সংবাদদাতা, খড়্গপুর: চারিদিকে শালজঙ্গল। প্রকৃতির কোলে ছোট্ট আদিবাসী গ্রাম কেন্দাশোল। দুর্গাপুজোর আনন্দে যখন মেতে ওঠে চারপাশ, তখন এই গ্রামের সাঁওতাল পরিবারগুলি সপ্তমীর দিন ঘটা করে হয় ‘হুদুরদুর্গা’র পুজো। আনন্দ নয়, পালিত হয় শোক। সাঁওতালদের একাংশের বিশ্বাস, পৌরাণিক কাহিনিতে যাকে মহিষাসুর বলা হয়, তিনিই তাঁদের রাজা ‘হুদুরদুর্গা’ । তাঁকে স্মরণ করেই প্রতিবছর সপ্তমীতে পুজোর আয়োজন করেন শালবনী ব্লকের এই প্রত্যন্ত গ্রামের বাসিন্দারা। এবারও ঘটা করে পুজোর আয়োজন হয়েছে।
গ্রামের বাসিন্দা সিজেন হাঁসদা, সুভাষ হাঁসদা, সারথি মাণ্ডিদের কথায়, হুদুরদুর্গা তাঁদের পূর্বপুরুষদের রাজা ছিলেন। এক নারীর হাতে তিনি পরাজিত ও নিহত হন। সেই কারণেই দুর্গাপুজোর প্রচলিত আচার থেকে তাঁরা নিজেদের দূরে রাখেন।
প্রায় ২৫-৩০টি সাঁওতাল পরিবারের বাস শালবনীর পিড়াকাটা সংলগ্ন কেন্দাশোল গ্রামে। ২০১৬ সালে গ্রামের বাসিন্দা সিজেন হাঁসদার উদ্যোগে শুরু হয় হুদুরদুর্গার পুজো। মূর্তি গড়েন তাঁর ভাই রামচন্দ্র হাঁসদা, যিনি পেশায় মৃৎশিল্পী। পুজোর পুরোহিতের দায়িত্ব পালন করেন আর এক ভাই সুভাষ হাঁসদা। অন্যান্য গ্রামবাসীরাও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। পাশের সুন্দরপুর ও বড়কেঁউদি গ্রামের সাঁওতাল পরিবারগুলিও এই আয়োজনে শামিল হন। সপ্তমীর সকালে শুরু হয় পুজো। গোটা ফলমূল দিয়ে চলে আরাধনা। দুপুরের মধ্যেই পুজো শেষ হলে খাওয়াদাওয়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মেতে ওঠেন গ্রামবাসীরা। রাতভর চলে অনুষ্ঠান। তবে, হুদুরদুর্গার মূর্তি বিসর্জন দেওয়া হয় না। গ্রামবাসীদের কথায়, হুদুরদুর্গা তাঁদের রাজা। তাই মূর্তি মণ্ডপ থেকে সরিয়ে ফাঁকা জায়গায় রেখে দেওয়া হয়। রোদ-বৃষ্টিতে ধীরে ধীরে তা মাটিতে মিশে যায়।
দুর্গাপুজোর দিনগুলিতে তাঁদের আরও একটি বিশেষ সাংস্কৃতিক পরম্পরা হল ‘ভুয়াং দাঁশাই’ নাচ। মহিলাদের পোশাক পরে, ভুয়াং বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে পথে পথে নাচ দেখান আদিবাসী পুরুষরা। গ্রামবাসীদের বিশ্বাস, এই নাচ তাঁদের দুঃখের স্মারক। সিজেন বলেন, এই নাচ আসলে দুঃখের নাচ। দেবী দুর্গা আমাদের রাজাকে বধ করার পর, আর্যরা আমাদের তাড়িয়ে দেয়। তখন আমরা নারীর পোশাক পরে, হাতে কাড়বাঁশ(তিরধনুক) নিয়ে হায় হায় করতে করতে পালিয়ে আসি’’ এই নাচের মধ্য দিয়ে তাঁরা হারানো শক্তি ফিরে পাওয়ার প্রার্থনাও করেন।
বিশিষ্ট লোকসংস্কৃতি গবেষক ও লেখক মধুপ দে-র মতে, হুদুরদুর্গার পুজো প্রাচীন সাঁওতাল সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ নয়। সাম্প্রতিককালের একটি লোককাহিনিকে কেন্দ্র করে এই চর্চার প্রসার ঘটেছে। মধুপবাবু বলেন, ‘ওড়বান্দা এলাকার এক সাঁওতাল রাজা হুদুরদুর্গাকে পরাস্ত করতে এক নারীকে পাঠানোর কাহিনি প্রচলিত রয়েছে।’ গবেষকের মতে, পরবর্তী সময়ে সেই লোককাহিনির সঙ্গে পৌরাণিক দুর্গা-মহিষাসুরের আখ্যানকে মিলিয়ে দেখা হয়েছে।-নিজস্ব চিত্র

