নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: উত্তর থেকে দক্ষিণ। সব জায়গায় থিমের পুজোর বাহার। সেই থিমে কোথাও জীবনের কথা, কোথাও দার্শনিক ভাবনা, দৃষ্টিনন্দন মণ্ডপ। সকলেরই উদ্দেশ্য, দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ। সেই ভাবনাকে কেন্দ্র করেই সেজে উঠেছে পুজো।
আধুনিক জীবনের ইঁদুর দৌড়। হাতে টাকা। স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি। এগুলোই আমাদের জীবন চালায়। তবে এসব সঙ্গে নিয়ে যেতে পারে না মানুষ। স্থাবর, অস্থাবর সম্পত্তি আমাদের অল্প কিছুদিনের জন্য আনন্দ দেয়। কিন্তু অপরিসীম তৃপ্তি দেয় শুধুমাত্র মানসিক শান্তি। ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা, মানসিক শান্তি, স্নেহ, মায়া, মমতা, সহানুভূতি, বন্ধন, এগুলো কোনোটাই চোখে দেখা যায় না। চারপাশে যা কিছু ঘটে তার মধ্যে এই অমূর্ত অর্থাৎ দেখতে না পাওয়া সম্পদ একটা পুজো মণ্ডপে ফুটিয়ে তোলা সহজ নয়। শিল্পী কৃষাণু পাল অ্যাবস্ট্রাক্ট কাজ করতে ভালোবাসেন। তাই উল্টোডাঙা বিধান সংঘ তাদের ৫৮ তম বর্ষে শিল্পী কৃষাণু পালের হাত ধরে ফুটিয়ে তুলছে অমূর্ত। দর্শককে ভাবাবে, চিন্তায় মগ্ন করবে এবং অবশ্যই মুগ্ধ করবে বলে উদ্যোক্তাদের আশা।
সবাই আটের দশকে চলে যাচ্ছে। ‘এআই’ কাজে লাগাচ্ছে। মানুষ তো ছাড় একটা আস্ত পুজো মণ্ডপ আটের দশকে চলে গেছে। বিশ্বাস না হলে দেখুন। সবার ফেসবুকজুড়ে এইটিজ। মিনিটের মধ্যে এআই দিয়ে আটের দশকে গিয়ে ছবি পোস্ট করে ফিরতে হচ্ছে এই ২০২৬ সালে। যদি পুজোয় অন্তত ৬-৭ দিনের জন্য আটের দশকে টানা থাকা যায়? কেমন হতে পারে সেই পুজোর চেহারা? বড়িশা সর্বজনীন। ৭৮ তম বর্ষে ফিরে গিয়েছে আটের দশকে। থিমের নাম আশি তে আসিও না, ৮ এর তরে। সেই দুর্গাদালান। সেই আটচালা নাটমন্দির। আর অবশ্যই আছে আশির দশকের সেই চাহিদাবিহীন শৈশব বা কৈশোর। যখন ছোট্ট একটা তালপাতার সেপাই বা কলের পুতুল আমাদের শৈশবকে ভালো রাখত। আনন্দ দিত। এখন ৮ থেকে ৮০-র হাতে হাতে স্মার্ট ফোন। শৈশব কৈশোর বুঁদ হয়ে আছে মোবাইল অ্যাপ আর মোবাইল গেমে। আশির দশকে নিপাট সস্তার খেলনার মতো আনন্দ আজকের ছেলেবেলা আদৌ পায় কি? থিমের মাধ্যমে এর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন শিল্পী বাপাই সেন।
এই মণ্ডপ সবটাই আসলে ভিন্ন ভিন্ন শিল্পের কোলাজ। শান্ত, স্নিগ্ধ নষ্টালজিক। মায়েরা মিথ্যা বলে। বলতে হয় মাঝেমাঝে। কাউকে ঠকানোর উদ্দেশে নয়। সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর উদ্দেশে। সব থেকে বেশি মিথ্যা একজন মা নিজেকে নিয়ে বলেন। মা তুমি কেমন আছ? ভালো না থাকলেও বলতে হয় ভালো আছি। মা তুমি ঠিকমতো খেয়েছ? অভুক্ত থাকলেও তা গোপন করার উদ্দেশে মিথ্যা বলতে হয় মাকে। মা হওয়া মুখের কথা নয়। আর সেই মা যদি হন জগৎজননী, তাহলে তাঁর দায়িত্ব আরও কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এক মায়ের ছোট্ট একটা মিথ্যা তাঁর সন্তানকে অনেক অপ্রিয় কথা জানতে বুঝতে দেয় না। মায়ের এই মিথ্যা পৃথিবী পরম সত্যের চেয়েও অনেক বড়ো সত্য। এর থেকে বড়ো সত্য আর কিছু নেই। তাই পূর্বাচল সর্বজনীন দুর্গোৎসব কমিটি ২০২৬ সালে তাদের থিমের নাম দিয়েছে. মায়েরা মিথ্যা বলে। বদলের বাংলায় পরম সনাতনী মায়ের রূপ সৃষ্টি করছেন পদ্মশ্রী সনাতন রুদ্র পাল। আর সন্তানকে ভালো রাখতে মায়ের ওই ছোট ছোট মিথ্যার কোলাজ ফুটিয়ে তুলছেন শিল্পী সোমনাথ মুখোপাধ্যায়। দুইয়ের যুগলবন্দিতে এবার এমন এক পুজো, যা ভাবনার অতলে পৌঁছে দেবে প্রতিটি মেয়েকে, প্রতিটি মাকে, প্রতিটি সন্তানকে।



