নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: চোরবাগান বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হিসাবে ইতিমধ্যেই ‘মণ্ডপ ভেঙে পড়া’র ঘোষণাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার প্রথমে আটক, তারপর গ্রেপ্তার করা হয়েছিল মণ্ডপের দুই ঘোষকের মধ্যে সঞ্জীব রাহা ওরফে সেন্টুকে। আর শুক্রবার সকালে গ্রেপ্তার করা হল দ্বিতীয় ঘোষক কুশল মজুমদার ওরফে বাবুকে। তাঁর ভূমিকা এখন লালবাজারের আতশকাচের তলায়। যদিও তার জন্য মণ্ডপে আয়োজনের গলদ চাপা দেওয়া যাচ্ছে না। সবথেকে বড়ো প্রশ্ন উঠছে প্যান্ডেলে হাওয়া বাতাস চলাচলের ব্যবস্থাপনা নিয়ে। উপচে পড়া ভিড়ের মাত্রা অনুমান করে সেখানে যে সংখ্যক এসি ভেন্টিলেশনের জন্য বসানোর কথা ছিল, আদপে তার ধারকাছেও আয়োজন ছিল না। সেটাই ছিল দমবন্ধ পরিস্থিতি তৈরির প্রধান কারণ। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তার জন্যও বহু দর্শনার্থীর মৃত্যু হয়েছে প্রথম সপ্তমীর দিন।
তদন্তকারীরা দাবি করছেন, পুলিশকে দেখানো নকশায় ভেন্টিলেশনের মার্কিং থাকলেও তার বাস্তবায়ন হয়নি। দর্শনার্থীদের সুবিধার জন্য ৪০টি এসির কথা বলা হয়েছিল। অথচ, বাস্তবে এসির সংখ্যা ছিল মাত্র ২৪। সব মিলিয়ে ১৩৪ টনের। মণ্ডপে ভিড় বেড়ে যাওয়ায় সেই এসি আর লোড নিতে পারেনি। বাতাস চলাচল না করায় মণ্ডপের অন্দর অস্বাভাবিকভাবে গরম হয়ে যায়। শ্বাসকষ্ট শুরু হয় দর্শনার্থীদের। ফরেনসিক এক্সপার্টদের অনুমান, বেশ কয়েকজনের মৃত্যু তাতেই হয়েছে। তার সঙ্গে ছিল মাইকে ঘোষণা—মণ্ডপ ভেঙে পড়ছে। সেই সূত্রেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে দু’জনকে। অভিযুক্ত কুশল সেদিনের ঘোষণার কথা সোশ্যাল মিডিয়ায় স্বীকারও করেছেন। সমাজ মাধ্যমে লাইভ করে তিনি জানান, পুলিশ তাঁকে দু’দিন পর ফোন করেছিল। থানায় যেতে চেয়েছিলেন কুশল। কিন্তু পুজো কমিটির বড়োরা তাঁকে ‘বাধা দেন’। বলা হয়, ‘২৭ তারিখ থানায় যাবি।’ কিন্তু মেয়ের কথা মাথায় রেখেই কুশল শুক্রবার পুলিশের কাছে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। শুক্রবার সকালে আচমকাই এলাকায় হাজির হন কুশল। সেই খবর পেয়ে সিটের সদস্যরা সেখানে পৌঁছে তাঁকে গ্রেপ্তার করেন।
গ্রেপ্তারির পর কুশলের প্রোফাইলে একাধিক পোস্ট হয়েছে। পুলিশের অনুমান, তাঁর স্ত্রী এই পোস্টগুলি করছেন। ওই পোস্টে কুশলের হাতে লেখা একটি নোট রয়েছে। তাতে লেখা, দীর্ঘ ২০ বছর তিনি এই পুজোর সঙ্গে যুক্ত। ঘটনার কিছুক্ষণ আগে তিনি ক্লাবে গিয়েছিলেন। ওই সময় ক্লাবে আসেন গিরিশ পার্ক থানার ওসি ও ছোটোবাবু। তাঁরা চা খাবেন বলে জানান। বাইরে থেকে চা নিয়ে আসেন কুশল। দশ-পনেরো মিনিটের পর একটা আওয়াজ শুনতে পান তিনি। সঙ্গে সঙ্গেই ক্লাব থেকে বেরিয়ে যান ওসি ও ছোটোবাবু। কুশল নোটে দাবি করেছেন, ওই সময় ক্লাবের এক কর্তার ছেলে এসে জানান, মণ্ডপের পিছনের অংশ ভেঙে পড়েছে। সঙ্গে সঙ্গে এক পুলিশ বলেন, আপনারা মাইকিং করুন। কুশলের আরও দাবি, আসল ঘোষককে তিনি খুঁজে পাননি। ফলে ‘অপেশাদার’ হওয়া সত্ত্বেও কুশল সেদিন ঘোষণা করেন, দর্শনার্থীরা কেউ মণ্ডপে প্রবেশ করবেন না। মণ্ডপের অবস্থা খুব খারাপ। এত দর্শক একসঙ্গে প্রবেশ করলে ভিত আলগা হয়ে ভেঙে পড়বে। কুশলের বক্তব্য, মাইকের মুখ ছিল সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ, মুক্তারাম বাবু স্ট্রিট, অমর বসু সরণি ও পার্বতী ঘোষ লেনের উপর। মণ্ডপের সামনে থাকা মাইক থিমের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছিল ভিতর থেকে।
তবে সেন্টু না কুশল—প্রথম ঘোষণা কে করেছিলেন? পুলিশের জেরায় তাঁরা একে অপরের উপর দোষ চাপাচ্ছেন। তাই তাঁদের কণ্ঠস্বরের নমুনা নিয়ে ফুটেজের অডিয়োর সঙ্গে মেলানোর আয়োজন করছেন তদন্তকারী অফিসাররা।



