কলহার মুখোপাধ্যায়: ষষ্ঠীর সন্ধ্যা। কলকাতার আকাশ আলোর বন্যায় ভেসে যাচ্ছে। মণ্ডপে মানুষের ঢল। নতুন জামায় সেজে শিশুরা বাবা-মায়ের হাত ধরে এগিয়ে চলেছে। চোখে ঠাকুর দেখার বিস্ময়। ঢাকের শব্দে বাতাস কাঁপছে। এ সময় মনে হয়, পৃথিবীতে দুঃখ বলে যেন কিছু নেই।
ঠিক তখন, কোনো আলোকোজ্জ্বল মণ্ডপের বাইরে দাঁড়িয়ে ১০ বছরের রুপু পাইক। তার হাতে সুতোয় বাঁধা লাল, হলুদ, নীল বেলুনের গোছা। অন্য হাতে বেলুনের ক’টা প্যাকেট। ঘামে জামা ভেজা। পায়ের চটি ছিঁড়বে ছিঁড়বে করছে। একটু আগেই জিনস আর টি শার্ট পরা একটা বাচ্চা তার কাছ থেকে বেলুন কিনল। বেলুন নিয়ে ছুটে গেল মায়ের কাছে। রুপু কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর আবার হাঁক দিল ‘বেলুন নেবেন? বেলুন।’
রুপুরও নতুন জামা পরতে নিশ্চয় ইচ্ছে করে। নিশ্চয় ইচ্ছে করে মা-বাবার হাত ধরে ঠাকুর দেখতে। তবে ওর বাবা অসুস্থ। মা পরিচারিকার কাজ করেন। ওদের খুব একটা পয়সাকড়ি নেই। পুজোর দিন বেলুন বিক্রি করলে দুটো টাকা আসে। মায়ের সংসার চালাতে একটু সুবিধা হয়। তাই রুপুর পুজো শুরু হয় ভোরে, শেষ হয় মাঝরাতে। ঠাকুর দেখা হয় না কখনোই।
প্যান্ডেলের ভিতরে দুর্গার মুখে অপার মমতা। জিনস পরা বাচ্চাটার মুখে অকৃত্রিম আনন্দ। আর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা রুপুর মুখে অসীম ক্লান্তি।
একই শহরে, একই সময়ে, পাশাপাশি দাঁড়িয়ে দু’টি পৃথিবী। একটিতে শৈশব উৎসব উদযাপন করে। অন্যটিতে শৈশব সংসারের বোঝা বহন করে।
পুজোর ভিড়ে এমন কত শিশুই বেলুন, খেলনা, ফুল, আইসক্রিম বিক্রি করে। তাদের রোজই দেখা যায়। শুধু তাদের গল্প শোনার সময় থাকে না।
রতন মণ্ডলের বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। ডেকরেটার্সের কাজ করেন। পুজোর আগে বাড়ি ফেরার সময় নেই। প্যান্ডেলে বাঁশ বয়ে নিয়ে যেতে হয়, কাঠামো বাঁধতে, কাপড় টাঙাতে, আলো লাগাতে হয়। নাওয়া খাওয়ার সময় নেই। চতুর্থীর রাতে বাড়ি থেকে ফোন এল আট বছরের কন্যা মিতুর। ‘বাবা, তুমি কবে আসবে? আমার নতুন জামা দেবে না?’ রতন কিছুক্ষণ চুপ, তারপর বলে, ‘পুজোর কাজ শেষ হোক মা, তারপর আসব। কিনে দেব জামা।’ মিতু বোঝে না বাবা পুজোয় ব্যস্ত থাকে। মণ্ডপে সৌন্দর্য ফুটলে তবেই রতনের মজুরি হয়। মণ্ডপের সামনে দাঁড়িয়ে দর্শনার্থীরা বলেন, ‘থিমের কাজটা অসাধারণ।’ কেউ জানতে চায় না, যে রতনরা রাত জেগে প্যান্ডেলের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলেন তাঁরা প্রাপ্য মজুরি সময়মতো পেলেন কি? ওঁদের ছেলে-মেয়েরা নতুন জামা পেয়েছে কি?
আমরা শিল্পকে সম্মান করি, কিন্তু সাধারণত শিল্পের নেপথ্যে থাকা আম শ্রমিকের কথা যাই ভুলে। রতনের মতো মানুষের পরিশ্রম না থাকলে চোখ ধাঁধানো উৎসবের অনেকটাই থেকে যেত অন্ধকারে।
নিতাই দাস। বীরভূমের অজ পাড়াগাঁর গ্রামের ঢাকি। পুজোয় কলকাতায় আসেন কাঁধে ঢাক, ব্যাগে জামাকাপড় আর মুড়ি-গুড় নিয়ে। পুজোর ক’টা দিনের রোজগারেই কয়েক মাস সংসারের খরচ চালাতে হয় তাঁকে। পঞ্চমীর রাত থেকে কাজ শুরু। ভোর থেকেই টানা বাজিয়ে যেতে হয়। তাঁর ছেলের বয়স সাড়ে চার বছর। সে বাবাকে ছাড়াই যায় ঠাকুর দেখতে। কোনোবারই পুজোয় নতুন জামা হয় না তার। পুজোর পর বাবা টাকা আনে। তারপর বাড়ি ফিরে নতুন জামা কিনে দেয়। বিসর্জনের ঢাকে করুণ তাল বাজায় নিতাই। বাজনা শুনে সবার চোখে জল আসে। নিতাইদের মনখারাপ থেকে যায় আড়ালে।
ঢাকিরা শুধু বাদ্যযন্ত্র বাজান না। তাঁরা উৎসবের আনন্দ জাগিয়ে তোলেন। কিন্তু তাঁদের জীবন ঘিরে জীবিকার অনিশ্চয়তা, অপ্রতুল পারিশ্রমিক, পরিবারের কাছ থেকে দূরে থাকার বেদনা। সে বেদনার কথা কি কখনো কারও জানতে ইচ্ছে হয়?
গণেশ মণ্ডল ঠেলাগাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। তার বাক্সে ভ্যানিলা, চকোলেট, অরেঞ্জ, বাটার স্কচ আইসক্রিম। ছোট্ট একটা মেয়ে বাবার কাছে বায়না করে। বাবা হেসে আইসক্রিম কিনে দেন। গণেশের ঠিক এই বয়সের একটি মেয়ে আছে। তার নাম পিউ। পিউ আইসক্রিম খেতে খুব ভালোবাসে। গণেশ সবসময় কিনে দিতে পারেন না। পুজোয় তিনি সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রাস্তায়। রাতে পিউ ফোন করে। ‘বাবা তুমি আইসক্রিম আনবে?’ গণেশ বলে, ‘আজ ঠিক নিয়ে আসব মা।’
এই দৃশ্যের মধ্যে কোনো নাটকীয়তা নেই। এটা দারিদ্রের স্বাভাবিক নির্মমতা। যে মানুষটি অন্যের শিশুর হাতে খুশি তুলে দিচ্ছেন, তাঁর নিজের সন্তানের আনন্দটুকুও নিশ্চিত করতে নিরন্তর হিসাব কষতে হয় তাঁকে।
নবমীর রাতে মানুষের ঢল। পুলিশকর্মী অরূপ চক্রবর্তী বারবার মাইকে বলছেন, ‘লাইন মেনে চলুন।’ সকাল থেকেই তিনি রাস্তায় ডিউটিতে। শরীর ক্লান্ত। অরূপের দশ বছরের ছেলে বাড়িতে বাবার জন্য অপেক্ষা করছে। যদিও জানে বাবা ডিউটি করছে। তবু সে বাবাকে মিস করে। স্কুলে বন্ধুরা ঠাকুর দেখবে মা-বাবার সঙ্গে। তারও ইচ্ছে ছিল বাবার সঙ্গে ঘুরতে যাওয়ার। রাত বাড়লে অরূপের ফোনে ছেলের একটি ছবি আসে। নতুন জামা পরে দাঁড়িয়ে। ছবির নীচে লেখা, ‘বাবা প্লিজ কাম। ওয়েট করছি।’
মধুমিতা সংবাদমাধ্যমে কাজ করেন। পুজোয় মণ্ডপে ঘুরে খবর সংগ্রহ করেন। অষ্টমীর সকালে তাঁর বাবা ফোন করেন, ‘অঞ্জলি দিবি না?’ মধুমিতা বলেন, ‘চেষ্টা করছি বাবা।’ কিন্তু জানেন, ‘চেষ্টা সফল হবে না।
মধুমিতা অন্যের আনন্দের মুহূর্ত খবরের ভাষায় ধরে রাখেন। কিন্তু বাবার সঙ্গে অঞ্জলি দেওয়া হয় না। বন্ধুদের সঙ্গে বেরনোর পরিকল্পনা বারবার বাতিল করতে হয়। মধুমিতাদের শ্রমের ফলেই বহু মানুষ ঘরে বসে উৎসবের খবর জানতে পারেন। কিন্তু মধুমিতাদেরও ব্যক্তিগত জীবনের প্রয়োজন আছে। এই সহজ সত্যটুকু মনে রাখা জরুরি। তাঁদের প্রতি সংবেদনশীল থাকাটাও সমাজের দায়িত্ব।
রাতভর ঠাকুর দেখে মানুষ যখন বাড়ি ফিরছে, রাস্তার ধারে পড়ে কাগজের থালা, প্লাস্টিকের গ্লাস, খাবারের প্যাকেট, জলের বোতল। ভোর হতে না হতেই শ্যামলী দাস কাজে নেমেছেন। তিনি শহর পরিচ্ছন্নতার কাজে যুক্ত। তাঁর হাতে ঝাড়ু, আবর্জনা সংগ্রহের সরঞ্জাম। ঠাকুর দেখে সবাই হয়তো
তখন ঘুমোচ্ছে। শ্যামলী তখন রাস্তার আবর্জনা সরাচ্ছেন, যাতে সকালে আবার মানুষ নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে।
সবাই যে শহরকে পুজোর সময় সুন্দর দেখতে চাই, সেই শহর সুন্দর রাখার দায়িত্ব যাঁদের কাঁধে, তাঁদের কাজকেও সম্মানজনক চোখে দেখার অভ্যাস রাখতে হবে। ন্যায্য পারিশ্রমিক, উপযুক্ত পরিবেশ দেওয়াটাও সমাজের দায়িত্ব। শহরের সৌন্দর্য কেবল আলোকসজ্জায় নয়। একটি শহরের প্রকৃত সৌন্দর্য পাশের মানুষটিকে মর্যাদা দেওয়ার মধ্যেও।
রুপু, রতন, নিতাই, গণেশ, অরূপ, মধুমিতা, সুশান্ত কিংবা শ্যামলী, তাঁদের অভিজ্ঞতার ভিতরেই লুকিয়ে আমাদের পরিচিত সমাজের বাস্তবতা।
উৎসবের আসল পরীক্ষা কোথায়?
রাস্তার শিশুদের কাছ থেকে জিনিস কেনার সময় শিশুশ্রমকে উৎসাহ না দিয়ে তাদের শিক্ষা ও নিরাপত্তার প্রশ্নটিকে গুরুত্ব দিতে পারি। ডেকরেটার্সের শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ, যথাযথ সুরক্ষা এবং সময়মতো মজুরির দাবি তুলতে পারি। ঢাকি, খাবারের দোকানের কর্মী, আইসক্রিম বিক্রেতা কিংবা অস্থায়ী শ্রমিকদের সঙ্গে মজুরি বৃদ্ধির ইস্যু তুলতে পারি। পুলিশ, দমকল, হাসপাতালের কর্মী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের দায়িত্বকে স্বাভাবিক ধরে না নিয়ে তাঁদের কাজের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে পারি। এগুলিই মানুষের প্রাপ্য সম্মান। আমরা যখন মণ্ডপে গিয়ে দেবীর সামনে দাঁড়াই, তখন হয়তো প্রার্থনা করি—পরিবার ভালো থাকুক, অসুখ দূর হোক, জীবনে সুখ আসুক। সেই প্রার্থনার মধ্যে যদি পাশের মানুষটির কষ্টের জন্য একটুও জায়গা না থাকে, তবে আমাদের ভক্তির অর্থ কোথাও অসম্পূর্ণ থেকে যায়। দুর্গাপুজো আমাদের মিলনের উৎসব। সেই মিলন শুধু পরিচিত মানুষের সঙ্গে নয়, আমাদের চারপাশের অচেনা শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গেও হওয়া উচিত। তাঁদের কাজের মর্যাদা দিতে তো পারি। তাঁদের সব সমস্যার সমাধান করতে না পারি, তাঁদের সমস্যাগুলি অদৃশ্য করে না রাখার চেষ্টা তো করতে পারি।
শেষ রাতে যখন ঢাক থেমে যাবে, আলো নিভে আসবে, মণ্ডপ খুলে ফেলা হবে, তখন রুপু হয়তো বেলুনের অবিক্রীত গোছা নিয়ে বাড়ি ফিরবে। রতন পরের কাজের খোঁজ করবেন। নিতাই ঢাক গুছিয়ে গ্রামের ফেরার পথ ধরবেন। গণেশ হিসাব করবেন, কত টাকা হাতে থাকল। অরূপ হয়তো ডিউটি শেষে ছেলের ঘুমন্ত মুখ দেখবেন। মধুমিতা শেষ প্রতিবেদন পাঠিয়ে ক্লান্ত চোখে ঘড়ির দিকে তাকাবেন। শ্যামলী আবার পরদিন ভোরে রাস্তায় নামবেন।
তাই আগামী পুজোয় মণ্ডপের আলো দেখে মুগ্ধ হওয়ার পাশাপাশি একবার তাকানো যাক সেই মানুষগুলির দিকে, যাঁদের শ্রমে আলো জ্বলে। ঢাকের তালে মেতে ওঠার পাশাপাশি মনে রাখা যাক সেই ঢাকির কথা, যিনি হয়তো নিজের সন্তানের পাশে থাকতে পারেননি। শিশুর হাতে বেলুন দেখে হাসার পাশাপাশি ভাবা যাক, সেই বেলুনওয়ালা শিশুটির হাতে বই তুলে দেওয়ার মতো সমাজ আমরা গড়তে পেরেছি কি না।
মা দুর্গার কাছে সবচেয়ে বড়ো প্রার্থনা হয়তো এটাই—কেউ যেন শুধু অভাবের কারণে উৎসবের বাইরে দাঁড়িয়ে না থাকে। পুজো তখনই সত্যিকারের সবার হবে, যখন আনন্দের অধিকার কেবল আমাদের থাকবে না, সেই আনন্দ তৈরি করতে যাঁরা নিজেদের সময়, শ্রম আর ব্যক্তিগত সুখের অনেকটা বিসর্জন দেন, তাঁদের জীবনেও একটু আনন্দ, একটু স্বস্তি, একটু নিশ্চিন্তির আলো পৌঁছাবে।



