শ্যামলেন্দু গোস্বামী, বারাসত: দশভুজা হয়েও দৃশ্যমান মাত্র দু’টি হাত। বাকি আটটি হাত কেশের আড়ালে। দুই হাতেই পাঁচটি করে মোট দশটি অস্ত্র। মুখাবয়বে নৃসিংহের আদল। আর সিংহের বদলে বাহন কেশরযুক্ত ঘোড়া। দত্তপুকুরের শিবালয়ের রায়বাড়ির বুড়িমার পুজোয় দেবীর এমনই ব্যতিক্রমী রূপ। প্রায় ৩৫৬ বছরের প্রাচীন এই পুজোর আর এক বিশেষত্ব হল, বিসর্জনের আগে এক মুসলিম পরিবারের দেবী দর্শনের পরম্পরা। প্রতিমার অভিনবত্ব, লোকবিশ্বাস ও ধর্মীয় সম্প্রীতির মেলবন্ধনে আজও স্বতন্ত্র বুড়িমার পুজো। লোককথা অনুযায়ী, ১৬৬৯ সালে কৃষ্ণনগরের রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের বংশধর শিবচন্দ্র রায় সপারিষদ নৌকাবিহারে বেরিয়ে ভাগীরথী হয়ে সুতি নদী ধরে দত্তপুকুরে পৌঁছান। সেই রাতে প্রবল বৃষ্টিতে আটকে পড়েন তিনি। কথিত আছে, স্বপ্নে দেবী দুর্গার দর্শন পেয়ে নদীর পাড়ে তালপাতার ঘর তৈরি করে পুজো করা নির্দেশ পান শিবচন্দ্র। বৃষ্টি থামলে কুঁড়েঘর তৈরি করে দেবীর বোধন করেন তিনি। পরে তাঁর নাম অনুসারেই এলাকার নাম হয় শিবালয়। মন্দিরের পুরোহিত তন্ময় চট্টোপাধ্যায়ের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, যুদ্ধের সময় দেবী দু’হাত দিয়েই শত্রু নিধন করেন। দেবীর সেই যুদ্ধরত রূপকে তুলে ধরতেই প্রতিমায় মাত্র দু’টি হাত দৃশ্যমান। বাকি আটটি হাত দশভুজা রূপের প্রতীক হিসাবে কেশের আড়ালে থাকে। লোকবিশ্বাস, শিবচন্দ্রের স্বপ্নে দেবী এসেছিলেন নৃসিংহের আদলে। তাই প্রতিমার মুখাবয়বেও রয়েছে সেই ছাপ। এই পুজোর অন্যতম আকর্ষণ বিসর্জনের রীতি। কাঁধে করে বাঁশের দোলায় প্রতিমাকে নিয়ে যাওয়ার পথে দু’টি নির্দিষ্ট জায়গায় দোলা নামানো হয়— একটি দশভুজা মন্দিরের সামনে। অন্যটি স্থানীয় রহমত আলির বাড়ির সামনে। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, রহমত আলি স্বপ্নে দেবীর দর্শন পেয়েছিলেন। বিসর্জনের দিন বাড়ির সামনে মাকে দর্শন করেছিলেন তিনি। সেই বিশ্বাস থেকেই আজও তাঁর বংশধররা বিসর্জনের আগে মা’কে দর্শন করেন। রায় পরিবারের সদস্য তপন রায় বলেন, রহমত আলির পরিবারের লোকজন আজও মাকে দেখতে আসেন। তাঁদের দর্শন শেষ হওয়ার পর দেবীকে নিয়ে ঘাটের উদ্দেশ্যে রওনা হন ভক্তরা। পরম্পরা মেনেই পুজো হয়ে আসছে, তবে প্রতি বছর ভক্তদের ভিড় বাড়ছে। জানা গিয়েছে, রথযাত্রার দিন কাঠামো পুজোর মাধ্যমে শুরু হয় প্রস্তুতি। স্থানীয় বিশ্বাস— ষষ্ঠীতে বুড়িমার পুজো না হলে এলাকায় অন্য কোনো দুর্গাপুজো শুরু হয় না। প্রায় ১৭ দিন ধরে চলে উৎসব। অষ্টমীতে বহু ভক্ত দণ্ডী কাটেন। নবমীতে আখ, চালকুমড়ো ও কলা বলির রীতি রয়েছে। সন্তান কামনায় নবমীতে হোমের পোড়া কলা খাওয়ার প্রথাও প্রচলিত। পুজোর প্রথম বছরে স্থানীয় এক বৃদ্ধা মহিলা আচার-অনুষ্ঠানের দায়িত্ব সামলেছিলেন বলে দেবীর নাম বুড়িমা হয়েছে, এমন লোককথাও রয়েছে। প্রাচীন ঐতিহ্য, ব্যতিক্রমী প্রতিমা এবং বিসর্জনের সময় সম্প্রীতির পরম্পরা— সব মিলিয়ে শিবালয়ের বুড়িমার পুজো আজও এলাকার মানুষের আবেগ ও বিশ্বাসের অন্যতম কেন্দ্র।



