সুখেন্দু পাল, বর্ধমান: পরণে গেরুয়া বসন। গলায় গেরুয়া উত্তরীয়। কপালে গেরুয়া তিলক। মুখে জয় শ্রীরাম—সবাই বলছেন আমি বিজেপি! গত ৪ মে সকালে যে ছেলেটা পকেটে সবুজ আবির নিয়ে ঘোরাঘুরি করছিল, বেলা বারোটার পর তার হাতে গেরুয়া আবির! বিজেপির বিজয়োল্লাসে সে-ই ছিল সবচেয়ে বেশি আমোদিত! বেলা যত বেড়েছে এমন অনেকেই ভিড়ে গিয়েছে গেরুয়া শিবিরে। তারপর থেকে দিন যত গড়াচ্ছে ততই বাড়ছে শাসকদলের নেতা-কর্মী হওয়ার দাবিদার! এইসব ‘দাবিদার’দের উপর এবার রাশ টানতে উদ্যোগী রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ (আরএসএস)। সবকিছু ঠিকঠাক চললে কিছুদিনের মধ্যেই বঙ্গ বিজেপির সংগঠনের ব্যাটন হাতে তুলে নেবে সংঘ। শুরু হবে ‘শুদ্ধিকরণ’ অভিযান। আর সেটা হলে ‘তৎকাল বিজেপি’দের দাপট অনেকাংশে কমবে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। কারণ, সংঘের কঠোর অনুশাসন মেনে যাঁরা ‘অগ্নিপরীক্ষা’য় পাশ করবেন, তাঁরাই পাবেন বিজেপিতে ঢোকার ছাড়পত্র।
বিজেপির রাজনৈতিক ‘গুরু’ হল আরএসস। আবার ‘আদর্শিক শক্তি’র আধারও বলা হয়ে থাকে। তবে, বিজেপির রাজনীতির ময়দানে প্রকাশ্যে সেভাবে দেখা যায়নি সংঘ পরিবারকে। বরং ‘মেঘনাদ’-এর মতো এতদিন নীরবে-নিভৃতে কাজ করে গিয়েছে। এবার বিজেপির বাংলা দখলের পিছনেও সংঘের এই ভূমিকা অত্যন্ত সহায়ক হয়েছে বলে মত রাজনীতির কারবারিদের। তবে, কাজটা খুব সহজ ছিল না। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর রাজ্যজুড়ে আরএসএসের একের পর এক শাখা বন্ধ হয়ে যায়। তা সত্ত্বেও তাদের দমানো যায়নি। অত্যন্ত সন্দর্পণে বঙ্গে গেরুয়া বীজ বপন করে গিয়েছেন সংঘ নেতারা। যার সুফল ঘরে তুলেছে বিজেপি। বাংলার কুর্সিতে দল। স্বাভাবিকভাবেই শাসনক্ষমতার স্বাদ পেতে বিজেপিতে নেতা-কর্মীদের স্রোত। সংঘ অবশ্য বদ্ধপরিকর বেনোজল রুখতে। তাই, বিজেপির সংগঠনের রাশ নিজেদের হাতে রাখতে এই তৎপরতা। এমনটাই দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে।
বৃহস্পতিবার আরএএসের এক নেতা বলছিলেন, প্রতিটি এলাকাতেই আমাদের লোকজন রয়েছে। কে আদি বিজেপি, আর কে ফল প্রকাশের পর গেরুয়া আবির মেখেছেন, সেই হিসাব রয়েছে। যে কেউ নিজেকে আদি বিজেপি নেতা দাবি করলেই হবে না। এখন যাঁরা দাপাদাপি করছেন শুদ্ধিকরণের পর তাঁদের অনেকেই পিছনের সারিতে চলে যাবেন। কারণ, দলে টিকে থাকতে হলে যে অনুশাসন বা শৃঙ্খলা মানতে হবে, সেটা তাঁদের পক্ষে সম্ভব হবে না। আসল আর নকলের ছাড়াই-বাছাই না হলে আগামীদিনে বাংলার মানুষের কাছে ভুল বার্তা যাবে। সেই কারণেই আরএসএস এবার সবটাই নিজের হাতে নিতে চাইছে। তবে সবকিছু হবে অন্তরালে।
বিজেপির এক নেতার সংযোজন, অনেক সময় বিপুল সাফল্য পাওয়া মাথাব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ভোটের ফল বেরনোর পর থেকে যেভাবে বহিরাগতরাও বিজেপির নেতা হয়ে উঠেছে, তা দলের পক্ষে মঙ্গল নয়। গেরুয়া তিলক কেটে তাঁরা নানা অনৈতিক কাজ করে চলছেন। এতে দলের প্রতি মানুষের বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। এই অবস্থা বেশি দিন চলবে না। বিভিন্ন জেলায় সংগঠনের হাল বদলে যাবে। বিতর্কিত পদাধিকারীদেরও সরিয়ে দেওয়া হবে।
ভোটের আগে আরএসএসের শীর্ষ কর্তারা রাজ্যে এসেছিলেন। মোহন ভাগবত টানা কয়েক দিন বর্ধমানে ছিলেন। বিভিন্ন জেলার সংগঠনের নেতৃত্বদের সঙ্গে তিনি দফায় দফায় বৈঠক করেছেন। প্রত্যন্ত এলাকায় গিয়ে সংগঠনের বীজ বপন করে তাঁরা সাফল্য এনে দিয়েছেন। সেই সাফল্যকে দীর্ঘমেয়াদী করতে সংঘ যে হাল ছাড়বে না, তা বেশ স্পষ্ট।