা তেহট্ট-১ ব্লকে একা আক্রান্তের সংখ্যা পৌঁছেছে ১৩৪-এ। অন্যদিকে পুরসভাগুলির মধ্যে ডেঙ্গুর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি চাকদহ পুরসভায়, যেখানে ৭৩ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। এছাড়া আক্রান্তের উল্লেখযোগ্য সংখ্যা ধরা পড়েছে রানাঘাট-২ ব্লকে ৫১ জন, চাকদহ ব্লকে ৩৮ জন, করিমপুর-২ ব্লকে ২৯ জন, তেহট্ট-২ ব্লকে ২৪ জন এবং হাঁসখালি ব্লকে ২১ জন। আক্রান্তের হদিশ মিলেছে কালীগঞ্জ ১৮, করিমপুর-১ ১৭, শান্তিপুর ১৭, শান্তিপুর পুরসভা ১৬। তবে একমাত্র ব্যতিক্রম তাহেরপুর পুরসভা, যেখানে এখনও পর্যন্ত একজনও ডেঙ্গু রোগী মেলেনি।
সংক্রমণের এই ভয়াবহ শৃঙ্খল ভাঙতে স্বাস্থ্য দপ্তর চার সপ্তাহের এক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সেইমতো অভিযানের প্রথম থেকেই হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিতে প্রজননস্থল ধ্বংসের পাশাপাশি বিশেষ পতঙ্গসংক্রান্ত নজরদারি চালানো হচ্ছে। উচ্চ সংক্রমণ যুক্ত এলাকায় বিশেষ ফিভার ক্লিনিক ও ফিভার ক্যাম্প আয়োজনের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ে কাজের গতি বাড়াতে স্বাস্থ্যকর্মী, এএসএইচএ, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী, স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্য এবং রেজিস্টার্ড বেসরকারি প্যাথলজি কেন্দ্রগুলির সঙ্গে ধারাবাহিক সমন্বয় বৈঠক চলছে। পাশাপাশি ভিওসি, ভিসিটি ও ভিআরপি কর্মীদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যাতে ঘরে ঘরে গিয়ে সঠিক পদ্ধতিতে জ্বরের সমীক্ষা চালানো যায়।
কেবল প্রশাসনিক নজরদারিই নয়, সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ও কচি-কাঁচাদের মাধ্যমে সচেতনতার বার্তা ছড়িয়ে দিতে স্কুল পর্যায়ে আয়োজন করা হচ্ছে বসে আঁকো প্রতিযোগিতা, বিজ্ঞান প্রদর্শনী এবং বিশেষ ‘ডেঙ্গু ওয়ারিয়র’ নির্বাচন পরীক্ষা। প্রচারের শেষ ধাপে পথনাটক, পদযাত্রা, লোকশিল্পীদের অনুষ্ঠান, মাইকিং এবং টেলিভিশন ও স্থানীয় কেবল নেটওয়ার্কে লাগাতার সচেতনতামূলক বার্তা সম্প্রচার করার রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। নদীয়া জেলা স্বাস্থ্য দপ্তরের এক আধিকারিকের কথায়, চিকিৎসা ব্যবস্থাকে নিখুঁত রাখতে রাজ্য ও জেলা স্তরে সেরো-সার্ভেল্যান্স জোরদার করার পাশাপাশি চিকিৎসকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পুজোর দিনগুলিতে নিজের চারপাশ পরিষ্কার রাখা, কোথাও জল জমতে না দেওয়া এবং সামান্য জ্বর হলেই কালক্ষেপ না করে ফিভার ক্লিনিকে পরীক্ষার আবেদন জানানো হচ্ছে।