


সমৃদ্ধ দত্ত: গ্রে রঙের চেক স্ট্রাইপড লং কোট। ভিতরে একটা কালো রাউন্ড নেক টি শার্ট। কোঁকড়ানো চুল। মুখে দাড়ি। ১৯৮১। ২৭ জুন। ইরান বনাম ইরাক যুদ্ধের মধ্যেই আবুজার মসজিদে ইরানের প্রেসিডেন্ট আলি খামেনেই যখন ভাষণ দিচ্ছেন, তখন ওই যুবক এসে একটি টেপ রেকর্ডার রাখল পোডিয়ামে। খামেনেইয়ের সামনে। সবেমাত্র প্রার্থনা সমাপ্ত হয়েছে। ভাষণ শুরু করেছেন খামেনেই। যুবক টেপ রেকর্ডারের প্লে বাটন টিপে একটু পিছনে সরে গেল। দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়াল ভিড়ের মধ্যে। সাংবাদিক? নাকি খামেনেই অথবা ইরানের সর্বোচ্চ নেতা রুতোল্লা আয়াতোল্লা খোমেইনির কোনো অনুগামী? কেউ মাথা ঘামায়নি। শাহতন্ত্র খতম হয়ে যাওয়ার পর যুব প্রজন্ম বেশ খুশি। তাই তাদের যাতায়াত নতুন কিছু নয়। হঠাৎ টেপ রেকর্ডার থেকে শোঁ শোঁ করে শব্দ হতে শুরু করল। খামেনেই সেই শব্দ শুনে ভ্রু কুঁচকে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন। এদিক ওদিক তাকালেন। তারপর মাইক্রোফোন থেকে সামান্য সরে গেলেন। আর তৎক্ষণাৎ বিস্ফোরণ। টেপ রেকর্ডার ভেঙে চৌচির। ছিটকে পড়েছেন খামেইনি। অচেতন। ডান হাত থেকে রক্ত বেরচ্ছে। দু’মাস হাসপাতালে চিকিৎসার পর খামেইনি সুস্থ হয়ে বেরলেন। কিন্তু তাঁর ডান হাত চিরতরে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে গেল। ফুসফুস ও স্বরযন্ত্র আর স্বাভাবিক হয়নি। খামেনেই বাঁ হাতে লেখার অভ্যাস শুরু করলেন। আর ডান হাত সর্বদাই রাখতেন আলখাল্লার আড়ালে। খামেনেইকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ডান হাত ছাড়া তো স্বাভাবিক জীবনযাপন অসম্ভব। খামেনেই বললেন, আমার কন্ঠ এবং মন যতক্ষণ সক্রিয় আছে, সেটাই আমার শক্তি। আমার হাতের দরকার নেই। সেই ছিন্নবিচ্ছিন্ন টেপ রেকর্ডারের একটি অংশ থেকে পাওয়া গেল ফাইবারে আটকে থাকা কাগজের টুকরো। যা এমনভাবে মুড়ে রাখা হয়েছে যে, পুড়ে যায়নি বিস্ফোরণেও। সেই কাগজে লেখা ছিল, ইসলামিক রিপাবলিককে ফুরকন গ্রুপের উপহার।
কারা এই ফুরকন গ্রুপ? যারা ছিল বামপন্থী ইসলামিক শক্তি। শাহ রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে এক গণবিপ্লবের মাধ্যমে আয়াতোল্লা খোমেইনি ইরানে ১৯৭৯ সালে পত্তন করেছিলেন ইসলামিক রিপাবলিক সরকারের শাসন। শাহতন্ত্রের বিরুদ্ধাচারণ করার অপরাধে আয়াতোল্লা খোমেইনিকে ইরান থেকে পালাতে বাধ্য করা হয়। প্রথম তুরস্ক, তারপর ইরাক এবং শেষে প্যারিসের এক গ্রামে বসবাস করতেন খোমেইনি। সেই গ্রামের একটি আপেল গাছের নীচে বসে টেপ রেকর্ডারে ক্যাসেট ভরে উত্তেজক বক্তৃতা রেকর্ড করতেন। তাঁর একান্ত অনুগামী এক ভক্তের নাম ছিল আলি খামেনেই। আয়াতোল্লা খোমেইনির তাবৎ বক্তৃতার ক্যাসেট ওই আলি খামেনেই ইরানের গ্রামেগঞ্জে এবং শহরের গোপন সভা-সমাবেশে পৌঁছে দিতেন। তাঁদের লক্ষ্য কী ছিল? ইরানে শ্বেত বিপ্লবের কারিগর শাহ রাজতন্ত্রের শাসনকে খতম করা। কারণ ধর্মীয় গোঁড়ামি থেকে মুক্ত করে ইরানকে আধুনিক সভ্যতায় পর্যবসিত করার ব্রত নিয়েছিলেন মহম্মদ রেজা পাহল্লাবি শাহ। সেই কাজে সহায়তা পাচ্ছিলেন আমেরিকারও। ১৯৫৩ সালে ইরানের প্রধানমন্ত্রী মোসাদেগ অ্যাংলো পার্সিয়ান অয়েল কোম্পানির জাতীয়করণ করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু তাহলে তো আমেরিকার তেল বাণিজ্যের জন্য বিরাট বিপদ। অতএব মার্কিন ও ব্রিটিশ গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ এবং এমআই-৬ যৌথ অপারেশন চালিয়ে ওই প্রধানমন্ত্রীকে সরিয়ে দেয়। মহম্মদ রেজা পাহলভির রাজতন্ত্র শুরু করতে সাহায্য করে তারা। ইরানকে আধুনিক করে তুলতে ১৯৬৩ সাল থেকে এক বিপ্লব শুরু করেন শাহ। সবার আগে তাঁর দিক থেকে আঘাত এসেছিল মৌলবিবাদের বিরুদ্ধে। সেই থেকে বিরোধিতার সূত্রপাত। ইসলামিক ইরান স্থাপনের পরিকল্পনা করছিলেন খোমেইনি। কিন্তু তিনি জানতেন শাহের পিছনে আছে আমেরিকার আশীর্বাদ। অতএব শাহকে ক্ষমতাচ্যুত করার অর্থ মার্কিন পুতুলকে সরিয়ে দেওয়া। এটা আমেরিকা হতে দেবে কেন? অতএব খোমেইনি নিয়েছিলেন এক বিস্ময়কর দ্বিমুখী প্ল্যান। প্রকাশ্যে তিনি শাহ রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন ও বিপ্লবের ডাক দিতেন এবং গোপনে জন এফ কেনেডি থেকে নিক্সন অথবা কার্টার—প্রত্যেক আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে গোপন বার্তা দিতেন যে, আমরা কিন্তু আমেরিকার বিরুদ্ধে নয়। আমরা ক্ষমতাসীন হলে আমেরিকার পক্ষে থাকব। প্যারিস থেকে লাগাতার বিপ্লবে ইন্ধন জোগাচ্ছেন খোমেইনি। আর ইরানে বসে তাঁর সেই সব বার্তা দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে দিতেন তাঁর প্রিয়তম অনুগামী খামেইনি। ইরানের সিক্রেট পুলিশ একাধিকবার গ্রেপ্তারও করে তাঁকে।
অবশেষে ১৯৭৯ সালে গণ অভ্যুত্থানের জেরে শাহ রাজতন্ত্রের সমাপ্তি ঘটল। প্যারিস থেকে এসে ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের শাসক হলেন খোমেইনি। এবং এসেই নিজের প্রিয়পাত্র আলি খামেইনির দ্রুত উত্থান ঘটালেন। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডের কমান্ডার। তারপর এক ধাক্কায় ১৯৮১ সালে ইরানের প্রেসিডেন্ট। আলি খামেইনিকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ১৯৮৯ সালে আয়াতোল্লা খোমেইনির দীর্ঘ অসুস্থতার জেরে মৃত্যুর পর কারও সন্দেহ ছিল না যে, খামেইনি হবেন ইরানের সুপ্রিম লিডার। ১৯৮৯ সালে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তার সমাপ্তি হল ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে।
আমেরিকার হাতে ঠিক তাঁরাই নিহত হয়েছেন, যাঁরা পেট্রল বাণিজ্য ডলারের পরিবর্তে অন্য মুদ্রায় করতে চেয়েছেন। ২০০০ সালে ইরাকের শাসক সাদ্দাম হোসেন রাষ্ট্রসঙ্ঘের অয়েল ফর ফুড কর্মসূচিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ডলারের পরিবর্তে তিনি তেল বাণিজ্য করবেন ইউরোতে। তাহলে ডলারের গুরুত্ব ও মূল্য বিপুলভাবে কমে যাবে। আমেরিকা মানবে কেন? তাই ঠিক এক বছরের মধ্যে, ২০০৩ সালে আমেরিকা ইরাকে আক্রমণ করল। সাদ্দাম হোসেন নিহত।
লিবিয়ার মুয়াম্মার গদ্দাফি চেয়েছিলেন ডলার বা ফ্রাঁ নয়, তেল কেনাবেচার মাধ্যম হবে আফ্রিকার দিনার। আমেরিকা দেখল মহাবিপদ। বিশ্বজুড়ে ডলারের মূল্য কমবে। অতএব ২০১১ সালে অবসান হল গদ্দাফির শাসন ও জীবনের।
এই তো সেদিন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে ঘরে ঢুকে বন্দি করে আনা হল। কেন? অনেক কারণের অন্যতম, তিনি চীনের ইউয়ান ও অন্য দেশের মুদ্রায় তেল বিক্রি শুরু করেছিলেন। এখন তিনি আমেরিকার জেলে।
ইরানের শাসক খামেইনি বহুদিন ধরেই ইউরো ও ইউয়ানের মাধ্যমে তেল ক্রয়-বিক্রয়ের পক্ষে। অর্থাৎ ডলারকে মূল্যহীন কর। রাশিয়া এবং চীনকে আমেরিকা পছন্দ করে না। কারণ, তারা লোকাল কারেন্সিতে তেল কেনাবেচা করে। ২০২২ সালের পর থেকে রাশিয়াকে তেলের পেমেন্ট দিতে হয় রুবলে। ইরানের বিরুদ্ধে ছিল একঝাঁক অভিযোগ। খামেইনি এক স্বৈরতন্ত্রের শাসন কায়েম করেছিলেন। সুতরাং তাঁর বিরুদ্ধে বিপুল ক্ষোভ ছিলই দেশে। সেই সুযোগ নিয়েছে আমেরিকা।
আমেরিকার অপারেশন কীভাবে হল?
জানুয়ারির মাঝামাঝি। ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রতিরক্ষা বিভাগ পেন্টাগনকে প্রশ্ন করলেন, আমরা কবে নাগাদ স্ট্রাইক করতে পারি ইরানে? পেন্টাগন জানাল, এই মুহূর্তে পশ্চিম এশিয়ায় এয়ারক্র্যাফট ক্যারিয়ার নেই। ফাইটার জেটের স্কোয়াড্রনগুলি ইউরোপ আর আমেরিকায় মোতায়েন করা আছে। পশ্চিম এশিয়ায় ৪০ হাজার মতো মার্কিন সেনা রয়েছে। কিন্তু পর্যাপ্ত এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম নেই। ইজরায়েলও তখন তৈরি নয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে মার-এ-লাগো বৈঠকে ট্রাম্পকে ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বলেছিলেন, আর একটু সময় লাগবে। মিসাইল ইন্টারসেপটর ও এয়ার ডিফেন্স ব্যাটারি ইজরায়েলের প্রতি প্রান্তে বসাতে হবে। সময় চাই।
১৪ জানুয়ারি। নেতানিয়াহু ফোন করলেন ট্রাম্পকে। বললেন, এক মাস মতো পিছিয়ে দিন অভিযান। ততদিনে আমাদের প্রস্তুতি সম্পন্ন হবে। ইরানের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা মধ্যস্থতা করছেন স্টিভ হুইটকফ। তাঁকে বলা হল, কথাবার্তা চালিয়ে যাও। আমাদের সময় লাগবে একটু। তার মধ্যে ভালো কিছু মীমাংসা সূত্র পাওয়া গেলে ভালো। ২৫ জানুয়ারি ইজরায়েল ডিফেন্স ফোর্সের চিফ অফ স্টাফ ইয়াল জামির বৈঠক করলেন আমেরিকার সেন্ট্রাল কমান্ডের অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের সঙ্গে।
ঠিক তার পরেই দুটো এয়ারক্র্যাফট ক্যারিয়ার আর ১২টি যুদ্ধজাহাজ অগ্রসর হল পশ্চিম এশিয়ার দিকে। চার দিনের মধ্যেই পেন্টাগন পাঠাল ফইটার জেট, বম্বারস, রিফুয়েল ট্যাঙ্কার এবং এয়ার ডিফেন্স ব্যাটারি। ইরানের পরমাণু প্রস্তুতি কি সত্যিই আছে? তারা কি ওই পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধ করতে রাজি হবে? শেষবার এই আলোচনা করা হবে। ইরানের সঙ্গে দুই আলোচকের একজন তো হুইটকফ। অন্যজন কে? তিনি হলেন স্বয়ং ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাই, জেয়ার্ড কুশনার।
১৮ ফেব্রুয়ারি। ওয়াশিংটনে খুব গরম পড়েছে। হঠাৎ এই গরম কেন? এই আলোচনায় জল্পনা শহরজুড়ে। আর তারই মধ্যে হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে চার জনকে ডাকলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিদেশ সচিব মার্ক রুবিও, ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভান্স, সিআইএ ডিরেক্টর জন র্যাটক্লিফ এবং হোয়াইট হাউসের চিফ অফ স্টাফ সুসি উইলিস। ‘আমরা কি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডের মধ্যে বিদ্রোহ হওয়ার এক প্ল্যান করতে পারি? নাকি সরাসরি টার্গেটেড অ্যাটাক?’ প্রশ্ন উঠল বৈঠকে। ২৩ থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি লাগাতার ইরানকে শেষ সুযোগ দেওয়া হল। পরমাণু বিস্তার প্রকল্প বন্ধ করতে হবে। কিন্তু ইরান অস্বীকার করছে। তারা বলছে, এরকম কোনো প্রিপারেশন নেই তাদের। আমেরিকা মনে করে, সম্পূর্ণ মিথ্যা বলছে ইরান। অতএব আর উপায় নেই!
সিআইএ জানতে পারল, কেন্দ্রীয় তেহরানে তাঁর যে আবাসস্থল, সেখানেই শুক্রবার ২৭ ফেব্রুয়ারি থাকবেন খামেনেই। তাঁকে বলা হয়েছে আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যেতে। কিন্তু খামেনেই বলেন, আমি পালালে আজীবন কলঙ্ক নিয়ে থাকতে হবে। তাই শহিদ হব। মেয়ে, জামাই ছিলেন তাঁর সঙ্গেই।
সিআইএ এই ইনপুট দিল ইজরায়েলের স্পাই এজেন্সি মোসাদকে। মোসাদ পালটা জানাল, হ্যাঁ। আমরা আরও জানতে পেরেছি, শনিবার সকালে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের বৈঠক হবে ওই বাড়িতেই। ওই বৈঠক যখন ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়েছে, ঠিক তখনই মিসাইল এসে পড়ল সেখানে। অপারেশন ইরান শুরু! খামেনেই খতম! খোমেইনি থেকে খামেইনি, এক দীর্ঘ অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি!
সমাপ্তি? নাকি এবার অন্য এক তৃতীয় অধ্যায়ের সূচনা?