সংবাদদাতা, কৃষ্ণনগর: সারা বছর কেউ মাছ ধরেন, কেউ দিনমজুরি করেন, কেউ আবার কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু পুজো এলেই বদলে যায় তাঁদের পেশার চেহারা। সুন্দরবনের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে কৃষ্ণনগরে ছুটে আসেন একদল শ্রমজীবী মানুষ। কাঁধে তুলে নেন দুর্গা প্রতিমা। পুজোর কয়েকটা মাস ঠাকুরবাহকের কাজ করেন বাড়তি রোজগারের চেষ্টায়। তবে শুধুই রোজগার নয়, মায়ের প্রতি বিশ্বাস এবং ভক্তিও তাঁদের এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার অন্যতম কারণ।
সুন্দরবন থেকে কৃষ্ণনগরে আসার পথও সহজ নয়। লঞ্চে নদী পেরিয়ে, এরপর ট্রেন বা বাসে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে শহরে পৌঁছন তাঁরা। পরিবারের কাছ থেকে দূরে থেকে পুজোর মরশুমটা কৃষ্ণনগরেই কাটে তাঁদের। মৃৎশিল্পালয় থেকে প্রতিমা গাড়িতে তোলা, দড়ি দিয়ে নিরাপদে বেঁধে দেওয়া, মণ্ডপে নিয়ে গিয়ে স্থাপন করা থেকে বিসর্জনের সময় কাঁধে তুলে নেওয়া, সব কাজেই তাঁদের ডাক পড়ে।
এই কয়েক মাসের উপার্জন সংসারের খরচ মেটাতে অনেকটাই সাহায্য করে। ফলে প্রতিবছর পুজোর আগে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকা থেকে দল বেঁধে কৃষ্ণনগরে চলে আসেন তাঁরা।
তবে অর্থের পাশাপাশি রয়েছে গভীর ধর্মীয় বিশ্বাস। ঠাকুরবাহকদের কথায়, ‘মা ডাকেন বলেই আসি। মায়ের প্রতিমা নিজের কাঁধে তুলে নেওয়ার সুযোগ পাওয়াটাই আমাদের কাছে আনন্দের।’ দীর্ঘ পথশ্রমের ক্লান্তি, প্রতিমা বহনের শারীরিক ধকল, সবকিছুই মায়ের প্রতি ভক্তির কাছে তুচ্ছ হয়ে যায়। ঠাকুরবাহক বিমল সরোদা বলেন, ‘১০-১২ বছর ধরে কৃষ্ণনগরে আসছি। পুজোর সময় ভালো কাজ হয়, তাই বারবার আসি। তবে মায়ের প্রতিমা তুলে দিতে পারাটা আলাদা আনন্দের। অনেক ক্লাবও আমাদের সাহায্য করে।’
শ্যামল নস্কর বলেন, ‘প্রতি বছর পুজোর দু’ মাস এখানে কেটে যায়। ঠাকুর তোলা কষ্টের কাজ হলেও আনন্দ পাই। কালীপুজো ও জগদ্ধাত্রী পুজোতেও আবার আসব। কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পুজোর বিসর্জনে মাকে কাঁধে তুলতে পারা আমাদের কাছে গর্বের।’
সংসারের প্রয়োজন তাঁদের কৃষ্ণনগরে টেনে আনলেও মায়ের প্রতিমা বহনের আনন্দ তাঁদের এই পরিশ্রমকে অন্য মাত্রা দেয়। তাই পুজো শেষ হলেও পরের মরশুমের অপেক্ষায় থাকেন তাঁরা।