


নয়াদিল্লি: ২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বর। বুধবার— ভারতের কাছে ‘ব্ল্যাক ওয়েডনেসডে’। ১০ পাকিস্তানি জঙ্গি রক্তস্রোত বইয়েছিল মুম্বইয়ে। সেই ঘটনার ১৭ বছর পর অবশেষে ভারতের হাতে এল ২৬/১১ মুম্বই হামলার অন্যতম মূল চক্রী তাহাউর হুসেন রানা। আমেরিকা থেকে তাকে নিয়ে বিশেষ বিমান যখন নয়াদিল্লির উদ্দেশে রওনা হচ্ছে, কাকতালীয়ভাবে সেই দিনটাও ছিল বুধবার। ভারতীয় সময় তখন সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা। প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা নাগাদ দিল্লির পালাম বিমানবন্দরে নামল সেই বিমান। তারপরই সরকারিভাবে এনআইএ হেফাজতে এল পাকিস্তানি সেনার প্রাক্তন চিকিৎসক রানা। ২০০৯ সালেই সে ধরা পড়েছিল মার্কিন গোয়েন্দাদের হাতে। গ্রেপ্তারির পরও তাকে ভারতে আনতে প্রায় ১৬ বছর সময় লেগে গেল। গভীর রাতের শুনানি শেষে রানাকে ১৮ দিন এনআইএ হেফাজতে রাখার নির্দেশ দিয়েছে পাতিয়ালা হাউস কোর্টের বিশেষ আদালত।
বিশেষ বিমানে ৬৪ বছরের রানাকে সঙ্গে নিয়ে বৃহস্পতিবার ভারতের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা আধিকারিকদের একটি দল নামে দিল্লির পালাম বিমানবন্দরে। কড়া নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে ফেলা হয় বিমানবন্দর, এনএআইএ সদরদপ্তর, পাতিয়ালা হাউস কোর্ট ও তিহার জেল সহ দিল্লির বিভিন্ন এলাকা। এনআইএর তরফে এক বিবৃতিতে বলা হয়, রানার প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া সাফলের সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে। গোটা প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে সহায়তা করেছে মার্কিন বিচার বিভাগ, ইউএস স্কাই মার্শাল। ভারতে পা দেওয়ার পর পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত এই কানাডার নাগরিককে সরকারিভাবে গ্রেপ্তার করেছে এনআইএ। সূত্রের খবর, পালাম বিমানবন্দরে বিশেষ বিমান অবতরণের পর প্রথমে রানার মেডিক্যাল পরীক্ষা হয়। রাত ৯টারও পরে বিমানবন্দরের বাইরে বেরয় মুম্বই হামলার এই মূল চক্রী। বুলেটপ্রুফ গাড়িতে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় পাতিয়ালা হাউস কোর্টে, এনআইএর বিশেষ আদালতে। সন্ধ্যা থেকেই সেখানে মোতায়েন ছিল দিল্লি পুলিসের স্পেশ্যাল সেল ও সোয়াট কমান্ডো। প্রস্তুত রাখা হয়েছিল যে কোনও ধরনের হামলা প্রতিহত করতে সক্ষম ‘মার্কসম্যান’ গাড়িও। বিশেষ বিচারক চন্দরজিৎ সিংয়ের এজলাসে শুরু হয় শুনানি। সেখানে রানাকে ২০ দিনের জন্য হেফাজতে চেয়ে আবেদন করে এনআইএ। যদিও আদালত দু’দিন কমিয়ে ১৮ দিনের হেফাজতের নির্দেশ দেয়। শুনানিতে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা আদালতকে জানায়, মুম্বই হামলায় বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের পর্দা ফাঁস করতে রানাকে জেরা করাটা জরুরি। আদালত জানতে চায়, অভিযুক্তের কোনও আইনজীবী রয়েছে কি না? রানার কোনও আইনজীবী নেই জানতে পেরে বিচারক দিল্লির লিগাল সার্ভিস থেকে আইনজীবী পীযূষ সচদেবাকে তার হয়ে সওয়ালের জন্য নিয়োগ করেন।
রানার প্রত্যর্পণ নিশ্চিত করতে ভারতের তরফে মার্কিন আদালতে সওয়াল করেছিলেন প্রবীণ আইনজীবী দয়ান কৃষ্ণন। এবার ভারতে দয়ানের পাশাপাশি রানার বিচারের প্রক্রিয়ায় এনআইএ’র হয়ে সওয়াল করতে চলেছেন আইনজীবী নরেন্দ্র মান। তাঁকে তিন বছরের জন্য এই মামলার বিশেষ পিপি হিসেবে নিযুক্ত করে বৃহস্পতিবার রাতে একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। তবে রানার প্রত্যর্পণ নিয়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক তরজাও। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পীযূষ গোয়েল বলেছেন, ‘মুম্বই হামলার জঙ্গিদের সাজা দেওয়ার চেষ্টাই করেনি কংগ্রেস সরকার। ওরা আজমল কাসবকে বিরিয়ানি খাইয়েছে। দেশের ক্ষতি করা জঙ্গিদের চরম শাস্তি নিশ্চিত করেছেন একমাত্র প্রধানমন্ত্রী মোদিই।’ বিজেপির তরফে এক্স হ্যান্ডলে পোস্ট করে লেখা হয়েছে, ‘ভারতে জঙ্গিদের জন্য কোনও ক্ষমা নেই।’ আর সেই পোস্টের সঙ্গেই বড় করে প্রধানমন্ত্রী মোদির ছবি দেওয়া হয়েছে। পাল্টা আসরে নেমেছ কংগ্রেসও। দলের প্রবীণ নেতা তথা প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পি চিদম্বরম বলেন, ‘রানার প্রত্যর্পণের পুরো কৃতিত্ব দাবি করতে তড়িঘড়ি মাঠে নেমে পড়েছে মোদি সরকার। যদিও সত্যিটা হল, প্রত্যর্পণের এই প্রক্রিয়া দীর্ঘ দেড় দশকের কূটনৈতিক, আইনি ও গোয়েন্দা প্রচেষ্টার ফল, যা শুরু হয়েছিল ইউপিএ আমলে।’