নিজস্ব প্রতিনিধি, বারাসত: সকাল হলেই হাতে ভ্যানের হ্যান্ডেল। তারপর এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়ি। কোথাও আবর্জনা সংগ্রহ, কোথাও বাসিন্দাদের সঙ্গে দু’দণ্ড কথা। অশোকনগরের শরৎনগর এলাকায় রেখা চট্টোপাধ্যায়ের দিন কাটে এভাবেই। কয়েকমাস আগে স্বামী অজয় চট্টোপাধ্যায়কে হারিয়েছেন তিনি। কিন্তু তাতে থেমে যায়নি তাঁর কর্মজীবন। বরং স্বামীর অসুস্থতার সময় যে কাজের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল, আজ সেই কাজই তাঁর বেঁচে থাকার অবলম্বন। অশোকনগর কল্যাণগড় পুরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডে প্রতিদিন সকাল সাতটা নাগাদ ভ্যান নিয়ে বেরিয়ে পড়েন রেখা। বাড়ি বাড়ি গিয়ে নীল-সবুজ পাত্রে আবর্জনা সংগ্রহ করেন। শরৎনগর থেকে ২ নম্বর গেট পর্যন্ত কয়েক কিলোমিটার এলাকায় ঘুরতে হয় তাঁকে। কাজের ফাঁকে পরিচিত বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা হয়। তাঁর ভ্যানের বাঁশির শব্দও এখন এলাকার মানুষের চেনা। সেই আওয়াজ শুনেই অনেকে বুঝতে পারেন, আবর্জনা সংগ্রহ করতে এসেছেন রেখা। এই পরিচিত রুটিনের পিছনে রয়েছে দীর্ঘ টানাপড়েনের ইতিহাস। রেখার স্বামী অজয় দীর্ঘ দিন ধরে নানা অসুখে ভুগছিলেন। একাধিকবার স্ট্রোক হওয়ার পরে তাঁর দৃষ্টিশক্তি চলে যায়। হৃদযন্ত্রের সমস্যাও ছিল। শেষ দিকে পা ভেঙে যাওয়ায় কাজ করা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে। সংসার চালানোর চিন্তা তখন আরও বড় হয়ে দেখা দেয়। স্বামীর সঙ্গে কাজে যেতে যেতেই এই পেশার সঙ্গে পরিচিত হন রেখা। অজয় যখন আর কাজ করতে পারছিলেন না, তখন তাঁর জায়গায় কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন স্ত্রী। পুর-কর্তৃপক্ষের কাছে নিজের ইচ্ছার কথা জানান। অন্য কাজের সুযোগ থাকলেও স্বামীর কাজটাই বেছে নেন তিনি। আগে সাইকেল চালাতে জানলেও ভ্যান চালানোর অভ্যাস ছিল না। প্রয়োজনের তাগিদে সেই দক্ষতাও আয়ত্ব করেন। কিন্তু সংসারের লড়াই সহজ হয়নি। কয়েক মাস আগেই মৃত্যু হয়েছে অজয়ের। দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। অশোকনগরের ২ নম্বর পিএল ক্যাম্পের করুণাময়ী মন্দির সংলগ্ন এলাকায় নিজের বাড়িতে এখন একাই থাকেন রেখা। পুরসভা থেকে পাওয়া মাসিক পারিশ্রমিকেই চলে তাঁর সংসার। ব্যক্তিগত শোক সামলে প্রতিদিন কাজে বেরনোই এখন তাঁর জীবনের নিয়ম। কোনো দিন অসুস্থতার কারণে কাজে যেতে না পারলে বাসিন্দাদের ফোন করে জানিয়ে দেন তিনি। আবার নির্দিষ্ট সময়ে তাঁর দেখা না মিললে অনেকেই নিজেরা ফোন করে খোঁজ নেন। শরীর খারাপ হয়েছে কি না! ভ্যানের সমস্যা হয়েছে কি না! তবে, রেখা অবশ্য বলছেন, কাজ করছি এই টুকুই। পুরসভার স্বচ্ছ ভারত মিশনের দায়িত্বে থাকা আধিকারিক সিদ্ধার্থ মুখার্জি বলেন, রেখাদেবী পরিশ্রমী। নিয়মিত নিজের দায়িত্ব পালন করেন। এ বার পুজোয় অন্য কর্মীদের মতো তিনিও বোনাস পেয়েছেন।



