শক্তিগড়ে বাবা-মা ও মেয়েকে মার্ডার নাকি আত্মহত্যা? রহস্য
  • ৩১ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সুখেন্দু পাল, বর্ধমান: অপরাধ বিজ্ঞান বলে, অপরাধীরা কোনো না কোনো চিহ্ন রেখে যায়। একই কথা বলে মনস্তত্ব বিজ্ঞানও- অপরাধ ঘটানোর পর অপরাধীরা সর্বপ্রথম চেষ্টা করে প্রমাণ মুছে ফেলতে। আর সেটা করতে গিয়ে প্রচণ্ড তাড়াহুড়ো করে। সেটাই কাল হয় তাদের কাছে। সামান্য হলেও কিছু একটা ফাঁক সে রেখে যাবেই। এখন তদন্তের প্রতিটি ধাপই প্রযুক্তি নির্ভর। সেই প্রযুক্তির সঙ্গে বুদ্ধিমত্তার নিবিড় সমন্বয়ের মাধ্যমে তদন্তকারীরা ওই সামান্য ফাঁক থেকেই তদন্তের মোড় অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। তা হলে দামোদর নদ থেকে উদ্ধার হওয়ার একাধিক লাশ উদ্ধার হলেও কেন অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে? গলদটা ঠিক কোথায়? সেই ‘গলদ’ই কি বেপরোয়া করে তুলছে খুনিদের?

Advertisement

উত্তর খোঁজার আগে ফের একবার আতস কাচের তলায় ফেলা যাক শক্তিগড়ের হাড়হিম করা সেই ঘটনাটিকে—মাঠের আল লাগোয়া সামান্য দূরত্বের ব্যবধানে বাবা-মেয়ের কাদা মাখামাখি দেহ পড়ে। খোঁজ ছিল না মায়ের। তিনদিন পর পার্শ্ববর্তী নদীতে ভেসে ওঠে মায়ের দেহ! বেশি দিনের ঘটনা নয়, আগষ্ট মাসের। এখনও জেলাবাসীর মনে বেশ টাটকা। 
পুলিশের তদন্তে উঠে আসে, বাবা-মা ও মেয়ের বাড়ি বীরভূমের তারাপীঠ থানার লাহা গ্রামে। সেখান থেকে শক্তিগড়ের দূরত্ব প্রায় ১২০ কিলোমিটার। বর্ধমানে ডাক্তার দেখাতে এসেছিলেন তিনজনে। খোসবাগানে ডাক্তার দেখানোর কথা ছিল। মেয়ে মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন। তাঁকে নিয়ে প্রায়শই বর্ধমানে আসতেন বাবা-মা। রাস্তা অপরিচত নয়। কিন্তু, সেদিন খোসবাগান ছেড়ে কিভাবে এবং কেন শক্তিগড়ের হরিহরপুরচকে তাঁরা পৌঁছেছিলেন, তা নিয়ে ধন্দ কাটেনি। সেখানেই নদীর পাড়ে ধান জমির মধ্যে পড়েছিল বাবা ক্ষুদিরাম মাল এবং মেয়ে টুম্পা মালের দেহ। টুম্পার পোশাক অসংলগ্ন ছিল। তাঁর মায়ের দেহ তিনদিন পর উদ্ধার হয় হয় নদী থেকে। কিভাবে তিনজনের মৃত্যু হল? এটা পরিকল্পিত খুন নাকি অন্যকিছু? রহস্যের জট খোলেনি এখনও। তবে, পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, তাঁরা আত্মহত্যা করেছেন। কিন্তু কেন ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ উজিয়ে আত্মহত্যা করতে আসবেন? সেই প্রশ্নের উত্তর নেই তদন্তকারীদের কাছে। 
ক্ষুদিরামবাবুর পরিবারের সদস্যরা ‘আত্মহত্যা’র তত্ত্ব ঠিক হজম করতে পারছেন না। তাঁরা বলছেন, নিয়মিত ডাক্তার দেখিয়ে টুম্পা অনেকটাই সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন। পরিবারের অশান্তিও ছিল না। আত্মহত্যা তত্ত্ব বিশ্বাসযোগ্য নয়। তাঁরা ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তুলে এনেছিলেন। সেই টাকা কোথায় গেল, সেটাও জানা যায়নি। বাড়ি থেকে প্রত্যেককেই জুতো পরে এসেছিলেন। সেই জুতোও পাওয়া যায়নি। আত্মহত্যা করলে তিনজনের দেহ পৃথক তিনটি স্থানে উদ্ধার হওয়াও স্বাভাবিক নয়। পুলিশের এক আধিকারিক বলেন, ময়নাতদন্তের রিপোর্টে কীটনাশক পাওয়া যায়। কিন্তু আত্মহত্যা নাকি অন্যকিছু তা স্পষ্ট নয়। কোনও প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান পাওয়া যায়নি। অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু করেই তদন্ত চলছে। ঘটনাস্থল থেকে কীটনাশকের বোতল বা অন্যকিছু পাওয়া যায়নি। আশেপাশের বিভিন্ন সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখেন তদন্তকারীরা। তাতেও তেমন কিছু পাওয়া যায়নি। প্রায় তিনমাস কেটে গেলেও তিনটি দেহ উদ্ধারের রহস্য ভেদ হয়নি। শক্তিগড় থানা এলাকায় ক্ষুদিরামবাবুর এক আত্মীয়ের বাড়ি রয়েছে। তাঁদেরও জিজ্ঞাসাসবাদ করা হয়েছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে। কিন্তু, খুন না আত্মহত্যা, সেটা স্পষ্ট হয়নি। তবে, শক্তিগড়ের ঘটনার সঙ্গে অতীতে ধামাচাপা পড়ে যাওয়া বেশ কয়েকটি দেহ উদ্ধারের ঘটনার মিল যে একেবারেই নেই, তা অস্বীকার করছেন না অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।