মা আসেন, ঘরে আর ফেরা হয় না!
  • ২২ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

বাঙালির প্রাণের উৎসব দুর্গাপুজো মানেই ঘরে ফেরা, প্রিয়জনদের সঙ্গে দেখা করা, নতুন জামার গন্ধ আর চেনা গলিতে বন্ধু কিংবা পরিজনদের সাথে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া। কাজের তাগিদে ভিনরাজ্যে থাকা অনেক বাঙালির কাছে পুজো মানে বাড়ি ফেরার অপেক্ষা। কেউ ছুটি পান না, কেউ দায়িত্বের বাঁধনে আটকে থাকেন। কারুর বাড়ি ফেরার সেই ঠিকানাটাই আর থাকে না। তাঁদের পুজো কাটে ফোনের স্ক্রিনে অঞ্জলি দেখে, ঢাকের আওয়াজ শুনে কিংবা স্মৃতির পাতায় চোখ বুলিয়ে।

Advertisement

রায়পুরের একটি শপিং মলে কাজ করেন সুজাতা দত্ত। পশ্চিমবঙ্গের বেহালার বাসিন্দা সুজাতার এবছর পুজোয় বাড়ি ফেরা হচ্ছে না। তিনি জানান, “মায়ের অসুস্থতার জন্য এবছর জুন মাসে বাড়ি গিয়েছিলাম। তাই এখন আর ছুটি নেই। স্টোরে এবার প্রচুর ভিড়, দীপাবলি পর্যন্ত এই ব্যস্ততা চলবে। কর্মসূত্রে এখানে থাকলেও মন পড়ে রয়েছে আমার বাড়ির মোড়ের পুজোমণ্ডপে। মাকে বলে রেখেছি, অঞ্জলির সময় যেন আমাকে ফোন করেন"।

রায়পুরের পণ্ডরিতে রোলের স্টল চালান বিক্রম হোতা। তাঁর পরিবারের শিকড় ওড়িশায় হলেও বাংলার সঙ্গে জন্মসূত্রের টান। বন্ধুর সঙ্গে ছত্তিশগড়ে এসে প্রথমে হোটেলে কাজ করতেন, এখন নিজের ব্যবসা। কর্মব্যস্ততায় পুজোর সেই ছোটবেলার আনন্দ আর ফিরে পান না তিনি। বিক্রমের কথায়, “আমার দাদু ওড়িশার। বাবা মলদায় কাজ করতেন, সেখানেই আমাদের জন্ম, বেড়ে ওঠা। বন্ধুর সঙ্গে ছত্তিশগড়ে এসে হোটেলে কাজ করেছি। এখন নিজের রোলের স্টল দিয়েছি। আমরা ওড়িয়া হলেও দুর্গাপুজোই আমাদের কাছে প্রধান উৎসব। এখন পরিবার নিয়ে এখানেই থাকি। বাড়িটাও আর নেই। ছোটবেলার কথা খুব মনে পড়ে। পুজো মানেই ছিল বছরের একটা নতুন জামা। এখন আর পুজোর সেই আমেজ পাই না। এখানে নবরাত্রিতে প্রচুর কাজ থাকে। কীভাবে পুজো কেটে যায়, বুঝতেই পারি না।”

 

তবে ভিনরাজ্যে থেকেও স্থানীয় পুজোর মধ্যেই নিজের সংস্কৃতিকে খুঁজে পান অনেকে। রায়পুরের দেবেন্দ্রনগরের একটি ড্রাইভিং স্কুলের পরিচালক শম্ভু চৌধুরী তাঁদেরই একজন। কলকাতার ছেলে শম্ভুর স্ত্রী ত্রিপুরার সোনামুড়ার বাসিন্দা। দুই সন্তানকে নিয়ে এখন রায়পুরে থাকেন। পুজোয় বাংলা বা ত্রিপুরায় যাওয়া না হলেও শহরের কালীবাড়িতে উৎসবে শামিল হন তাঁরা।

শম্ভু বাবু জানান, “দুর্গাপুজোয় বাংলা কিংবা ত্রিপুরায় যেতে না পারলেও রায়পুরে ধুমধাম করে পুজোর আনন্দ উপভোগ করি। আকাশবাণী সংলগ্ন কালীবাড়িতে যাই। সেখানে বাঙালি রীতিনীতি মেনেই পুজো হয়। প্রচুর বাঙালি বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে দেখা হয়। মহাষ্টমীর অঞ্জলি থেকে বিজয়ার মিষ্টিমুখ, যেন এক টুকরো বাংলা ফিরে পাই। এটাই আমাদের প্রাপ্তি”।

সুজাতার কাছে পুজো মানে দূর থেকে মায়ের সঙ্গে অঞ্জলির মুহূর্ত ভাগ করে নেওয়া, বিক্রমের কাছে ছোটবেলার স্মৃতি, আর শম্ভুর কাছে বহিরাজ্যে থেকেও নিজের সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত থাকার আনন্দ। অভিজ্ঞতা আলাদা হলেও তাঁদের জীবনে দুর্গাপুজো জড়িয়ে রয়েছে একই সুতোয়, নিজের জায়গা ও দুর্গোৎসবের টান। 

উৎসবের মরশুমে কাজের ব্যস্ততা কিংবা দূরত্ব অনেককেই পরিবার থেকে আলাদা রাখে। তবু কেউ ফোনের ওপারে, কেউ স্থানীয় পুজোমণ্ডপে খুঁজে নেন পরিচিত উৎসবের আনন্দ। মা দুর্গা প্রতি শরতে আসেন, কিন্তু সবার আর ঘরে ফেরা হয় না।