বিশ্বজিৎ দাস, কলকাতা: শিউরে ওঠার মতোই ঘটনা। বছর চারেকের একরত্তি বাচ্চাটির দেহের ময়নাতদন্ত শেষে সম্পূর্ণ নিরুত্তাপ থাকতে পারেননি কাঁটাপুকুর মর্গের পোড়খাওয়া ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকরা পর্যন্ত। ওইটুকু বাচ্চাকে আছাড় মারা হয়েছে। ভারী জিনিস দিয়ে মাথায় মারা হয়েছে। শুধু তাই নয়, পায়ুদ্বারে শিক পর্যন্ত ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সোনারপুরের এই ঘটনাটি ব্যতিক্রমী কোনো ঘটনা হয়। ‘অবাঞ্ছিত’ মনে করে বহু শিশুর উপর অত্যাচার বাড়ছে বাড়িতেই, যেখানে তার সবচেয়ে নিরাপদে বেড়ে ওঠার কথা।
মর্গ সূত্রের খবর, ২০২৫ সালে, ঠিক গতবছরে এমন বেশ কয়েকটি ঘটনা দাগ কেটে গিয়েছে ময়নাতদন্তকারীদের মাথায়ও। কারণ, ‘হোমিসাইড ইন নেচার’ ঘটনাগুলি ঘটেছে দুই থেকে চার-পাঁচ বছরের শিশুদের সঙ্গে। শরীরজুড়ে পূর্ব মারধর, ছ্যাঁকা, ধারালো অস্ত্রের কাটা দাগ ও শারীরিক নিগ্রহের চিহ্নও পাওয়া গিয়েছে ময়নাতদন্ত করবার সময়। এমনকি কয়েকটি ক্ষেত্রে একরত্তি শিশুকন্যাকে যৌননিগ্রহ করারও চিহ্ন রয়েছে। পুলিসের কাছ থেকে তাঁরা যতটুকু ইতিহাস জানতে পেরেছেন, তার মধ্যে কয়েকটি ঘটনা পরকীয়া সম্পর্ক নিয়ে সন্দেহের নিদারুণ ফলাফল। স্বামী মনে করেছেন, বাচ্চাটির তারই নয়। স্ত্রীর পরকীয়া সঙ্গীর। এমনও ইতিহাস পাওয়া গিয়েছে, যেখানে আজকের মঙ্গলযানের যুগেও মনে করা হয়েছে, ঘরে আগত সন্তানটি অভিশাপসমান! কুসংস্কারাচ্ছন্ন মনোবিকার এমন জায়গায় গিয়েছে, পরিবারের কিছু সদস্য মনে করেছে, বাচ্চাটি সংসারে আসার পর থেকেই যত অমঙ্গলের শুরু! স্বামী বা স্ত্রীর দ্বিতীয় বিবাহের পর প্রথম পক্ষের সন্তানের উপর পাশবিক অত্যাচারের ঘটনাও ঘটেছে।
পরিসংখ্যানের বিচারে এন আর এস মেডিকেল কলেজের পরই রাজ্যের দ্বিতীয় বড়ো পুলিস মর্গ হল কাঁটাপুকুর। সেখানকার প্রধান ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক তথা সহকারী মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক (মেডিকো লিগাল) ডাঃ অমল প্রধান বলেন, যে ধরনের অত্যাচারের চিহ্ন আমরা দেখেছি, তাকে মেডিকেল পরিভাষায় বলা হয় ব্যাটার্ড বেবি সিনড্রোম। মনোবিকার না-থাকলে কেউ এভাবে দুই, তিন, চার বছরের বাচ্চাকে মারে? সে সম্পর্কের যাই ঘাত-প্রতিঘাত থাকুক না কেন। সেই শোধ বাচ্চার উপর গিয়ে মেটাচ্ছে? শিশুদের উপর এই ধরনের অপরাধ বন্ধ করতে অভিভাবকদের পাশাপাশি পুলিস, শিশু সুরক্ষা কমিশন প্রভৃতি সংস্থার আরও সতর্ক হওয়া উচিত।
বিশিষ্ট মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ দেবাঞ্জন পান বলেন, নিশ্চিতভাবে এগুলি মনোবিকারের ঘটনা। পাশাপাশি একজনের উপর তৈরি হওয়া আক্রোশ একটি ছোট্ট অসহায়, অপরের উপর নির্ভরশীল প্রাণের উপর মেটানো। যে গুছিয়ে কথা বলতে পারে না, প্রতিবাদ তো করতেই পারে না।