ব্রিটিশরাজ, ছেচল্লিশের রক্তাক্ত ইতিহাস পেরিয়ে আজও স্বমহিমায় বদনচাঁদ রায় বাড়ির দুর্গাপুজো, রুপোলি সিংহ, বিশেষ পদ বেগুন-বড়ির টক
  • ১৬ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

শোভন চন্দ, কলকাতা: ভ্যাপসা গরম আর খামখেয়ালি বৃষ্টিকে সঙ্গে নিয়েই মধ্য কলকাতায় পুজোর প্রস্তুতি তুঙ্গে। কলেজ স্ট্রিটের ব্যস্ততা, মেডিকেল কলেজের ভিড়ে জায়গাটা জমজমাট। কিন্তু ঠিক বিপরীতে গোপালচন্দ্র লেন অনেকটাই শান্ত। ভরদুপুরে গণেশ পাইনের পাড়ায় ইতিমধ্যে উঁকি দিয়েছে শরৎ। গলি দিয়ে একটু ভিতরে ঢুকলেই সেই আভাস মেলে। কলুটোলার বদনচাঁদ রায় বাড়ি। বিরাট ঠাকুর দালান। ঘাম মুছতে মুছতে গণেশের রং করতে ব্যস্ত পটুয়া। কথা বলার সময় নেই। মাঝে মাঝে সিঁড়ি দিয়ে কয়েক পা নেমে দেখে নিচ্ছেন, দূর থেকে শুঁড়টা ঠিক লাগছে তো। আর একজন দালানের সামনে আলোগুলো পরিষ্কার করতে ব্যস্ত। সব ঠিকঠাক আছে কি না। ভালো করে নেড়েচেড়ে দেখে নিচ্ছেন। দিনকয়েক পরেই তো শাড়ি-পাঞ্জাবিতে একজোড়া নতুন মুখ ভ্রূ কুঁচকে জিজ্ঞাসা করবে, আচ্ছা এটাই... রায় বাড়ি? আলোয়, ফুলে সেজে উঠবে চারদিক। সপরিবারে মা পা রাখবেন বদনচাঁদের বাড়িতে।

Advertisement

দালানে বসে রায় বাড়ির ইতিহাসের কথা বলছিলেন সপ্তম বংশধর, অভিনেতা ও প্রযোজক সুপ্রতীম রায়। আগে মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণেই ছিল বাড়ি। ওখানে পুজো শুরু করেছিলেন মথুরমোহন রায়। সেই হিসাবে পুজোর বয়স ২২০ বছর। পরে ব্রিটিশরা সেই বাড়ি অধিগ্রহণ করে। অগত্যা, বিপরীত দিকে কলুটোলায় ১৮৫৩ সালে নতুন বাড়িতে চলে আসেন সকলে। বাড়িটি তৈরি করেছিল ম্যাকিনটোস বার্ন। ১৮৫৮ সালে বদনচাঁদ রায়ের নেতৃত্ব শুরু হয় দুর্গাপুজো। এবার তা ১৬৯ বছরে পড়ল। বারবার বাধা এসেছে। তবে রায়বাড়ির উমা আরাধনা বন্ধ হয়নি। বাড়ি বদলালেও অন্য বংশধরেরা চালিয়ে গিয়েছেন পুজো। সালটা ১৯৪৬। অশান্ত পুরো বাংলা। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা চলছে। রক্তে ভাসছে কলকাতার গলিপথ। তার আঁচ পড়ে বদনচাঁদের বাড়িতেও। ভাঙচুর চলে। প্রাণে মারার হুমকিও দেওয়া হয়। চড়াও হয় দুষ্কৃতীরা। মাযের কৃপায় সে যাত্রায় কোনোরকমে বেঁচে যান সবাই। কিন্তু পুজো বন্ধ হয়নি। সেবার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির সামনে অনন্ত রায়ের বাড়িতে গৌরী বন্দনা চলে। ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়।তৎকালীন পুলিশ কমিশনারের নেতৃত্বে পুজো ফেরে রায়বাড়িতে। বাইরে কড়া নিরাপত্তা। হামলার আশঙ্কা। তারই মধ্যে চলে মায়ের আরাধনা। 
উলটোরথের সময় কাঠামো পুজো হয়। শুরু প্রস্তুতি। রায়বাড়িতে ডাকের সাজে সেজে ওঠেন মা। একমাত্র এখানেই রুপোলি রঙের সিংহ রয়েছে। পরিবারের দাবি, এমন সিংহ আর কোথাও দেখা যায় না। বংশ পরম্পরায় মাকে গয়না পরায় বাড়ির ছেলেরা। পুজোয় মায়ের নৈবেদ্যে থাকে ৮০ কেজি চাল ও ৪০ কেজি বাটা চিনি। নিয়ম মেনে চালকুমড়ো বলি হয়। সন্ধিপুজোর পাশাপাশি ধুনো পোড়ানোও হয়।
দুর্গাপুজোর সময় এবাড়ির এক জনপ্রিয় পদ হল বেগুন ও বড়ির টক। ঝাড়বাতি আর সাদা আলোয় সেজে ওঠা বদন রায়ের দালানে নবমীর আরতি দেখতে ব্যাপক ভিড় হয়। ধুনুচির ধোঁয়ায় ধীরে ধীরে আবছা হয়ে যায় নবমীর রাত। দশমীর সকাল থেকেই বিষাদের সুর। বেলা গড়ায়। কাঁধে করে মাকে মতিশীল ঘাটে নিয়ে যাওয়া হয়। রায়বাড়ির উমা গঙ্গাপথে পাড়ি দেন কৈলাসে।