নলিন সরকার স্ট্রিটের পুজোয় ‘জললিপি’, ভাবনায় নদী দূষণ থেকে ভবিষ্যৎ সভ্যতা
  • ১৬ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

অর্ক দে, কলকাতা: জ্বালানি কাঠ দিয়ে জলের স্রোত ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মণ্ডপজুড়ে জ্বালানি কাঠের নকশায় যেন নদী প্রবাহমান। সেই সঙ্গে নানা আকৃতির মাটির শূন্য কলসি, নদীর পাড়ের কথা, দূষণের অভিশাপ, ভবিষ্যতের এআই নির্ভর মানব সভ্যতার দৃশ্যপট, সবকিছু মিলিয়ে এক অন্য পুজোভূমি নলিন সরকার স্ট্রিট। গত বছরের উদ্দীপনা, উন্মাদনা ভরা পুজোর ভাইরাল থিম সং থেকে বেরিয়ে এবছর উত্তর কলকাতার এই পুরনো পুজো কমিটির ‘জললিপি’ ভাবতে বাধ্য করবে। চমক অবশ্যই পাথরের প্রতিমার আদলে তৈরি দুর্গা। কালচে রঙের প্রতিমায় সভ্যতার শুরুর যুগের দেবী দর্শন। 

Advertisement

পশ্চিমবঙ্গ ও ভারত নদীমাতৃক দেশ। গঙ্গা, ভাগীরথী, পদ্মা, শতদ্রু, বিপাশা, মন্দাকিনী আরও কত বয়ে চলেছে। আশৈশব গঙ্গার কোলে বেড়ে ওঠা, জলোচ্ছ্বাস নদীর পাড়ের মানুষের হৃদয়ে-মস্তিষ্কে, শিরায়, উপশিরায়, ধমনীতে স্রোতস্বিনী। কিন্তু মানুষেরই একাংশের কর্মকাণ্ড সেই নদীকে কলুষিত করছে। কিন্তু তারপরও বয়ে চলেছে সে। যে পথ দিয়ে গিয়েছে তার আশেপাশে সভ্যতার ছবি এঁকে গিয়েছে। যেন জল দিয়ে আঁকা ছবি ‘জললিপি’। প্রকৃতিতে নদীর এই ভাঙাগড়ার খেলা বিসর্জন ও আবহনের মতন। তাই এ বছর নলিন সরকার স্ট্রিট সর্বজনীন দুর্গোৎসব সমিতির শারদোৎসবে রূপ ও অরূপের মধ্যে দিয়ে জললিপিকে উদযাপন এবং নিজেদের শুধরে নেওয়ার বার্তা ফুটে উঠেছে। পুজো উদ্যোক্তা সিদ্ধার্থ সান্যাল বলেন, পবিত্র নদীকে আমরা অবলীলাক্রমে নিজেদের সভ্যতা উন্নয়নের জন্য কলুষিত করে চলেছি। এর দায় আমাদেরই। নদীমাতৃক দেশ যেখানে, নদী-খাল-বিল যদি সংস্কার করা হয়, তাহলে খরা ও বন্যা অধিকাংশ রুখে দেওয়া যেত। আজ সভ্যতা ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। নদী যেমন স্রোতস্বিনী, তেমনি আবহমান কাল ধরে মা দুর্গাও পূজিত। সেই দু’টির মেলবন্ধনেই আমাদের এবারের ‘জললিপি’।
ভাবনা বিস্তারের দায়িত্বে শিল্পী সনাতন দিন্দা। তিনি বলেন, সভ্যতার প্রথম যুগে যেমন পাথর কেটে মূর্তি তৈরি করা হত, সেই সময়টাকে ধরার চেষ্টা করেছি। সময় যেমন প্রবাহমান, তেমনি গঙ্গা স্রোতস্বিনী, প্রবাহমান। দেবী দুর্গাও আবহমানকাল ধরে পূজিত হচ্ছেন। দেবীর দু’পাশে চণ্ডমুণ্ড দণ্ডায়মান। মা অস্ত্রে সজ্জিত, ত্রিশূল হাতে। সেই সভ্যতার প্রথম যুগের সময়কে মাথায় রেখেই দেবীর অঙ্গরাগ করেছি। ভাবনা ব্যাখ্যায় সনাতন বলেন, মণ্ডপজুড়ে নদীর স্রোত, ফাটা মাটি, প্রচুর ফাঁকা হাঁড়ি পড়ে রয়েছে। নদীর থেকে আমরা অনেক কিছু পেয়েছি নদী সভ্যতাকে তৈরি হতে সাহায্য করেছে তেমনি সেই নদীকে আবার আমরা কলুষিত করছি। গঙ্গাকে পুজো করা হয়। আবার গঙ্গাকেই আমরা নোংরা করছি। সেই সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই আমার লেখা এবং সুর দেওয়া একটা গান বাজবে। একটু স্যাটায়ারভাবে সেই গানকে তুলে ধরা হয়েছে। 
মণ্ডপে রয়েছে এআইয়ের চমক। সনাতন বলেন, বিশেষজ্ঞরা বলছেন যা পরিস্থিতি তাতে আগামী দিনে গঙ্গার জল এতটাই দূষিত হয়ে যাবে যে, ক্যানসার হতে পারে। তাতে মহিলাদের জরায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অর্থাৎ জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়বে। সেটাকে বোঝানোর জন্য শূন্য হাঁড়ি প্রতীক হিসাবে দেখানো হয়েছে। সভ্যতা ধ্বংসের মুখে। সেখানে দেবতার পুজো কে করবে, সেই সময়কে দেখানোর জন্য এআইয়ের সাহায্য নেওয়া হয়েছে। এআই ঘণ্টা বাজাচ্ছে, আরতি করছে, অথচ প্রদীপে আলো নেই। পুরোটাই যান্ত্রিক, মানুষ নেই।