সংবাদদাতা, লালবাগ: নজরদারি ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অস্তিত্ব সঙ্কটে নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর স্ত্রী নৌসেরু বেগমের সমাধি। এই স্থাপত্য নিদর্শনটি নবাবি ইতিহাসের অন্যতম দলিল। এর সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের দাবিতে সরব হয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা, ইতিহাস গবেষক থেকে পর্যটন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন মহল। প্রায় ৩০০ বছরের প্রাচীন এই সমাধি ও সংলগ্ন মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য রাজ্য সরকারের হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। মুর্শিদাবাদ হেরিটেজ কালচারাল অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট সোসাইটির পক্ষ থেকে রাজ্য সরকারকে এবিষয়ে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
একসময় মুর্শিদাবাদ ছিল সুবা-বাংলার রাজধানী। ইতিহাস জানাচ্ছে, মুর্শিদাবাদ শহরের প্রতিষ্ঠা করেন বাংলার প্রথম স্বাধীন নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, মুর্শিদকুলির নামানুসারেই মুর্শিদাবাদ শহরের নামকরণ হয়েছে। নবাবি আমলের অবসানে, মুর্শিদাবাদ শহর ক্রমশ তার কৌলিন্য ও গরিমা হারাতে শুরু করে। নবাবি আমলের স্থাপত্য নিদর্শন হাজারদুয়ারি প্যালেস মিউজিয়াম, ইমামবাড়া, কাটরা মসজিদ সহ বেশকিছু দর্শনীয় স্থান পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ অধিগ্রহণ করেছে। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণ ও নজরদারির অভাবে কয়েক শতাব্দী ধরে অবহেলায় পড়ে রয়েছে নৌসেরু বেগমের সমাধি সহ নবাবি আমলের বেশকিছু স্থাপত্য। মুর্শিদাবাদ শহরের চকবাজারে ত্রিপোলিয়া গেটের পাশেই রয়েছে এই সমাধিস্থল। মুর্শিদাবাদের ইতিহাস থেকে জানা যায়, মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর নৌসেরু বেগম ১৭২৮-’৩০ সালে ত্রিপোলি গেটের পাশেই একটি মসজিদ নির্মাণ করান। মসজিদে ওঠার সিঁড়ির নীচে তিনি নিজের সমাধি তৈরি করান। তাঁর জীবদ্দশায় মসজিদের পাশেই একটি মক্তব ছিল। দুঃস্থ ছাত্রদের ওই মক্তবে রেখে নিজের খরচে পড়াশোনা করাতেন। মৃত্যুর পর নবাব-পত্নীকে মসজিদের নীচে সমাধিস্থ করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জীর্ণ মসজিদটি এখন ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করেছে। মসজিদের সিঁড়ির নীচের সমাধি আরও বেহাল অবস্থায় পড়ে রয়েছে। তবে, স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের বেশকিছু মানুষ ওই মসজিদে নামাজ পড়তে যান। বছর দুয়েক আগে তাঁরাই নিজেদের উদ্যোগে চাঁদা তুলে মসজিদের দেওয়াল প্লাস্টার করান। তবে মসজিদের সিঁড়ির নীচে শায়িত মুর্শিদকুলি খাঁর স্ত্রীর সমাধি অত্যন্ত বেহাল অবস্থায় পড়ে রয়েছে। লালবাগ শহরের বাসিন্দা মিনারুল হোসেন বলেন, বড় অনাদরে পড়ে রয়েছেন মুর্শিদাবাদের প্রথম নবাবের স্ত্রী। গাইড থেকে টাঙা চালকরা মুর্শিদাবাদে আসা পর্যটকদের দূর থেকেই মসজিদটি দেখান। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মসজিদ ও তার নীচে থাকা সমাধিকে এড়িয়ে যাওয়া হয়। ফলে মুর্শিদাবাদের নবাবদের অনেক ইতিহাসই পর্যটকদের কাছে অজানা থেকে যায়। স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেন, শুধু পর্যটক নয়, শহরের অনেকেই জানেন না, এই মসজিদের নীচে মুর্শিদকুলি খাঁর স্ত্রীর সমাধি রয়েছে। মুর্শিদাবাদ হেরিটেজ অ্যান্ড কালচারাল ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির সম্পাদক স্বপন ভট্টাচার্য বলেন, নবাবি ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে রয়েছে। রাজ্য সরকারকে রক্ষণাবেক্ষণের আবেদন জানিয়ে সংগঠনের পক্ষ থেকে চিঠি দিয়েছি। রাজ্য সরকার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিলে স্থাপত্য নিদর্শনটি পুনর্জীবন লাভ করবে। তাহলে পর্যটকরা ইতিহাসের সাক্ষী হতে পারবেন।