সংবাদদাতা, বেলদা: শোলার পটে দেবী দুর্গার আরাধনা, জমিদার আমলের সিন্দুক থেকে বের করা তলোয়ার হাতে সপ্তমীর সকালে ঘট উত্তোলন, আর সূর্যের আলোয় প্রাচীন আতসকাচের সাহায্যে হোমের আগুন জ্বালানো—কেশিয়াড়ির দত্তবাড়ির দুর্গাপুজোয় আজও অটুট এমনই নানা প্রাচীন রীতি। একসময় ৩৬টি মৌজার জমিদারি, অঢেল সম্পত্তি আর রাজকীয় জৌলুসে মাসাধিককাল ধরে চলত উৎসব। আজ সেই আভিজাত্য ম্লান, অট্টালিকার অনেকটাই ভগ্নপ্রায়। তবু পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য ধরে রাখতে প্রতি বছর পুজোর আয়োজন করেন পরিবারের উত্তরসূরিরা।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, আড়াই থেকে তিনশো বছর আগে বর্ধমান থেকে কেশিয়াড়িতে আসেন সাধুচরণ দত্ত। তাঁর বংশধর হরনারায়ণ দত্ত মেদিনীপুরের সরকারি উকিল নিযুক্ত হওয়ার পর জমিদারির প্রসার ঘটে। একের পর এক মহল কিনে জমিদারির বিস্তার ঘটান তিনি। জোড়াশাল, মুজরা-সহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আসত বিপুল পরিমাণ ধান। ইংরেজরা তাঁকে ‘রাজা’ উপাধি দিতে চাইলেও গ্রহণ করেননি। পরে ‘চৌধুরী’ উপাধি পান। তাঁর আমলেই শুরু হয় দুর্গাপুজো।
দত্তবাড়ির পুজোর বিশেষত্ব, এখানে দেবীর মৃন্ময়ী প্রতিমা পুজো হয় না। কেশিয়াড়ির সর্বমঙ্গলা মন্দিরে দেবীর অধিষ্ঠান থাকায় পারিবারিক পুজোয় চলে শোলার পটের দুর্গার আরাধনা। একসময় হরিপদ মালাকার পট তৈরি করতেন। বর্তমানে তাঁর ছেলে শংকর মালাকার সেই প্রথা বজায় রেখেছেন।
মহালয়ার দিন বা তার পর থেকেই শুরু হয় প্রস্তুতি। ষষ্ঠীর দিন বেলতলায় বিল্ব অধিবাসের মাধ্যমে পুজোর সূচনা। সপ্তমীর সকালে নতুন পুকুরে ঘট উত্তোলনের সময় ব্রতীর হাতে থাকে জমিদার আমলের সিন্দুকে রাখা তলোয়ার। দেবীর আগমনে বাধা প্রতিহত করার বিশ্বাস থেকেই এই রীতি চলে আসছে। প্রতিদিন হোম হয়। সূর্যের আলোয় আতসকাচের সাহায্যে আগুন জ্বালানোর প্রথাও আজও অটুট। সন্ধিপুজোয় জ্বলে ১০৮টি প্রদীপ। অষ্টমীতে সর্বমঙ্গলা মন্দিরের পাশাপাশি সিঁদুরমুড়ি ও বাঁশুলির থানেও পুজো পাঠানো হয়। দেবীকে পরানো হয় জমিদারি আমলের সোনার গয়না।
একসময় রুপোর থালায় ভোগ দেওয়া হলেও এখন কাঁসার থালায় নিবেদন করা হয় প্রসাদ। আগে মাছের নানা পদ রান্না হলেও প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে সেই রীতি বন্ধ। বর্তমানে নিরামিষ ভোগের আয়োজন হয়। একসময় পুজো ঘিরে যাত্রা, সঙ্গীতানুষ্ঠান ও খাওয়াদাওয়ার আয়োজন চলত মাসাধিককাল। এখন দশমীতেই মূলত খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা হয়। খরচ প্রায় ৭০ হাজার টাকা।
পরিবারের উত্তরসূরি প্রসাদ দত্ত বলেন, ‘মনে হয় পুজো বন্ধ করে দিই। পারি না। এর মধ্যে একটা আলাদা আনন্দ আছে।’ কলকাতা, মেদিনীপুর, মধ্যপ্রদেশ, বিশাখাপত্তনম-সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ও বিদেশে থাকা আত্মীয়রা পুজোর সময় একত্রিত হন। তবে আর্থিক সংকট ও বাড়ির জীর্ণ দশা ঐতিহ্য রক্ষার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রসাদ দত্তের আবেদন, সরকারি সহযোগিতা মিললে এই প্রাচীন কৌলিক পুজোকে আগামী প্রজন্মের জন্য বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হবে।



