মেওয়ালালকে ভুলেই গেল ভারতীয় ফুটবল!
  • ১৮ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

শিবাজী চক্রবর্তী, কলকাতা: হেস্টিংস বেকারি রোডের কোল ঘেঁষে সরু রাস্তা। গলি বলাই শ্রেয়। খোলা নর্দমা, নাইলনের দড়িতে আধশুকনো জামাকাপড়। আদুর গায়ে কাচ্চাবাচ্চার হইহল্লা পাশ কাটিয়ে কয়েক পা এগতেই চোখে পড়বে বাড়িটা। কলকাতা পুরসভার খাতায় পোশাকি ঠিকানা আছে বটে। ৮/১৯ শাহ রজব রোড। ছোট্ট দরজায় চাপ পড়লে মচমচ শব্দ ওঠে। চিলতে ঘরে বহুদিনের ভাড়াটিয়া। আধো অন্ধকার সিঁড়ি ধাপে ধাপে চলে গিয়েছে উপরে। সেখানে দাঁড়িয়ে কিংবদন্তি মেওয়ালালের ছেলে কিষেনলাল করুণ হেসে বললেন, ‘ওয়েলকাম টু ফুটবল ভবন।’ লোহার গ্রিলে গোল নকশায় ফুটবলের চিহ্ন। তাতে বহুদিনের জং। শেষ বিকেলের মৃদু হাওয়ায় ভেসে আসে ঢাকের শব্দ। প্যান্ডেলে পুজোর গান বাজছে। আলো, রোশনাই, বৈভবের ফোয়ারা। ফুটবল ভবন সেসব থেকে বহুদূরে। কিষেনলাল বোধ হয় সম্ভাব্য সব প্রশ্ন আঁচ করে তৈরিই ছিলেন। জানলার পাশে দাঁড়িয়ে উদাস গলায় বলে উঠেলেন, ‘কেউ কথা রাখেনি। বাবাকে কেউ মনে রাখেনি। শিউ মেওয়ালালকে ভুলে গিয়েছে সবাই।’ কিষেনলালের গলায় দলা পাকানো কান্না। সত্যিই তো! ভারতীয় ফুটবলের পীঠস্থান যেন ব্রাত্যজনের রুদ্ধসঙ্গীত। প্রতিটা ইঁট, কাঠ, পাথর, কড়িবরগা যেন অপ্রাপ্তি, বঞ্চনার প্রতিমূর্তি।

Advertisement

খেলোয়াড়ি জীবনে এক হাজারের উপর গোল। গোটা চল্লিশ হ্যাটট্রিক। শুধু এই শুকনো পরিসংখ্যানে মেওয়ালালকে মাপতে যাওয়া বৃথা। চার ও পাঁচের দশকে তিনিই ভারতের অন্যতম সেরা সেন্টার ফরোয়ার্ড। রাজধানীতে আয়োজিত ১৯৫১ সালের এশিয়ান গেমস ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন  ভারত। ফাইনালে ইরানের বিরুদ্ধে একমাত্র গোলটি করেছিলেন হেস্টিংসের মেওয়ালালই। প্রথমার্ধে ম্যাচের ফল ছিল গোলশূন্য। বিরতিতে ড্রেসিং-রুমে এসে মেওয়ার কাছে গোলের আবদার করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু। কথা রেখেছিলেন গোলমেশিন মেওয়ালাল। দেশকে ফুটবলে এশিয়ার সেরা করেছিলেন তিনি। তবে ভাবতেও পারেননি, জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিনেই করুণতম ট্র্যাজেডি অপেক্ষা করছে তাঁর জন্য। সেদিনই স্মল পক্সে মারা যান মেওয়ার বড়ো মেয়ে। দুঃসংবাদ জানিয়ে কলকাতা থেকে ‘তার’ পাঠিয়েছিল পরিবার। ফাইনালের কথা ভেবেই তা তখন চেপে যাওয়া হয়। তারপর সোনার পদক গলায় ঝুলিয়ে বাড়ি ফিরে সব জানতে পারেন মেওয়ালাল। সঙ্গেসঙ্গে প্রিয় সাইকেলে চেপে বেরিয়ে পড়েছিলেন ময়দানের দিকে। গড়ের মাঠের সবুজ ঘাস ভিজেছিল মেওয়ার চোখের জলে।
গত জুলাইয়ে নিঃশব্দে পেরিয়ে গেল সেই মেওয়ালালের জন্মশতবার্ষিকী। ঘরোয়া লিগ তাঁর নামে উৎসর্গ করেছে আইএফএ। ব্যাস, এইটুকুই। ১৯৪৮ ও ১৯৫২ সালে ওলিম্পিকসে জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করেন মেওয়ালাল। অর্জুন, পদ্মশ্রী দূরের কথা। জন্মশতবার্ষিকী পূর্তিতে মেওয়ালালের ছবিতে মালা দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি কেউই। সরকারি স্তরে কোনো উদ্যোগ নেই। ফেডারেশন কর্তারা চেয়ার দখলের রাজনীতিতে ব্যস্ত। মেওয়ালাল নিয়ে ভাবার সময় কোথায়? মেওয়া পুত্র কিষেনলালের বুকভরা অভিমানের দাম দেবেন কে? ফুটবল ভবনে অতি সাধারণ টেবিলের কোণায় লুটিয়ে এশিয়াডের পদক, স্মারক, বাংলার হয়ে সন্তোষ টফি জেতার মেমেন্টো। টিমটিমে আলোয় তা যেন বঞ্চিতেরই উপাখ্যান।
১৯২৬ সালে বিহারের দৌলতপুরে মেওয়ালালের জন্ম। বাবার হাত ধরেই কলকাতায় আসা। ফোর্ট উইলিয়ামে সামান্য কাজ করতেন তাঁর বাবা। ১০ বছরের মেওয়ালালের ফুটবল প্রতিভা দেখে চমকে যান সেনা দলের কোচ আর বার্নেট। তিনিই সযত্নে খেলা শিখিয়েছিলেন তাঁকে। পরে বাঘা সোম, রহিম সাহেবদের সংস্পর্শে নিজেকে দক্ষতার শীর্ষে নিয়ে যান মেওয়া। শোনা যায়, তাঁর বিখ্যাত ব্যাকভলি দেখতেই ভিড় করতেন কয়েক হাজার দর্শক। হেস্টিংসের স্থানীয় মর্নিং স্টার ক্লাব মেওয়ার বেড়ে ওঠার আঁতুড়ঘর। ১৯৪৫ সালে তাঁকে তুলে নেয় এরিয়ান। পরের বছর মোহন বাগান জার্সি গায়ে চাপিয়েছিলেন মেওয়া। কিন্তু সংসারের প্রয়োজন চাকরি। দেশ স্বাধীন হওয়ার বছরে মেওয়া যোগ দিলেন ইস্টার্ন রেলে। পরের আট মরশুম রেলে খেলার পর ফিরে আসেন এরিয়ানে। এরপর ১৯৫৮ সালে বিএনআরে খেলে অবসর। খেলা ছাড়ার পর মন দেন কোচিংয়ে। খুদে ফুটবলারদের নিয়ে কাজ করতেন নিঃশব্দে। প্রচারের বাইরে থাকতেই স্বচ্ছন্দ বোধ করতেন। জীবনের ময়দান ছেড়ে না ফেরার ড্রেসিং-রুমেও পাড়ি দেন নিঃশব্দেই। ৮২ বছর বয়সে কলকাতার হাসপাতালে মেওয়ালালের প্রয়াণ। ভারতীয় ফুটবলে এক ইতিহাসের থেমে যাওয়া।