


সমৃদ্ধ দত্ত: মহাভারতের শান্তিপর্বে পিতামহ ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরদের যে পরামর্শ প্রদান করছিলেন, সেখানে একাধিকবার উঠে এসেছে একটি শব্দ। গণসংঘ! কোন গণসংঘকে শ্রেষ্ঠতম শাসনব্যবস্থা বলেছেন ভীষ্ম? যাদের রাজ্যনীতি প্রজাদের জীবনযাপনের উন্নতির স্বার্থে নির্ধারিত হয়। যাদের রাজকোষে থাকে প্রভূত সম্পদ। যাদের হাতে শুধু যুদ্ধজয়ের জন্য পর্যাপ্ত সেনা নয়, সর্বদা উদ্বৃত্ত বাহিনীও থাকবে। যাতে সেনাক্ষয়ের সময় কাজে লাগে। আর থাকবে উন্নত আইন এবং শৃঙ্খলা।
ইতিহাসবিদ ও গবেষকরা নিশ্চিত যে, এই গণসংঘ শব্দটি আসলে গণতান্ত্রিক প্রশাসনের দিকেই ইঙ্গিত করছে। ঠিক যেমন মনে করা হয়, শ্রীকৃষ্ণ আসলে ছিলেন যাদব সম্প্রদায়ের অন্ধক ও বৃষ্ণি সংঘের প্রধান। সেটি আদতে ছিল চারটি পৃথক সম্প্রদায়গোষ্ঠীর একটি মহাসংঘ, যাদের একটি করে সভা ছিল। সেই সভার সদস্যরা হতেন বিভিন্ন সংঘের প্রতিনিধি। যে কোনো সিদ্ধান্ত সেই সভায় সংঘগুলি নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে তবেই গ্রহণ করত। তাহলে কি প্রাচীন ভারতের সর্বত্র নিছক একজন রাজা কিংবা গোষ্ঠী অধিপতি সব সিদ্ধান্ত একচ্ছত্রভাবে গ্রহণ করতেন না? বহু রাজ্য, জনপদ, অঞ্চল পরিচালিত হত গণসংঘের মাধ্যমে! কারণ, মহাভারতের শান্তিপর্বে একাংশে শ্রীকৃষ্ণকে বলা হয়েছে সংঘ মুখ্য।
এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার মতো একঝাঁক উদাহরণ রয়েছে। প্রাচীন ভারতের সাহিত্য ও গ্রন্থগুলিতে হিমালয়ের পাদদেশে থাকা বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা গিয়েছে দু’রকম গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। শাক্য, কোলিয়, মৌর্য ইত্যাদি সম্প্রদায়ের মধ্যে একজন সংঘপ্রধান থাকত। আবার অন্ধক, বৃষ্ণি, ভাজ্জি জাতীয় সম্প্রদায়গুলি মিলে চালাত যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা। একাধিক রাজ্য তথা প্রদেশ একজোট হয়ে একটি সংঘ আকারে পরিচালিত হত। যেমন গৌতম বুদ্ধ জন্মগ্রহণ করেছিলেন শাক্য গোষ্ঠীতে। তাঁর পিতা শুদ্ধোদন ছিলেন এমন এক গোষ্ঠীপ্রধান, যে গোষ্ঠীর মহাসংঘের সদস্য সংখ্যা ছিল অন্তত ৫০০ জন। বৈদেহ, লিচ্ছবি, মাল্লা সম্প্রদায়গুলিও এভাবে একটি করে মহাসভায় নিজেদের গোষ্ঠীর সদস্যদের প্রতিনিধিরূপে নিয়োগ করত। গৌতম বুদ্ধের বোধিপ্রাপ্তির পর যে সংঘ নির্মিত হয়েছিল, সেটি ছিল আধুনিক গণতন্ত্র ও সংসদীয় ব্যবস্থার আদিরূপ। বৌদ্ধ সূত্রগুলিতে দেখা যায় যে, কোনো একটি নতুন সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার আগে দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনা হত। এমনকি দিনের পর দিন আলোচনার পরও ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি, তেমন ঘটনার কথাও জানা যায়। খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ অব্দের সময়কালেও ইতিহাসের মহাজনপদগুলিতে গণতান্ত্রিক কাঠামোয় রাজ্য শাসনের ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছে।
প্রাচীন ভারতের এই সংঘ ব্যবস্থার প্রসঙ্গ উত্থাপনের কারণ হল, ভারতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজ্য তথা রাষ্ট্রশাসন নতুন নয়। এমন নয় যে, ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি প্রথমবার সাধারণতন্ত্র আত্মপ্রকাশ করল ভারতে! গণতন্ত্রের ধ্যান-ধারণা, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংঘ চালনা, নগরের প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রবণতা এতটাই প্রাচীন যে, হরপ্পা সভ্যতার গবেষণায় সেই আভাস ও ইঙ্গিত পেয়েছেন গবেষকরা।
গণতন্ত্র যে দেশের রক্ত-মজ্জা-অস্থির মধ্যে কয়েক হাজার বছর ধরে অন্তর্ভুক্ত, সেই দেশের আধুনিক শিক্ষিত সমাজ যে সার্বভৌমত্ব অর্জনের জন্য সবার আগে চাইবে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা, তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই। অতএব ১৮৮৬ সালে ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনে লালা লাজপত রাই স্বরাজ তথা স্বাধীনতা শব্দের উত্থাপন করলেন বারংবার। সেই শুরু। যদিও প্রাথমিকভাবে সেই স্বাধীনতার ধারণা ছিল, ব্রিটিশ রাজের অধীনে থেকেও স্বশাসনের অধিকার। প্রায় ৩০ বছর পর হোমরুল আন্দোলনের মাধ্যমে সেই দাবি তোলে কংগ্রেসের একাংশ। কিন্তু তার আগেই ১৯০৭ সালে অরবিন্দ ঘোষ ‘বন্দে মাতরম’ পত্রিকায় স্পষ্ট করে দেন, পূর্ণ স্বাধীনতা চাই!
কিন্তু প্রত্যক্ষ সংঘাত শুরু হতে আরও সময় লাগল। একজনও ভারতীয় সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত না করে, সাইমন কমিশনকে দায়িত্ব দেওয়া হল ভারতের প্রশাসনিক সংস্কার এবং দ্বৈতশাসন ব্যবস্থা নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের। স্বাভাবিকভাবেই ভারতীয় নেতৃত্ব সাইমন কমিশনকে মান্যতা দিতে রাজি হল না। আবার ব্রিটেনেও তীব্র আলোড়ন উঠল। ভারতকে কেন কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার ধাঁচে ডোমিনিয়ন স্টেটাস দেওয়া হবে? ভারত নাকি তার যোগ্যই নয়! সে যেমন ব্রিটিশের অধীনস্থ আছে, তেমনই থাকবে।
ভাইসরয় লর্ড আরউইন কিছুটা থমকে গেলেন। লন্ডনে গোলটেবিল বৈঠক ডাকা হল। আরউইনকে মহাত্মা গান্ধী বললেন, ‘এই আলোচনা কীসের জন্য? ডোমিনিয়ন স্টেটাস দেবেন কবে সেটা স্থির হবে?’ যদিও ডোমিনিয়ন স্টেটাস মেনে নেওয়া তো দূরের কথা, এই নিয়ে আলোচনারই পক্ষপাতী ছিলেন না কংগ্রেসের দুই নেতা। জওহরলাল নেহরু ও সুভাষচন্দ্র বসু। কেন? কারণ, দু’জনের ছিল একটিই দাবি, পূর্ণাঙ্গ স্বরাজ! ১৯২৭ ও ১৯২৮ সালে গান্ধীজি এবং নেহরুর মধ্যে প্রবল সংঘাতপূর্ণ চিঠির আদানপ্রদান হয়েছিল। নেহরু যতটা কঠোর ভাষায় গান্ধীজিকে আক্রমণ করেছিলেন ব্রিটিশের প্রতি নরম মনোভাবের জন্য, সেটি গান্ধীজির কাছে ছিল অবিশ্বাস্য! তিনি কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার ভাবনাচিন্তা শুরু করেন। তা কংগ্রেসকে ভেঙে দু’টুকরো হওয়ার দিকেই ঠেলে দিতে পারত। কিন্তু শেষ মুহূর্তে কঠোর মনোভাব থেকে সরে আসেন নেহরু। পরে অবশ্য তিনি ও সুভাষচন্দ্র বসু যা চেয়েছিলেন, সেটাই হল। অর্থাৎ, কংগ্রেস পূর্ণ স্বরাজের দাবিই জানাল।
লর্ড আরউইন যখন গান্ধীজিকে বললেন, ডোমিনিয়ন স্টেটাস নিয়ে ভাবছি। কিন্তু মনে হয় না তা এখনই হবে। সময় লাগবে। কতটা? আরউইনের হিসাবে অন্তত ছ’বছরের আগে নয়। এই ভাসা ভাসা উত্তরে কংগ্রেস সন্তুষ্ট হল না। ১৯২৯ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ দিনে লাহোর অধিবেশনে ঘোষণা করা হল পূর্ণ স্বরাজের দাবি! সভাপতি ছিলেন জওহরলাল নেহরু। স্থির হল, ১৯৩০ সালের ২৬ জানুয়ারি স্বাধীনতা দিবস পালিত হবে। প্রস্তাব নেওয়া হল, পূর্ণ স্বরাজই একমাত্র লক্ষ্য।
এই একটি ঘোষণাই ভারতের সঙ্গে ব্রিটিশ সরকারের সম্পর্ককে পুরোপুরি বদলে দিল। কারণ, এই যে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস সরাসরি পূর্ণ স্বরাজের দাবিকে প্রতিষ্ঠা করল, সেটি আর আবেদন-নিবেদনের পর্যায়ে রইল না। স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হল, পূর্ণ স্বরাজ পাওয়া ভারতের অধিকার। ব্রিটিশ এবার স্থির করুক, সেই স্বাধীনতা তথা ক্ষমতা হস্তান্তর কীভাবে এবং কত দ্রুত হবে! এই যে কংগ্রেস ১৯৩০ সালের ২৬ জানুয়ারিকে স্বাধীনতা দিবস হিসাবে পালনের ঘোষণা করল, সেই তারিখ রয়ে গেল ভবিষ্যৎ ভারতের ইতিহাসে একটি সর্বাঙ্গীণ গৌরবময় দিন হিসেবে। ১৯৪৯ সালের ২৬ নভেম্বর যখন ভারতের নিজস্ব সংবিধানকে অবশেষে অনুমোদন দিল সংবিধান সভা, তখনই স্থির হয়েছিল সেটি কার্যকর করা হবে ২৬ জানুয়ারি। কারণ, ওই তারিখটিই ভারতের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতার দিকে অগ্রসর হওয়ার পথের প্রথম পদক্ষেপ। দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া ব্রিটিশের প্রতিও যা ছিল স্বাধীন ভারতের এক জোরালো বার্তা। কেন?
কারণ, ভারত কবে স্বাধীনতা পাবে সেই নিয়ে আলোচনা, জল্পনা, চর্চার সময় সর্বশেষ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন একটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে—১৫ আগস্ট ভারতকে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হোক! ১৯৪৫ সালের ওই তারিখেই আত্মসমর্পণ করেছিল জাপান, যা ব্রিটিশের কাছে বিরাট এক জয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই বিজয়কে স্মরণীয় করে রাখতে স্থির হয়েছিল ভারতকে স্বাধীনতা দেওয়ার দিনক্ষণ।
ভারতের নেতৃত্ব চেয়েছিল ২৬ জানুয়ারি যেন করা হয় ক্ষমতা হস্তান্তর। সেই দাবি মান্যতা পায়নি। আর তাই স্বাধীন ভারত সরকারের আমলের সংবিধান সভা নিজস্ব সংবিধানকে কার্যকর করে দেশকে গণতন্ত্রের দিশায় এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মাহেন্দ্রক্ষণ নির্ধারণ করেছিল ২৬ জানুয়ারি। তাই এই দিনটি কোনও অংশেই ১৫ আগস্টের তুলনায় কম তাৎপর্যপূর্ণ ও গৌরবময় নয়, এটা স্মরণে রাখতে হবে ভারতবাসীকে।
ব্রিটিশ সরকার যে অবশেষে ভারতকে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চলেছে, সেই ইঙ্গিত ১৯৪৫ সালেই পাওয়া গিয়েছিল। বোম্বাইয়ের নৌবিদ্রোহ সহ একের পর এক ঝড় আছড়ে পড়ছে। অথচ ব্রিটিশ সরকার সামলাতে পারছে না। ব্রিটেনের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ক্লেমেন্ট অ্যাটলি ১৯৫৬ সালে একবার কলকাতায় এসেছিলেন। হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি জাস্টিস পি বি চক্রবর্তী তাঁকে প্রশ্ন করেন, ‘ব্রিটিশ সরকার ভারত ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কেন? মূল কারণ কী ছিল?’ ঘটনাচক্রে পি বি চক্রবর্তী তখন বাংলার রাজ্যপালও। অ্যাটলি জানান, বোম্বাইয়ের নৌবিদ্রোহ এবং আজাদ হিন্দ ফৌজের সেনাদের বিচারপর্ব, এই দুয়ের কারণে যে প্রবল জন আন্দোলন ও সংঘাত শুরু হয়েছিল, সেটিই ছিল অন্যতম প্রধান কারণ। ওই পরিস্থিতি ব্রিটিশ সরকারকে ভাবতে বাধ্য করেছিল যে, এবার চলে যেতে হবে ভারত ছেড়ে। কারণ, ব্রিটিশ ভারতের সেনাবাহিনীতে ভারতীয় জওয়ান ও আধিকারিকদের আর সম্পূর্ণ বিশ্বাস করা যাবে না। সকলের মধ্যেই আজাদ হিন্দ ফৌজের একটি অনুপ্রেরণা চলে এসেছিল। সেনাবাহিনীই যদি সরকারের আদেশ মান্য না করে, তাহলে আর সেই রাষ্ট্র শাসন করা কতদিন সম্ভব?
তাই স্বাধীনতা যে দিতেই হবে, ব্রিটিশদের কাছে সেটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল ১৯৪৬ সালেই। আর যদি স্বাধীনতা পাওয়া যায়, তাহলে তো স্বশাসনের একটি প্রক্রিয়া দরকার! স্বাধীন রাষ্ট্রের একটি নিজস্ব সংবিধানও চাই। সেই প্রয়োজনীয়তাকে মাথায় রেখেই ১৯৪৬ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় এবং প্রাদেশিক সরকারের পাশাপাশি গঠন করা হল সংবিধান সভাও।
সংবিধান সভার কাজ কী ছিল? ভারতের জন্য একটি নিজস্ব সংবিধান তৈরি করা। নচেৎ নামেই স্বাধীন, আদতে ব্রিটিশ সরকারের নিয়মকানুন, আইন, শাসন, বিচারব্যবস্থায় চলতে হত। সেটা সম্মানজনক নয়। অতএব ১৯৪৬ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে সংবিধান সভায় শুরু হয় এক বিস্তৃত আলোচনা। সংবিধান রচনার জন্য যে কমিটি গঠিত হয়, তার চেয়ারম্যান ভীমরাও আম্বেদকর। এবং সদস্য ছিলেন একঝাঁক দলের নেতা। তিন বছর আলোচনার শেষে ১৯৪৯ সালের ২৬ নভেম্বর অনুমোদিত হয় ওই সংবিধান, যা কার্যকর হবে ১৯৫০ সালে ২৬ জানুয়ারি।
তাহলে ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা পর থেকে ভারতের আইনকানুন, শাসন প্রণালী কীভাবে চলত? তা চলত ব্রিটিশ আইন ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী। অর্থাৎ স্বাধীন হয়েও যেন পুরোদস্তুর স্বাবলম্বী হওয়া সম্ভব হয়নি। অতএব স্বাধীনতা দিবস ছিল মুক্ত সার্বভৌম স্বয়ম্ভর রাষ্ট্র নির্মাণের প্রথম ধাপ। অন্তিম ধাপ সাধারণতন্ত্র দিবস।
সাধারণতন্ত্র মানে কী? গণতন্ত্রের সর্বোচ্চ অবস্থান। তাহলে ২৬ জানুয়ারি সাধারণতন্ত্র দিবসের তৎপর্য কী হল? সংবিধান হবে দেশের পরিচালক। প্রধান চারটি স্তম্ভ কী সংবিধানের? ১) সব নাগরিকের সমান অধিকার, ২) সংসদীয় ব্যবস্থায় নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, ৩) ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে রক্ষা করা, ৪) আইনের শাসন হবে সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ।
২৬ জানুয়ারি সাধারণতন্ত্র দিবস, ভারত নামক এক প্রায় ৫ হাজার বছরের সভ্যতার বৃত্তকে যেন সম্পূর্ণ করল। প্রাচীন ভারত যে গণতন্ত্রকে আশ্চর্য উপায়ে গ্রহণ ও লালন পালন করতে শিখেছিল, ঠিক সেই ঐতিহ্যকেই আবার প্রতিষ্ঠিত করা হল দীর্ঘকালের পরাধীনতার পর। কী দিল সেই গণতন্ত্র? আইনের চোখে সব নাগরিক সমান। ধর্ম, জাতি, লিঙ্গ নির্বিশেষে কোনও বৈষম্য নয়। স্বাধীন মতপ্রদানের স্বাধীনতা। যে কোনো ধর্ম পালনের সমান অধিকার। প্রত্যেক নাগরিক যেন তাদের ব্যক্তিগত ধর্মবিশ্বাসকে কোনও ব্যক্তি অথবা রাষ্ট্রের বাধা না পেয়ে পালন ও প্রকাশ করতে পারে। ধর্ম হোক অথবা ভাষা, সংস্কৃতি হোক কিংবা সামাজিক আচার— ধর্মগতভাবে, ভাষাগতভাবে, সংস্কৃতিগতভাবে এবং সামাজিক রীতিগতভাবে সব ধরণের সংখ্যালঘু তাদের রীতি-নীতি পালন করতে পারবে। যে কোনো নাগরিকের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হলে সে বিচারবিভাগের দ্বারস্থ হওয়ার অধিকার পেয়েছে। সেই নালিশ ব্যক্তির বিরুদ্ধেই হোক অথবা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে।
গণতান্ত্রিক ভারতের শক্তি কী? ১৪৫ কোটি মানুষ। যাঁদের সিংহভাগের মধ্যেই অন্তর্নিহিত রয়েছে একটি করে নৈপুণ্য। গ্রামীণ হস্তশিল্প কিংবা আদিবাসীদের বাসভবন তার পরিচায়ক। রাষ্ট্রের দায়িত্ব ব্যক্তি ও সমষ্টিগত নাগরিকের সেই নৈপুণ্যগুলিকে চিহ্নিত করা এবং স্বীকৃতি দেওয়া। সরকারি স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ভাষার সংখ্যা ২২ হলেও প্রতিদিন অন্তত ৭৫০ ভাষা উচ্চারিত হয় ভারতের কোনো না কোনো প্রান্তে। এ এমন এক দেশ, যেখানে বিশ্বের প্রায় কমবেশি প্রতিটি প্রধান ধর্মাবলম্বী মানুষের বসবাস।
৭৬ বছর পর সাধারণতন্ত্র দিবস এবং গণতন্ত্রের তাৎপর্য সম্পর্কে ভারতবাসী হয়তো অবগত নয়। কিন্তু ১৪৫ কোটি নাগরিক এবং রাষ্ট্রকে সর্বদাই প্রশ্ন করতে হবে যে—ব্রিটিশ পুলিশের হাতে ধরা পড়ব না, এই অদম্য জেদের জন্য হাসতে হাসতে বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করার মতো মনের জোর সাধারণ তরুণ তরুণীদের মনে কীভাবে সঞ্চারিত হতে পারে? কোন লক্ষ্যের জন্য ফাঁসি নিয়ে কোনো উদ্বেগ ও আতঙ্ক গ্রাস করেনি গ্রামীণ কিশোরকে? বরং হাসিমুখে সেদিকেই এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে? হাসপাতালে চিকিৎসারত অবস্থায় নিজের কপালের গুলিবিদ্ধ ক্ষতের মধ্যে আঙুল ঢুকিয়ে,সেটিকে বিষাক্ত করে মৃত্যুর সঙ্গে করমর্দন করা কীভাবে সম্ভব? কলকাতার এক যুবকের মনের মধ্যে মধ্যরাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন, জার্মানি, জাপান, তাইওয়ানে দুঃসাহসিক এক অভিযানে যাওয়ার চিন্তা করার মহাজাগতিক শক্তি এসেছিল কোন লক্ষ্যপূরণে? কী তাঁর স্বার্থ যে একটি আস্ত সেনাবাহিনী গঠন করার মতো অবাস্তব ভাবনাকে বাস্তব করে দেখিয়েছিলেন? সেলুলার জেলে বিদ্যুতের শক নিতে নিতে মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাক, তবুও নতজানু হব না ব্রিটিশের কাছে, এই মনোভাব অর্জন করতে হলে ঠিক কতগুলি পুণ্যজন্ম পেরিয়ে আসতে হয়? কেন করেছিলেন তাঁরা এইসব আত্মবলিদান? লক্ষ্য কী ছিল? দুই শতাধিক বিপ্লবী ফাঁসির মঞ্চে উঠেছিলেন কেন? এই অন্তহীন প্রশ্ন ও সংশয়ের উত্তর হল, তাঁদের প্রত্যেকের লক্ষ্য ছিল, স্বাধীন, গণতান্ত্রিক, সার্বভৌম একটি ভারতবর্ষ গড়ে তোলার ভিত্তিভূমি তৈরি করা। যে স্বপ্নের বাস্তবায়ন শুরু হয়েছিল ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি।
অতএব সাধারণতন্ত্র দিবস ঋণস্বীকারের দিন, অনন্ত মৃত্যুহীন প্রাণের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার শপথগ্রহণের দিন। দেশ, কাল, সমাজ, মাতৃভূমি, মাতৃভাষার জন্য আমরা কী করছি? এই প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়ার দিন।
২৬ জানুয়ারি, গণতন্ত্রের অর্থ উপলব্ধির এক মাহেন্দ্রক্ষণ!
• গ্রাফিক্স : সোমনাথ পাল
• সহযোগিতায় : উজ্জ্বল দাস